Fri. Mar 5th, 2021

ভোট নিয়ে জাপায় নানা মত

ডেইলি বিডি নিউজঃ আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অবস্থান কি হবে, এ নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ভোট এবং জোটের রাজনীতিতে দলটি কতটুকু গুরুত্ব পাবে, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সম্প্রতি দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আগামী দিনের করণীয় সম্পর্কে জানতে একটি চিঠি দিয়েছেন। এতে তিনি জানতে চান জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করবে নাকি জোটগতভাবে। জোটগতভাবে নির্বাচন করলে কোন্‌ জোটকে বেছে নেয়া লাভজনক হবে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রশ্নের জবাবে নেতাদের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন, সরকারের সঙ্গে থেকেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত। আবার কেউ মত দিয়েছেন সরকারবিরোধী জোটের সঙ্গে যেতে। যদিও এ নিয়ে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি এরশাদ। দলীয় সূত্র বলছে, গত কিছুদিন আগে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক ভিত শক্তিশালী করার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন এরশাদ। মূলত এর পরই নির্বাচন নিয়ে হিসাব কষা শুরু করেছেন তিনি। সূত্র বলছে, পহেলা অক্টোবর থেকে সিলেট সফরের মাধ্যমে সারা দেশে নির্বাচনী সফর শুরু করবেন তিনি। এর আগেই ভোট এবং জোটের রাজনীতি নিয়ে নেতাদের মতামত জানতে চেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি দলের শীর্ষ ফোরাম প্রেসিডিয়ামে সদস্যদের কাছে পাঠানো চিঠিতে মোটাদাগে নয়টি বিষয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের কাছে মতামত চান তিনি। এরশাদ তার চিঠিতে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নেতাদের মতামত দিতে বলেন। এই মুহূর্তে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক করণীয় কি, সেটাও প্রশ্ন রাখেন তিনি। জানা গেছে, প্রথম প্রশ্নের জবাবে বেশির ভাগ নেতাই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। তবে দলের করণীয় সম্পর্কে নেতাদের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন মতামত এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য এই প্রতিবেদককে জানান, তারা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উদ্ধৃতি দিয়ে মতামত দিয়েছেন যে, আগামী নির্বাচনে যেতে হলে তৃণমূলের চাহিদানুযায়ী দলের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। বর্তমান সংসদের ৩ বছর পার হতে চললেও জাপার সঠিক অবস্থান নিয়ে কর্মীরা অন্ধকারে। তারা সঠিকভাবে জানেন না, জাতীয় পার্টি সরকারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে। এছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে গোটা দেশের মানুষ আলোচনা করলেও, বিরোধী দল হিসেবে জাপার কাছ থেকে কোনো সঠিক বক্তব্য পাওয়া যায় নি। এই অবস্থান স্পষ্ট করা না গেলে আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জনগণের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না। এদিকে দলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলেও জানা গেছে। তারা বলেন, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়া জাতীয় পার্টির জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে অনেকদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পরে আমরা দেশের প্রধান বিরোধী দল হতে পেরেছি। এই মুহূর্তে দলের সাংগঠনিক অবস্থানকে আরেকটু শক্তিশালী করে নির্বাচনে প্রস্তুতি নেয়ার পক্ষে মত দেন তারা। অবশ্য এরশাদ তার চিঠির আরেকটি প্রশ্নে দলকে সু-সংগঠিত করতে কী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়েও মতামত চেয়েছেন।
সূত্র বলছে, নেতাদের কাছে যেই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, সেটি হলো আমরা কি এককভাবে নির্বাচন করতে পারবো, নাকি জোটগতভাবে? এই প্রশ্নের জবাবে কয়েকজন নেতা এককভাবে নির্বাচন করতে জাতীয় পার্টির প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেন। চিঠির জবাবের বরাত দিয়ে এক প্রেসিডিয়াম সদস্য মানবজমিনকে বলেন, তিনি তার চিঠিতে এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন। কারণ, দলের তৃণমূলে জাপার সাংগঠনিক ভিত তেমন মজবুত না। এছাড়া সাম্প্রতিক কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচনে জাপার ভরাডুবি প্রমাণ করে, ভোটের রাজনীতিতে অনেক বেশি পিছিয়ে পড়েছে জাতীয় পার্টি। তাই এই মুহূর্তে বড় কোনো জোটের সঙ্গে গিয়ে সিট ভাগাভাগির নির্বাচন করাই দলের জন্য ভালো। এতে দল কয়েক জন এমপি অন্তত পাবে। যদিও জোটগত নির্বাচনের বিরোধিতা করেছেন অনেক নেতাই। এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়া একজন নেতা জানান, ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে এখনো এরশাদের জনপ্রিয়তা রয়েছে। এছাড়াও দুই দলের লাগামহীন রাজনীতিতে মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত। এই মুহূর্তে জাতীয় পার্টি সঠিক সাংগঠনিক কাঠামো ও পরিষ্কার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আসতে পারলে ভালো ফলাফল পেতে পারে। তাছাড়াও জোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি সব সময় অবহেলার শিকার হয়েছে। বড় দুই দলই জাতীয় পার্টিকে নিয়ে খেলেছে। জোট গঠনের সময় দেয়া প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত রাখেনি। দলের অন্য একজন নেতা বলেন, জোট করতে হলে ছোটো দলগুলো নিয়ে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে একটি জোট হতে পারে। জানা গেছে, এরশাদ নিজেও এই চেষ্টা চালিয়েছেন। কয়েকটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও দলগুলোর কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। চিঠির প্রসঙ্গে দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি। সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের মানবজমিনকে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি আগামী নির্বাচন সাংবিধানিক নিয়মের মধ্যেই হবে। অর্থাৎ এই সরকারের পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর। আমরা নির্বাচনে একটি সন্তোষজনক অংশীদারিত্বের জন্য দলের মধ্যে চেষ্টা অব্যাহত রাখছি। তবে সবার আগে দলের সাংগঠনিক বিষয়গুলোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। এরপর সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে নেতাকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হবে।
এদিকে জোটগত নির্বাচনের পক্ষে মত দেয়া নেতাদের মধ্যেও মতভিন্নতার কথা জানা গেছে। কেউ বলেছেন, সরকারের সঙ্গে থাকতে। আবার কেউ বলেছেন তার বাইরে সরকারবিরোধী বিকল্প জোটের সঙ্গে থাকতে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এরশাদের এই চিঠিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। নির্বাচন সামনে রেখে এরশাদ রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করেই আগামী নির্বাচনে দলের অবস্থান ঠিক করবেন- এ চিঠি এরই ইঙ্গিত বলে মনে করছেন তারা।