|
এই সংবাদটি পড়েছেন 898 জন

পাঁচ নির্মাতার চোখে একজন হুমায়ূন আহমেদ

ডেইলি বিডি নিউজঃ গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নির্মাতা– পরিচয়গুলো একে একে জমে আছে যার নামের সাথে তিনি হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর ৬৭তম জন্মদিনে বেশ কয়েকজন নির্মাতার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো, নির্মাতা হুমায়ুন আহমেদ কিংবা গল্পকার হুমায়ুন আহমেদ কেমন তাদের ভাবনায় – এই কথাটুকু জেনে নিতে। আর বাকিটুকু আপনাদের জন্য-

যতটা গভীরতা তাঁর লেখায় ততটা চলচ্চিত্রে পাওয়া যায় না
মোরশেদুল ইসলাম

জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের পর তার “অনিল বাগচির একদিন” উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। চলচ্চিত্রটির প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন-প্রসঙ্গে নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম জানান- ‘ভালো নির্মাতা বলা চলে তবে লেখালেখির মতোন চলচ্চিত্র তার দখলে ছিল না। উনি মধ্যবিত্ত দর্শককে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন। ইতিবাচক দিক হল মধ্যবিত্ত দর্শক হলমুখী হয়েছিল। ‘আগুনের পরশমনি’, ‘শ্রাবন মেঘের দিন’ এ চলচ্চিত্রগুলোর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে উনার নির্মাণ প্রসঙ্গে।’

কথায় কথায় ‘অনিল বাগচীর একদিন’ উঠে এলে জানা যায় গল্পটি নির্মাতাকে আকৃষ্ট করেছিল। এ ঠিক গতানুগতিক মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার প্রচেষ্টা – এ গল্পের বৈশিষ্ট্য। গল্পকার হুমায়ূন আহমেদ মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরতেন। নির্মাতা জানান, দায়সারা গোছের কিছু লেখা যদিও আছে তবুও তিনি এমন কিছু লিখে গেছেন যা বাংলা সাহিত্যে তেমনভাবে কেউ লিখেনি। জনপ্রিয় হতে পারার যে ক্ষমতা তার জন্যও তো মেধা লাগে। যে কেউ ইচ্ছে করলেই তো আর জনপ্রিয় হতে পারছে না তাইনা? সব শেষে মোরশেদুল ইসলাম জানান – ‘আমার মনে হয়েছে সব সময় হুমায়ুন আহমেদ শখের বশে চলচ্চিত্র করতে এসেছিলেন, যতটা গভীরতা তাঁর লেখায় ততটা চলচ্চিত্রে পাওয়া যায় না। তবু তার মধ্যেও আমাদের কিছু মনে রাখার মতো কাজ দিয়ে গেলেন।’

আরও সিরিয়াস জায়গা থেকে কাজ করার ক্ষমতাও তাঁর ছিল
আবু সাইয়িদ

‘নিরন্তর’ চলচ্চিত্রটি হুমায়ূন আহমেদ-এর গল্প অবলম্বনে নির্মিত। নির্মাতা আবু সাইয়িদ বলছিলেন অতীতের কিছু গল্প – ‘১৯৮৭ সালের কথা। বুঝতে পেরেছিলাম হুমায়ূন আহমেদ নির্মাতা হিসেবে কাজ করবেন। তখন তিনি শহীদুল্লাহ হলের হাউজ টিউটর। বলতেন প্রায়ই একটা কথা যে উনার অন্য গল্পগুলো দিলেও ‘আগুনের পরশমনি’ উনি কাউকে দিবেন না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণকে তখনও উনি ঠিক অতোটা সম্মানের সাথে না দেখলেও একটা আবেগ কাজ করতো উনার মধ্যে।’

‘নিরন্তর’ এর জন্য গল্প নির্বাচন প্রসঙ্গে নির্মাতা জানান – প্রথম গায়ক সেলিম চৌধুরী খোঁজ দিয়েছিলেন ‘জনম জনম’ গল্পটির। পরে তিথি চরিত্রবিষয়ক যে অংশ তা নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করি। মধ্যবিত্তের চরিত্র চিত্রায়নের ক্ষমতা ছিল তাঁর অসাধারণ। আরও সিরিয়াস জায়গা থেকে কাজ করার ক্ষমতাও তাঁর ছিল। উনার নিজস্ব এক ধরণ আর বোধ ছিল। সাহিত্যিক হুমায়ূন , চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন, টেলিভিশন নাটক নির্মাতা হুমায়ূন – একেকজন একেক রকম।

হুমায়ূন আহমেদ-এর সেই ক্ষমতা ছিল চলচ্চিত্রের ভাষাকে বোঝার, আরেকটু যদি সময় দিতেন চলচ্চিত্র মাধ্যমটিকে, বিশ্লেষণ করতেন বিস্তারিতভাবে তবে আমরা অনেক ভালো কাজ পেতাম।

চলচ্চিত্রেও হুমায়ূন তার গল্প বলার ধরণটাকেই কাজে লাগিয়েছেন
প্রসূন রহমান

‘সুতপার ঠিকানা’ খ্যাত নির্মাতা প্রসূন রহমান বলেন – ‘নির্মাতা হুমায়ূন এর কথা যদি বলতে হয় তবে ‘আগুনের পরশমনি’র কথা বলবো। সেখানে যে নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ কে আমরা পেয়েছিলাম পরবর্তীতে এসে উনার অভাব বোধ করেছি আসলে। গল্পকার হিসেবে গল্পে উনি যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন চলচ্চিত্রে সে মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেন নি।’

এই নির্মাতা উপন্যাস ছাপিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এর ছোট গল্পের দারুণ ভক্ত। গল্পকার হুমায়ূন আহমেদ এর কথাই তিনি বললেন তাই – গল্প বলবার জায়গা থেকে উনি অসাধারণ ছিলেন। ছোট্ট অনুষঙ্গ নিয়ে গল্প হয়, জীবন ঘনিষ্ঠ গল্প তা তিনি দেখিয়েছেন। গল্প বলবার জায়গায় যে জাদুকরী ক্ষমতা নিয়ে উনি জন্মেছিলেন তা ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে দেখাতে পারেন নি। আমরা জীবন ঘনিষ্ট চলচ্চিত্রকে টেলিফিল্ম বলে বসি আজকাল, টেলিভিশন এই ক্ষতিটা আমাদের করেছে। চলচ্চিত্রেও উনি কিন্তু সেই গল্প বলার ধরণটাকেই কাজে লাগিয়েছেন। উনার ভাববার ক্ষমতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা অন্য জায়গায় ছিল। উনি নিজের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ‘আগুনের পরশমনি’ দিয়ে যে জায়গায় গিয়েছিলেন সে জায়গায় আর কোন দিন হয়তো তিনি নিজেও যেতেই চান নি। একটা কথা মনে পড়ে গেল, ‘আগুনের পরশমনি’র জন্য পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন – ‘পুরস্কার পেলে সবার আনন্দ হয়, আমারও হচ্ছে। কিন্তু আমি গর্বিত নই। এখানে অনেক আজেবাজে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, আমারটা একটু কম খারাপ তাই আমি পুরস্কার পেলাম।’

উনার নিজের সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট ছিল সবসময়। তিনি তো ‘জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প’ লিখেছেন, কে জানে বেঁচে থাকলে হয়তো চলচ্চিত্র নিয়েও আরও কিছু ভাবতেন পরবর্তীতে।

হুমায়ূন আহমেদ সবসময় মানুষকে প্রাধান্য দিয়েছেন
অনিমেষ আইচ

সৎ নির্মাতা, ভীষণরকম সৎ। – নির্মাতা হুমায়ূন সম্পর্কে বলছিলেন এসময়ের চলচ্চিত্র নির্মাতা অনিমেষ আইচ। তার ভাষায় – ‘হুমায়ূন আহমেদ যা বুঝতেন তাই করতেন। তাঁর কাজের একটা স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। অন্যদিকে গল্পকার হুমায়ূন আহমেদ অনেক জটিল কথা সহজভাবে বলেছেন। অনর্থক জটিলতা সৃষ্টি করতে তিনি কখনোই পছন্দ করেন নি। বাচ্চা ছেলে থেকে পরিনত মানুষ সবাই বুঝতে পেরেছে তাঁর ভাষা – এ তো কম কথা নয়। হুমায়ূন আহমেদ সবসময় মানুষকে প্রাধান্য দিয়েছেন। দেখেছি কাজের সময় স্ক্রিপ্ট পড়তে পড়তে বলেছেন ‘এই চরিত্র এইভাবে কথা বলবে।’

লাইট, সেট এগুলোর চেয়ে মানুষ, মানুষের উপস্থিতি তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে হ্যাঁ এটা বলতে হয় যে নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ এর চেয়ে গল্পকার হুমায়ূন আহমেদ আমাদের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

অনিমেষ আইচ ভাবেন, যারা বলেন হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয়তার মোহে আবিষ্ট ছিলেন তারা হিপোক্রেট – দেখুন কে না হতে চায় জনপ্রিয়? আপনি আজ পুরস্কার পেলে খুশি হবেন না? আমি হবো না যদি নির্মাতা হিসেবে পুরস্কার পাই? যে শিল্পী বলে সে প্রাপ্তির জন্য কাজ করে না সে সত্যি কথা বলে না। আমি এটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখি। হুমায়ূন আহমেদ জানতেন তিনি কী করছেন আর তিনি কি চাইছেন।

‘আগুনের পরশমনি’ ছাড়া আর কোথাও হুমায়ূনের ভারিক্কি নেই
মাহমুদ দিদার

‘নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ কখনোই নির্মাতা হয়ে উঠতে পারেন নি। যে ভারিক্কি লেখায় ছিল, ব্যক্তি হুমায়ূন যে জায়গা দখল করে থাকেন নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ সে জায়গায় শুধুমাত্র ‘আগুনের পরশমনি’ ছাড়া আর কোথাও নেই।’ – বলছিলেন মাহমুদ দিদার। এই নির্মাতা ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন কিশোর-কাল পর্যন্তই কেবল হুমায়ূন আহমেদ এর সাহিত্য মানুষকে ভাবাতে পারে। তবে হুমায়ূন আহমেদ এর বেশিরভাগ লেখা সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে ইলিয়াস, কামু, কাফকা কিংবা যদি বলি বৈশ্বিক যে সাহিত্য-ভাষা তার কাছে হুমায়ূন ছিলেন না। হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের জন্য সাহিত্য করেছেন। এই লেখকের সূচনার সাহিত্য প্রণিধানযোগ্য কিন্তু জনপ্রিয়তার মোহ তাঁর জন্য কিছুটা নেতিবাচক প্রমাণিত হয়েছে।

ইতিবাচক দিক হল, একজন পাঠক বই শুরু করে শেষ করছে বাংলাদেশের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটা এক পাওয়া যা হুমায়ূন আহমেদ-এর লেখা করতে পেরেছিল। মানুষ বই পড়ছিল। কিন্তু সেই পড়ার ফল কতটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল পাঠকের চিন্তা-ভাবনার বিকাশে সেটাই প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.