|
এই সংবাদটি পড়েছেন 2,324 জন

মানুষ এবং মানবতার পাশে সেনাবাহিনী, পুরো বাংলাদেশ

নাঈম চৌধুরীঃ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের মুখে গত ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ৪ লাখ ২২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, রেজিষ্ট্রেশন ও সুষম ত্রাণ বিতরণে কাজ শুরু করেছে দেশের আপামর জনসাধারণের গর্বের ধন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

রোববার ভোরের আলো ফুটতেই মাঠে নেমে গেছেন সেনাসদস্যরা। টেবিল পেতে বসে গেছেন ত্রাণ গ্রহণে। আসতে শুরু করেছেন ত্রাণদাতারাও। সকাল ৭টার দিকে উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে এই চিত্র দেখা গেছে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে ৮০ বস্তা চাল নিয়ে আসেন কাজী মাসুদ পারভেজ। একই সময়ে বাসে করে আসে কাপড়ও। খাদ্যবাহী আরও একটি পিকআপ ভ্যান আসে। তিনটি গাড়িতে আসা ত্রাণদাতারা সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে সেনাক্যাম্পে ত্রাণ জমা দিয়েছেন। তিনটি ডকুমেন্টে সেই ত্রাণসামগ্রীর তালিকা লিপিবদ্ধ করে সেগুলো নেয়া হচ্ছে অস্থায়ী গুদামে। এরপর নির্দিষ্ট বস্তায় ভরে পাঠানো হচ্ছে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে।

গত শুক্রবার থেকে কাজ শুরু করলেও শনিবার সকাল থেকে পুরোদমে কাজ করতে দেখা গেছে সেনাসদস্যদের। উখিয়ার কুতুপালং থেকে টেকনাফের নয়াপাড়া পর্যন্ত একযোগে কাজ শুরু করেছেন সেনাসদ্যরা। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সেড নির্মাণ, ক্যাম্প গুলোতে যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধার জন্য রাস্তা নির্মাণ, পর্যাপ্ত টয়লেট নির্মাণ, পয়নিষ্কাশন, রেজিষ্ট্রেশন কাজে সহযোগিতা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করছেন সেনাসদস্যরা। সেনাবাহিনীর রামু ১০ ডিশিনের জিওসি মেজর জেনারেল মাকসুদুর রহমানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

মিয়ানমারে শিক্ষাবঞ্চিত রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিরী অবদান সম্পর্কে অজ্ঞ। যারা শিক্ষিত, তারা কিছুটা হলেও জানেন। আর এখন বাস্তবে দেখছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মহানুভবতা।

মোহাম্মদ আয়ুব নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদারতার কথা আমরা শুনেছি। এখন সরাসরি দেখছি। তিনি আরো বলেন ‘বাংলাদেশের সেনাবাহিনী অসম্ভব সুশৃঙ্খল ও আন্তরিক। বর্মি সেনারা আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। আর বাংলাদেশের সেনারা ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দিচ্ছে।’

রোহিঙ্গারা চিরদিন বাংলাদেশের মানুষ ও দেশটির সেনাবাহিনীর অবদান মনে রাখবে বলেও জানান মোহাম্মদ আয়ুব।

সরেজমিনে দেখা যায়,  ৩৬ বীর, ২৪ বেঙ্গল ও ৬৩ বেঙ্গল নামে ৩টি টিম রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ও থাইংখালী দায়িত্ব পালন করছে। ক্যাম্প কমান্ডার মেজর মো. রাশেদ আকতার বলেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত মতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় এসে সেনা সদস্যরা সড়কে শৃংখলা আনতে কাজ শুরু করে। অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও বিচ্ছিন্ন ত্রাণ বিতরণ এবং রাস্তায় রোহিঙ্গাদের অহেতুক জটলা সরিয়ে দিয়ে সড়ক যোগাযোগ নির্বিঘ্ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এরপর কন্ট্রোল রুমে জমা হওয়া দ্রুত পচনযোগ্য  খাবারগুলো আলাদা করে বিতরণ করা হবে। বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আওতায় আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে এসব ত্রাণ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, কাজের সুবিধার্থে উখিয়া ডিগ্রি কলেজের পরিত্যাক্ত একটি কক্ষকে কোম্পানির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইএসপিআর সূত্রে জানাগেছে, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের নিজ দেশে বাস্তুচ্যুত হওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার উখিয়া-টেকনাফের যে ৪ হাজার একর জমি নির্ধারণ করে দিয়েছে সেখানে সেনাবাহিনী তৈরি করবে শেড, চলাচলের রাস্তা, সুপেয় পানি ও পয়নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। শুধু উখিয়াতেই তারা নির্মাণ করবেন ১৪ হাজার শেড। এসব শেডের প্রতিটিতে ৬ জন করে ৮৪ হাজার পরিবারকে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া হবে জানাগেছে। শেড নির্মাণের পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনাও রেজিষ্ট্রেশন কাজে অংশ নিচ্ছেন সেনাবাহিনী।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, শেড নির্মাণসহ সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে গতকাল শনিবার থেকে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এছাড়া রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কাজেও সহায়তা করছে তারা।

উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠ ছাড়া টেকনাফেও একটি ত্রাণ গ্রহণের ক্যাম্প খুলেছে সেনাবাহিনী। উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে সেনাসদস্যদের অস্থায়ী তাঁবু তৈরিতেও ব্যস্ত দেখা গেছে। সময় যত দিনের দিকে গড়াচ্ছে বাড়ছে সেনাসদস্যদের হাঁকডাকও। ত্রাণদাতারাও আসছেন দলে দলে। মানুষ এবং মানবতার পাশে সেনাবাহিনী, পুরো বাংলাদেশ।