|
এই সংবাদটি পড়েছেন 1,833 জন

আমাদের পর্যটন শিল্পঃ কিছু সমস্যা এবং অপার সম্ভাবনা

এম আরিয়ানঃ সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, পাহাড়-নদী-সমুদ্র বিধৈত এ দেশের প্রাকৃতিক সুর্ন্দয মুগ্ধ করে সবার মন, হৃদয়ের গভীরে তৈরি করে এক স্নিগ্ধ অনুরন । পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো অনেক সম্পদই রয়েছে আমাদের এই দেশে।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের অবস্থান এই দেশে। রয়েছে নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরা প্রবাল দীপ সেন্টমার্টিন। বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দর বনের নয়ারাভিরাম প্রাকৃতির দৃশ্য তা আবার সমুদ্র বেষ্টিত। রয়েছে মোহনীয় রূপের সাগরকন্যা ‘কুয়াকাটা’।

প্রায় আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শন বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার ময়নামতির শালবন বিহার, পাহাড়পুর বোদ্ধবিহারের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থান। এছাড়া ঢাকা ও ঢাকার বাইরে রয়েছে মোগল এবং সুলতানি আমলের অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন।

আরো আছে রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু, সিলেটের জাপলং ও চা বাগান,মাধবকুন্ড, রাতারগুল, কাপ্তাই লেক সহ অসংখ্য সৌন্দর্যের লীলা ভূমি।এ ছাড়াও বিদেশীদের কাছে এই দেশ একটি অতিথি পরায়ন, বন্ধুবাৎসল দেশ । ইবনে বতুতা, ফাহিয়েন,হিওয়েন সাং সহ বিখ্যাত পর্যটক এ দেশের অপরূপ সৈন্দর্য্য মুগ্ধ হয়েছিলেন ।

পর্যটন বর্তমান বিশ্বে একটি বৃহৎ রপ্তানি ও দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প। এশিয়ার ইকনমিক মিরাকলের অন্যতম ২ টি দেশ হল থাইল্যান্ড, সিংগাপুর । সে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল সে দেশের পর্যটন শিল্প । আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে হয়তো পর্যটন শিল্পই অর্থনীতির মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করবেনা । কিন্তু আমরা আমাদের পর্যটন শিল্পকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে পারি যার মাধ্যমে পর্যটন শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে । আমাদের পর্যটন শিল্পকে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি । যেটা অত্যান্ত বাস্তব ।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সমস্যাসমুহঃ

১.রাজনৈতিক অস্থিরতা:-উন্নয়নশীল দেশ গুলোতে সবসময় রাজনৈতিক অস্থিরতা লেগেই থাকে । বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা অনেক সময় অস্থিতিশীল থাকে । রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে পর্যটকরা উদ্বিগ্ন থাকেন। এ ধরনের অবস্থা পর্যটকদের অনুৎসাহিত করে ।

২. বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ সংকট:- বিভিন্ন কারনে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে ইমেজ সংকটে পতিত হয় । অনেক বিদেশী পর্যটকরা আসে এদেশের সাথে কোন ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধা আছে কিনা তা দেখতে। তৎসঙ্গে তারা জানতে ও দেখতে চায় এদেশের সার্ভিস ব্যবস্থাটা কতটুকু মানসম্পন্ন ও বিশ্বস্ত। ঘাটে ঘাটে ফাইল আটকানো, অহেতুক সময়ক্ষেপনের বাহানা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, অতিরিক্ত তোষামোদ ইত্যাদি বিয়য়গুলি যখন তাদের জ্ঞানে ধরা পড়ে তখন তারা হতাশা ও বিরক্তিতে আমাদেরকে একটি অলস, বখাটে, জাতি হিসেবে মন্তব্য করে।

৩. পর্যটকদের নিরাপত্তাহীনতা:- নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে দেশের মানুষই দেশের অন্যত্র পর্যটনে বেরোয় না, আর বিদেশীরা তো আসবেই না । সবচেয়ে বড় যন্ত্রনা শুরু হয় যখন একজন বিদেশী এয়ারপোর্ট এসে নামে। হয়রত শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর এর ভিতরে যাত্রী হয়রানি, লাগেজ চুরি, পকেট মার, ছিনতাই নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার। নিরাপদ ট্যাক্সি পর্যন্ত নেই।

৪. উন্নত সুযোগ সুবিধার অভাব:- যেমন আকর্ষনীয় রিসোর্ট, যোগাযোগ অবকাঠামোর অনুন্নত অবস্থা ।নতুন হোটেল/ রিসোর্ট তৈরী হচ্ছে, তারা বেশী টাকা দিয়ে কর্মী নিয়ে যাচ্ছে আরেক হোটেল/ রিসোর্ট থেকে ফলে কোন না কোন প্রান্তে শূন্যতা থেকেই যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা দালান বানাতে যেভাবে বিনিয়োগ করছেন কর্মী বানাতে নয়। ফলে আন্তর্জাতিক মানের দালানকোঠার ভেতরে মফস্বল মানের সার্ভিস ও ব্যবস্থাপনার সংকট ঘুরপাক খাচ্ছে।

৫. উন্নত যোগাযোগ ব্যাবস্থার অভাব:-বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যাবস্থা তেমন উন্নত নয় । অধিকাংশ রাস্তা দুর্ঘটনা প্রবন ।পর্যটকদের জন্য বিশেষ কোন যোগাযোগের ব্যাবস্থা নেই ।পরিবহনগুলোতে মানুষ বাদুর ঝুলা হয়ে যে ভাবে যাতায়াত করে তা দেখে একজন বিদেশী পর্যটকের বুকের হৃদস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে যায় ।

৬. পর্যটন কূটনীতির অভাব:-কুটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে পর্যটন ও পর্যটন শিল্পের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়না ।

৭. পর্যটন শিল্পের বিকাশে গণমাধ্যমকে সমন্বিত কর্মসূচির অভাব:-আমাদের গনমাধ্যম পর্যটন শিল্পকে সেভাবে কাভারেজ ও ফোকাসিংয়ে নিয়ে আসে না । আই সি সি বিশ্বকাপের সময় ছোট্ট একটি ডকুমেন্টারির মাধ্যমে বাংলাদেশের পরযটনকে দারুনউপস্থাপন করা হয়েছিল । মিডিয়ার উদ্যোগ তেমন পর্যাপ্ত নয় । পর্যটন শিল্পের উপাদান ও ক্ষেত্রগুলো দেশে ও বিদেশে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের অধিকতর বিকাশ ঘটানো সম্ভব।

৮. উন্নত আবাসন ব্যবস্থার সংকট:-ভাল ও উন্নত হোটেল ব্যাবস্থাপনার অভাব এখনও বিদ্যমান ।বিদেশিরা শহরের কোলাহল অপেক্ষা কিঞ্চিত নিরিবিল এবং ছায়াঘেরা আবাসস্থল তাদের অনেক বেশী পছন্দ। সমুদ্র সৈকতে অবস্থিত আবাসিক হোটেল একচেটিয়া ভাবে সকলে পছন্দ করেনা। আমাদের দেশে আন্তর্যাতিক মান সম্পন্ন হোটেল ব্যতীত যে সকল ইকোনমি (নায্য ভাড়া) হোটেল ও উন্নত হোটেল আছে সেগুলো বিদেশীদের কাছে পছন্দের তালিকায় নেই। এর কারণ হিসেবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে হোটেল গুলোর আবাসিক পরিবেশ এবং সার্ভিস কোনটাই উন্নত মানের নয়। ।

৯. জীব বৈচিত্র ও প্রাকৃতিক সৈন্দর্যের যথাযথ সংরক্ষণ না করা:-দেশে প্রয়োজনীয় পর্যটন বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, কুয়াকাটা, সুন্দরবনের সমুদ্রসৈকত সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার। সুষ্ঠু বর্জ্যব্যবস্থা না থাকায় জাহাজ ভ্রমণকালে পর্যটকেরা তাদের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি সমুদ্রে ফেলে পরিবেশদূষণ করছে। প্রবালের ফাঁকে এসব দ্রব্যাদি জমে একধরনের নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি করছে।

কোরালের ওপর বালুর আস্তর জমে যাচ্ছে। অনেকে কোরাল কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।একই অবস্থা রাঙ্গামাটির সুভলং ঝরনা এবং বান্দরবানের শৈলপ্রপাত এবং বগা লেকে বিদ্যমান। বাংলাদেশের অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনও রক্ষা পায়নি অবকাঠামো বিশেজ্ঞদের হাত হতে। সুন্দরবনের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আয়োজন চলছে পুরোদমে।

এছাড়াও বাংলাদেশের ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা,পর্যাপ্ত গাইড ও গাইডবুকের অভাব বিদেশী পর্যটকদে নিরুৎসাহিত করে ।

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা সমুহঃ

আমাদের পর্যটন শিল্পে শুধু সমস্যা বেষ্টিত নয় । এখানে অবারিত সম্ভাবনাও রয়েছে ।পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মাস্টার প্ল্যান নিয়ে যদি কাজ করা যায় তাহলে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা যাবে। এছাড়া এ শিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা।

এ ছাড়াও যে সম্ভাবনাগুলোকে পুঁজি করে আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি, সেগুলো হল-

১. পর্যটন করপোরেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সাল নাগাদ জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১ হাজার ৯৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এটা হবে বৈদেশিক আয়ের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থানের সংখ্যা বেড়ে ৩৭ লাখ ৯১ হাজারে উন্নীত হবে।

২. প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশে পর্যটকদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আবাসন সুবিধা, অবকাঠামো সংস্কার, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ২০২১ সালে বাংলাদেশের পর্যটন খাত দেশের অন্যতম সমৃদ্ধশালী শিল্পে পরিণত হবে । বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে গড়ে পাঁচ লাখ পর্যটক এসেছে বাংলাদেশে।

৩. বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে PPP এর মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এছাড়া কক্সবাজারে একান্ত টুরিস্ট জোন প্রকল্প, ট্যুরিস্ট পুলিশ বাহিনী গঠন করেছে। এছাড়া নুতন নুতন প্রকল্পের মধ্যে অবহেলিত কিন্তু টুরিজম বান্ধব প্রকল্পের মাধ্যমে ট্যুরিজম স্পট সৃষ্টি করেছে যা পর্যটনের জন্য ইতিবাচক।

৪. ২০১১ সালে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১.৮ শতাংশ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। আশা করা যাচ্ছে, ২০২৩ সালে মোট জনসংখ্যার ৪.২ শতাংশ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এই শিল্পের মাধ্যমে।

৫. বর্তমান সরকার ২০১২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে পর্যটন করপোরেশনের প্রমোশন এবং বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য। বাংলাদেশ ২০১২ সালে শুধু পর্যটন শিল্প দিয়ে ১০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার রাজস্ব আয় করেছে। গত বছরও এ খাত থেকে রাজস্ব আয় বেশ সন্তোষজনক।

৬.World Tourist Organization তথা বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (WTO) পর্যটন শিল্পের জন্য অপরিহার্য যেসব উপাদানের কথা উল্লেখ করেছে, যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যম-ন্ডিত স্থান, পাহাড়-নদী-অরণ্য, সমুদ্র সৈকত, মানুষের বিচিত্র জীবন ধারা, বন্য প্রাণী, নানা উৎসব ইত্যাদি তার সবই বাংলাদেশে বিদ্যমান।

৭.এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশ পর্যটন শিল্পকে দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহন করেছে । আমাদের দেশেও এ শিল্পকে দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার গ্রহন করা যেতে পারে

৮.পর্যটকদের বিমানবন্দর স্থল বন্দরে ভিসা অন এয়ারভাইলসহ যাবতীয় কার্যক্রম সহজীকরনের জন্য সরকার মন্ত্রনালয়কে নির্দেশ প্রদান করেছে । তা ছাড়াও অনলাইন পর্যটন প্রচারণা হচ্ছে । মন্ত্রনালয় ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পৃথকভাবে দুটি দৃষ্টি নন্দন ওয়েবসাইট রয়েছে ।

বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে আমরা পর্যটন শিল্পকে স্বপ্নের অবস্থানে দেখছিনা । কতিপয় সমস্যা আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পকে কাংখিত অবস্থান থেকে দুরে রেখেছে । তবে একথা সত্য যে, আমাদের পর্যটন শিল্পে সমস্যা বিদ্যমান থাকলেও সম্ভাবনা অনেক । সমস্যা সমূহ দূরীভূত হলেই আমরা এ সম্ভাবনাময় শিল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারব । আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে একধাপ ।