|
এই সংবাদটি পড়েছেন 1,108 জন

বিশ্ব নেতাদের রহস্যজনক নীরবতায় রোহিঙ্গারা নির্যাতিত!

চৌধুরী আলী আনহার শাহানঃ রোহিঙ্গা, পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি জনগোষ্ঠীর নাম। রোহিং এলাকায় বাস করে বলে তারা রোহিঙ্গা নামেই পরিচিত। এটি আরাকানের পুরাতন নাম। রোহিঙ্গারা মুসলমান। তারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী। বিশ্বের অন্য দশটি দেশের যেকোন এলাকার মানুষের তুলনায় এখানকার অধিবাসীরা খুবই ন¤্র, ভদ্র, শান্তিপ্রিয়, ন্যায়পরায়ণ। তুলনামূলক একটু বেশি ধার্মিকও বটে। অথচ তারা নিজেদের বসত ভিটায় থেকেও রাষ্ট্রে নিজেদের প্রাপ্য অধিকার পাওয়া তো পরের কথা, পদে পদে অবহেলিত, লাঞ্চিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত হয়ে আসছে। সেই কবে থেকে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী সদস্যরা যেভাবে অত্যাচার, হত্যা, লুটপাট, জ্বালাও পুড়াও এর মত যেসব ভয়াবহ নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে, নিঃসন্দেহে তা নিন্দনীয় এবং অত্যান্ত দুঃখজনক। বছরের পর বছর মিয়ানমারের বৌদ্ধ কর্তৃক রোহিঙ্গার মুসলমানরা নির্যাতিত হয়ে আসছে, অথচ জাতিসংঘ এ ব্যাপারে নির্বিকার, কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেনা।

যদিও জাতিসংঘকে মাঝে মাঝে সংকোচিত ও সমব্যাথায় কাতর হতে দেখা যায়। কিন্তু নির্যাতনকারী জালিমগোষ্ঠীকে কোন ধরনের জবাবদিহীতার আওতায় না আনায় ক্রমশই বেড়ে চলেছে তাদের বর্বর কায়দায় দমন, নিপীড়ন, উচ্ছেদ, হত্যা, ধর্ষনসহ নিন্দনীয় সকল জুলুম আর অত্যাচার। রোহিঙ্গাদের এ করুন অবস্থা দেখে মনে হয় নিজ দেশের নাগরিক হয়েও যেন আজ তারা পরবাসী। সম্প্রতি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বর্বর নির্যাতন যেন নতুন যাত্রা পেয়েছে। অথচ শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী আং সাং সূচি এখন মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় ঝড় তুলেছেন। সর্বত্র পরিচিতি কুড়াচ্ছেন নিপীড়িত মানুষের ভাষ্যকার হিসেবে। তার পরেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর গত ৯ অক্টোবর থেকে লোমহর্ষক কায়দায় হত্যা, ধর্ষন, নির্যাতন আর উচ্ছেদ করে দেশান্তরী করার যে অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে, তা ইতিমধ্যে বিশ্বের কিছু মিডিয়ায় প্রচার পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্ব বিবেক এখনো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। বিশ্ব মুসলিম নেতাদের প্রতিবাদী কন্ঠ বা হুংকার এখনো শোনা যাচ্ছেনা। বৌদ্ধের ভাষায় প্রাণী হত্যা মহাপাপ। কিন্তু আজ তারা মানুষ হত্যা করে মানবতাকে চরমভাবে ভূলন্ঠিত করছে। অন্যদিকে মুসলমান তো একে অন্যের ভাই। কিন্তু যখন বৌদ্ধ কর্তৃক রোহিঙ্গার মুসলমানরা নির্যাতিনের শিকার হচ্ছে, তখন বিশ্ব মুসলিম নেতাদের রহস্যজনক নীরবতা কী প্রমান করে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

আজ সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ফলে অসংখ্য মানুষ ভিটাচ্যুত হয়ে আশ্রয়হীন ভাবে বনে, জঙ্গলে, নৌকায় অবস্থান করছে। যেটা কোন ভাবেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতির ভিতরে পড়ে না। অতএব, রোহিঙ্গাদের শুধু মুসলমান নয়, অন্তত মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে মানবতা রক্ষায় বিশ্বের সর্বস্থরের নেতাদের সোচ্চার ভূমিকা পালন করলে যেমনিভাবে মানবতা রক্ষা পাবে, ঠিক তেমনি ভাবে বিশ্বে সহাবস্থানের ঐতিহ্যও বলবৎ থাকবে। মিয়ানমার বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সে দেশের হিংসাত্মক সহিংস আচরণের কারনে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে চায় বলে মিডিয়াতে উঠে আসছে। তখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। উদ্দেশ্য রোহিঙ্গারা যেন কোনভাবেই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে। মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর ত্রিমূখি নৃশংসতায় দিশেহারা হয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশ সীমান্তে এসে বাঁচাও বাঁচাও বলে হাত জোড় করে আর্তনাদ করছে। কিন্তু কোন মতে প্রান বাঁচিয়ে পালিয়ে আসা এই মানুষগুলোর ভাগ্যের উন্নতি ঘটছেনা। ওপারে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বর্বর নির্যাতন। আর এপারে বাংলাদেশ সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে তারা খুব মানবেতর জীবন পার করছে। নিজ দেশের সেনাবাহিনীর তাড়া খেয়ে নিরাশ্রয় এই মানুষগুলো যখন টেকনাফের নাফ নদীর কিনারে এসে জীবন বাঁচাতে একটু আশ্রয়ের জন্য হাত জোড় করে মাথা গোঁজার ঠাঁই চাচ্ছে। নাফ নদীর উভয় পাড়ের বাতাস ভারি হয়ে উঠছে তাদের আর্তচিৎকার আর কান্নার রোলে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার এই অবলা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে উদারতার মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে -এমন প্রত্যাশা দেশের সকল বিবেকবান মানুষের। কারণ রোহিঙ্গারা আমাদের অতিথি না হোক, প্রতিবেশি তো?

 

লেখক: চৌধুরী আলী আনহার শাহান কলামনিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।