|
এই সংবাদটি পড়েছেন 4,157 জন

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটঃ পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

এম. আরিয়ানঃ নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমির নাম সিলেট। প্রকৃতির অকৃপণ রূপ-লাবণ্যে ঘেরা এই সিলেট পর্যটন শিল্পে এনে দিতে পারে অপার সম্ভাবনা। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভারত সীমান্তঘেরা এই অঞ্চলটি যেনো প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যের আঁচলে ঢাকা। যেখানে পর্যটকরা মুগ্ধ হন, প্রেমে পড়েন শীতল প্রকৃতির এই লীলাভূমিতে। সিলেটের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রকৃতির রূপ-লাবণ্যের অপূর্ব সৌন্দর্যের ভান্ডার। এখানকার নৈসর্গিক প্রাকৃতিক শোভা অতি সহজে মুগ্ধ করে যে কাউকে। আর তাই বর্ষাকালে রিমঝিম বৃষ্টিতে পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে সিলেটে।

যেখানে ঘুরতে যাবেন: সিলেটের চার জেলা সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ এলাকায় বেশ কিছু দর্শনীয় প্রাকৃতিক লাবণ্যভরা স্পট রয়েছে। এর মধ্যে সিলেটে রয়েছে- গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত দেশের একমাত্র মিঠাপানির জলারবন (সোয়াম্প ফরেস্ট) রাতারগুল, প্রকৃতির অপ্সরাখ্যাত বিছনাকান্দি, অপার সৌন্দর্য্যমন্ডিত গ্রাম পাংথুমাই ও বড়হিল ঝর্ণা, প্রকৃতিকন্যা জাফলং, কোম্পানীগঞ্জে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারী, জৈন্তাপুর উপজেলায় নীলনদ খ্যাত লালাখাল, কানাইঘাটে প্রকৃতির লোভছড়ানো ‘লোভাছড়া’ চা বাগান, পাথর অঞ্চল ও ঝুলন্ত ব্রিজ, ফেঞ্চুগঞ্জের হাকালুকি হাওর, শহরতলীর লাক্কাতুরা ও মালনীছড়া চাবাগান ও খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান। সিলেট জেলার বাইরে দেশের সবচেয়ে বড় হাওর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, চুনাপাথর, বালি ও পাথর সমৃদ্ধ সীমান্তবর্তী তাহিরপুরের জাদুকাটা নদী, মৌলভীবাজারের মাধবকুন্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, প্রকৃতির রাণীখ্যাত শ্রীমঙ্গল চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হবিগঞ্জের মাধপুর লেক, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, দেশের সর্ববৃহৎ গ্রাম বানিয়াচং গ্রাম আপনার ভ্রমণকে আরো সমৃদ্ধ করবে।

দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যবস্থা: যাত্রা শুরুর আগে জেনে নিন প্রকৃতিসৃষ্ট এসব অঞ্চলের দূরত্ব, যাতায়াত ব্যবস্থা ও থাকা-খাওয়ার সুযোগ কতটুকু। আর পরিবার পরিজনকে নিয়ে ঘুরে আসুন পছন্দের স্থান।

রাতারগুল: ‘সিলেটের সুন্দরবন’ খ্যাত বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন (সোয়াম্প ফরেস্ট) হচ্ছে রাতারগুল। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের গুয়াইন নদীর দক্ষিণে রাতারগুলের অবস্থান। প্রায় ৩১০ একর জমির ভূমির উপর জলের মধ্যে ভেসে থাকা সবুজ বৃক্ষ, তার মাঝ দিয়ে নৌকায় করে রাতারগুলে ঘুরে বেড়ানোর যাবে মাত্র এক থেকে ২ ঘন্টায়। চাইলে আরো বেশি সময় কাটাতে পারেন। তবে শব্দ করা যাবে না। কারণ, এই বনে কিছু সাপ ছাড়াও বানর, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, কানাবক, সাদাবক, ঘুঘুসহ নানা জাতের অসংখ্য পাখি আছে। উচ্চস্বরে আওয়াজ করলে এসব প্রাণী ভয় পেতে পারে। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরত্বে এর অবস্থান। সিলেট নগরীর চৌহাট্টা থেকে মাইক্রোবাসে অথবা আম্বরখানা থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে যাওয়া যাবে। সিএনজি ভাড়া আড়াইশ’ থেকে ৩শ’ টাকা আর মাইক্রোবাসে ১ হাজার টাকা। ফেরার পথে একই পরিমাণ খরচ। রাতারগুল বনে প্রবেশের বাহন হবে নৌকা। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ব্যবহার অনুচিত। তবে ডিঙি নৌকা ভাড়া বাবদ নেবে ৫শ’ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা। রাতারগুল বনে প্রবেশের ৩টি রাস্তা আছে। তবে রাতারগুল গ্রাম দিয়েই প্রবেশে সুবিধা বেশি।

বিছনাকান্দি: সুউচ্চ পাহাড়। পাহাড়ের বুক ছিঁড়ে নেমে এসেছ বিশাল ঝর্ণা। সারি সারি পাথরের উপর এসে পড়ছে ঝর্ণার জল। বিছনাকান্দি যেনো পাথরের বিছানা। ঝর্ণের জলে এই বিছানায় শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয়া যায় একটা দিন। বিছনাকান্দি যেতে সিলেট নগরীর আম্বরখানা পয়েন্ট সিএনজি অটোরিকশাযোগে হাদারপার নামক জায়গায় পর্যন্ত যাওয়া যাবে। পাঁচ জন মিলে ৫শ’ টাকায় ভাড়া নেওয়া হয়। তবে এ রুটে নিয়মিত সিএনজি চলে, ভাড়া জনপ্রতি ৮০ টাকা। হাদারপার বাজারের মসজিদের পাশেই আছে খেয়াঘাট। সেখান থেকে নৌকায় যেতে হবে বিছনাকান্দি। হাটার রাস্তাও আছে। তবে বিছনাকান্দি পর্যন্ত নৌকা ভাড়া আসা-যাওয়া নিয়ে সর্বোচ্চ ৮শ’ টাকা।

পাংথুমাই: পেছনে ভারতের মেঘালয় রাজ্য আর বয়ে চলা পিয়াইন নদীর মিতালিতে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের পাংথুমাই গ্রাম দেশের সবচেয়ে সুন্দরতম গ্রামগুলোর একটি। গ্রামের পাশেই বড়হিল নামক মায়াবী এক ঝর্ণার কলকল ধ্বনিতেই বিমুগ্ধ হওয়া যায়। সিলেট শহরের আম্বরখানা থেকে সিএনজি অটোরিকশায় ৫শ’ টাকায় গোয়াইনঘাট বাজারে গিয়ে পরে পশ্চিম জাফলং হয়ে পাংথুমাই যেতে হবে। রাতারগুল, বিছনাকান্দি ও পাংথুমাই একদিনে ঘুরে আসতে পারবেন।

জাফলং: দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে রয়েছে জাফলংয়ের ব্যাপক পরিচিতি। রূপ-লাবণ্যের এমন স্বপ্নপুরি প্রকৃতিকন্যা জাফলং এখনও পর্যটকদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। যদিও অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনের কারণে রূপ হারাতে বসেছে গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যটন অঞ্চলটি। তবে যাতায়াত সুবিধা থাকায় পর্যটকরা এ স্থানটি সবার আগেই বেছে নেন। সিলেট থেকে বাস, মাইক্রোবাস বা সিএনজি অটোরিকশায় জাফলং যেতে সময় লাগে সর্বোচ্চ দেড় ঘন্টা। বাসযোগে জনপ্রতি ভাড়া ৫৫ টাকা, সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা, মাইক্রোবাস রিজার্ভ ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা। জাফলং থেকে ফেরার পথে ঘুরে আসতে পারেন লালাখাল। নীলনদের মতো স্বচ্ছ জলধারা আপনাকে মুগ্ধ করবে। জৈন্তাপুরের সারি নদী ব্রিজের পাশে নৌকায় ঘুরে আসতে পারবেন এটি। ভাড়া নেবে ৫শ’ থেকে ৮শ’ টাকা।

লোভাছড়া: সিলেটে কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা লোভাছড়া। অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে প্রাকৃতিক নৈসর্গের আরেক রূপ এটি। লোভাছড়া থেকে ভারতের পাহাড়ি রাজ্য মেঘালয় খুব বেশি দূরে নয়। উঁচু পাহাড়ে উঠলে মেঘালয়ের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় খুব কাছে থেকে দেখা যায়। লোভাছড়ায় আছে একটি চা বাগান, নাম লোভাছড়া টি এ্যাস্টেট। এর মালিক একজন ইংরেজ। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে কানাইঘাট উপজেলার ১নং লক্ষীপ্রসাদ ইউনিয়নে এর অবস্থান। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে লোভাছড়া নদী। বাড়তি আকর্ষণ ‘খাসিয়া পুঞ্জি’। লোভাছড়ার পাশ দিয়ে ভারত সীমান্তে হারিয়ে গেছে ‘নুনগাঙ’। এর উপর বেশ পুরনো তবে এখনো মজবুত স্টীলের তৈরী চমৎকার একটি ঝুলন্ত ব্রিজ রয়েছে। যেটাকে দেশের দ্বিতীয় ঝুলন্ত ব্রিজ বলা হয়। সিলেট শহর থেকে বাস অথবা সিএনজি-অটোরিকশাযোগে সরাসরি সিলেট তামাবিল সড়কে দরবস্ত-চতুল হয়ে কানাইঘাট সদরে যাওয়া যায়। গোলাপগঞ্জ-চারখাই-শাহবাগ হয়ে জকিগঞ্জ সড়ক দিয়ে কানাইঘাট পৌঁছা যাবে। এছাড়া শহরের টিলাগড় হয়ে গাজী বুরহান উদ্দিন সড়ক দিয়ে সিলেট-গাছবাড়ী সড়ক দিয়ে কানাইঘাট সদরে পৌছার সুযোগ রয়েছে। সিলেট শহর থেকে কানাইঘাট সদরে বাসভাড়া সর্বোচ্চ ৬০ টাকা এবং সিএনজি-অটোরিকশা ভাড়া সর্বোচ্চ ১শ’ টাকা। রিজার্ভ সিএনজি ৫শ’ ৭শ’ টাকা হবে। কানাইঘাটে পৌছার পর বাজার থেকে নৌকাযোগে জনপ্রতি ৩০ থেকে ৪০টাকা নৌকা ভাড়া। রিজার্ভ নৌকা নিলে ৩শ’ টাকার বেশি হবে না। আর নৌকাযোগে একটু সামনে এগুলেই লোভছড়া পাথর কোয়ারী।

মালনিছড়া ও লাক্কাতুড়া চা বাগান: সিলেট শহরের উপকণ্ঠেই রয়েছে মালনিছড়া ও লাক্কাতুড়া চা বাগান। মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটেই শহর থেকে এ চা বাগান দু’টিতে যাওয়া যায়। সিএনজি অটোরিকশাতেই যাওয়া ভালো। লাক্কাতুড়া চা বাগানেই রয়েছে দেশের প্রথম গ্রিন গ্যালারির ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নগরীর জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা যেকোনো স্থান থেকেই যাওয়া যায় চা বাগান দুটিতে।

হাকালুকি হাওর: সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা হতে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ঘিলাছড়া গ্রামের দিকে অবস্থিত। সিলেট হুমায়ুন রশীদ চত্বর থেকে বাস সিএনজি লেগুনা করে মাইজগাঁও বাজারে যেতে হয়। সেখান থেকে পুনরায় সিএনজিযোগে ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্টে গেলেই হাকালুকি হাওর যাওয়া যাবে। ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা।

টাঙ্গুয়ার হাওর: টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০ টিরও বেশি ঝরা (ঝর্ণা) এসে মিশেছে এই হাওরে। অতিথি পাখি কখনো জলকেলি, কখনো খুনসুটিতে কিংবা খাদ্যের সন্ধ্যানে এক বিল থেকে অন্য বিলে এক হাওর থেকে অন্য হাওরে গলায় প্রাণকাড়া সুর তুলে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে ভেড়ায়। শীতের শুরু থেকে অস্ট্রেলিয়া, সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন শীত প্রধান দেশ থেকে হাজার মাইল রাস্তা অতিক্রম করে টাঙ্গুয়ার হাওরের পার্শ্ববর্তী শনি, মাটিয়ান, কানামিয়াসহ আশপাশের হাওরে এসব অতিথি পাখি অবস্থান নেয়। সিলেট থেকে বাস, মাইক্রোবাস কিংবা সিএনজি অটোরিকশায় যাওয়া যাবে সুনামগঞ্জে। সেখান থেকে যেতে হবে টাঙ্গুয়ার হাওরে। রাজধানির কমলাপুর ও ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে সিলেট আসা যায়। বাস, বিমান কিংবা ব্যক্তিগত কার-মাইক্রোবাসযোগেও সিলেটে নিয়মিত আসা-যাওয়ার সুযোগ তো আছেই।

থাকা এবং খাওয়া: সিলেটের পর্যটন বিস্তৃত হলেও উপজেলাগুলোতে এখনও আবাসনের সুযোগ-সুবিধা খুব বিস্তৃত হয়নি। তবে সিলেটে শহরে থাকার জন্য রয়েছে বেশ ভালো সুবিধা। উন্নতমানের তারকা মানের নিরভানা ইন হোটেল কমপ্লেক্স সহ বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। যেখানে একই সাথে থাকা খাওয়া সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে।

চলমান বর্ষাকালে যৌবনা নদী আর হাওরে একটু বেশিই আনন্দ মিলবে সিলেটে। বিশাল বিশাল পাহাড় ছুঁয়ে নেমে আসা ঝর্ণা, মাথার উপরে মেঘমালার খেলা, সারি সারি চা বাগান, জলের মাঝে ডুবে থাকা বিশাল বন। তার মাঝ দিয়ে নৌকায় ঘুরতে কিংবা ঝর্ণার স্বচ্ছ-শীতল পানিতে গা এলিয়ে দিতে কার না ইচ্ছে হবে! নৈসর্গিক সৌন্দর্যে আপনি যদি চোখ জুড়াতে চান, অন্তত একবার আপন সান্নিধ্যে পেতে চান প্রকৃতির ভালবাসা, তবে যে কোন দিনে ঘুরে আসতে পারেন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় সিলেটে।