|
এই সংবাদটি পড়েছেন 8,913 জন

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টঃ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিউক্লিয়াস

চৌধুরী মিনহাজঃ ‘সৌম্য, শক্তি, ক্ষিপ্রতা’- এ মূলমন্ত্রে দীক্ষিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময় এবং ঐতিহ্যপূর্ণ। ঐতিহ্যবাহী এই রেজিমেন্টের ডাকনাম বা উপাধি হল “The Tigers”। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী এ রেজিমেন্টের ইতিহাস আমাদের প্রিয় সেনাবাহিনীর চেয়েও পুরানো, যার সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে। তবে বর্তমানে এই রেজিমেন্টের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, প্রত্যেক বাংলাদেশীর কাছেই এক গর্বের বিষয়। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট কে বিশ্বের অন্যতম সাহসী রেজিমেন্ট হিসেবে গন্য করা হয়। প্রায় অর্ধ শতক যাবৎ বিশ্বের একমাত্র বাঙালি ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট এর খেতাব ধরে রেখেছে। মেজর আবদুল গনির হাত ধরে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টই ১৯৭১ সালের মুক্তযুদ্ধ ও বর্তমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনির নিউক্লিয়াস।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাসঃ ব্রিটেন-এর নিকট থেকে ভারতের স্বাধীন হওয়ার ফলশ্রুতিতে ১৯৪৮ সালের ১৫ই ফেব্রুযারী এই বাহিনী গঠিত হয়। স্বাধীনতার চুক্তি মোতাবেক, মুসলিম জনগণকে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান দেওয়া হয়, যা পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গঠিত হয়। নতুন পাকিস্তান সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল প্রধানত দেশের পশ্চিমাংসের মানুষের সমন্বয়ে। পরবর্তীতে পূর্বাংশেও একটি রেজিমেন্ট গঠন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে, বিহার রেজিমেন্ট-এর বাঙালি সৈনিকদের দুটি কোম্পানির সমন্বয়ে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এর ১ম ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হয়। ১৯৫১ সনে জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর ১ম ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক নিযুক্ত হন৷ এর কিছুকাল পরেই ২য় ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মোট ৮টি ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হয়, যার মধ্যে ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম ব্যাটেলিয়ন পশ্চিম পাকিস্তানে গঠন করা হয়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর সামরিক হামলার প্রতিক্রিয়া সরূপ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটেলিয়ন বিদ্রোহ করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করে। প্রথমে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়েই স্বাধীনতা যোদ্ধাদের বাহিনী গঠিত হয়, যা মুক্তিবাহিনী নামে পরিচিত হয়। পরবর্তীতে পশ্চিম পাকিস্তানে রয়ে যাওয়া অংশকে প্রতিস্থাপন করতে অন্যান্য ইউনিট গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এদের নিয়েই নতুন সেনা বাহিনী গঠন করা হয়। অবশ্য ৭ম ব্যাটেলিয়ন ৪৪তম ব্যাটেলিয়ন হিসাবে পাকিস্তান সেনা বাহিনীর ফ্রন্টিয়ার্স ফোর্স রেজিমেন্টে একত্রীভূত হয়, যারা ১৯৭১ সালে ১০ম ব্যাটেলিয়ন গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
 
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অধীনে থাকা বাঙ্গালী সেনা তথা ইস্ট-বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান ছিল অবিস্মরণীয় । পূর্ব-পাকিস্তান বাঙালীদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রেক্ষিতে দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে গঠন করা হয় “ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট(EBR)”। উল্লেখ্য, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্যান্য অনেক ভাগে বাঙ্গালী সেনারা থাকলেও বিপুল আকারে এবং সম্পূর্ণ বাঙ্গালিদের নিয়ে গঠিত পূর্ণ-শক্তির বাহিনী ছিল ইস্ট-বেঙ্গল রেজিমেন্ট। যদিও সত্তরের দিকে এই ইস্ট-বেঙ্গালের সেনাদের মধ্যে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উপস্থিতি দেখে, তা রোধ করতে ফ্রন্টিয়ার-ফোর্সের কিছু সেনাকে আস্তে আস্তে ইস্ট-বেঙ্গলের সেনাদের সাথে মিশিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়, যা কখনোই আলো দেখেনি পুরোপুরি।
 

পাঞ্জাব, বালুচ, বিহার জনগোষ্ঠীর সেনাসংখ্যা যতটা ছিল, তার তুলনায় বাঙ্গালী রেজিমেন্টের সংখ্যা ছিল একেবারেই অপ্রতুল। প্রথম দিকে শুধু একটি ব্যাটেলিয়ন থাকলেও পরবর্তীতে ব্যাটেলিয়ন সংখ্যা উন্নীত করা হয় আটে। ১ম ইস্ট বেঙ্গলকে বলা হত সিনিয়র টাইগার। বাছাই করা চৌকশ বাঙ্গালী সেনা এবং ওসমাণীর ছায়াতে থাকা এই রেজিমেন্ট অচিরেই পরিণত হয় পাকিস্তানের অন্যতম সেরা ব্যাটেলিয়নে। এই ব্যাটেলিয়নে যোগ দেওয়া যেকোনো বাঙ্গালীর জন্য ছিল গর্বের। অল্প দিন পরেই গঠিত হয় ২য় ইস্ট বেঙ্গল, দীর্ঘ ২২ বছর তাদের জুনিয়র টাইগার নাম নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এভাবে একে একে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙ্গালিদের নিয়ে আটটি রেজিমেন্ট গঠন করা হয়, যা পাকিস্তানের তখনকার ৪৪ টি রেজিমেন্টের মধ্য সংখ্যায় ছিল অতি নগণ্য, যদিও বাঙ্গালীরা ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার বৃহদাংশ। পাকিস্তান আর্মিতে বাঙ্গালী সেনাদের উপহাসের দৃষ্টিতে দেখা হলেও এই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের 5th EBR – এর সাহসী সৈনিক এবং অফিসারেরা ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধে অনন্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করে এবং ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে লাহোরকে রক্ষা করে।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মনোগ্রাম।

 
১৯৬৫ পাক-ভারত যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবধানঃ ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ মূলত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল ৬ সেপ্টেম্বর থেকে। এ যুদ্ধে বাঙ্গালি সেনাদের অসাধারণ ভূমিকা বারবার চেপে যেতে চেয়েছে পাকিস্তান। ৬ সেপ্টেম্বর মার্কিন পরামর্শে ভারত হঠাৎ করেই করাচি আক্রমণ করে বসে। এ সময় বাঙ্গালিসেনাদের প্রচ- আক্রমণের মুখে লাহোরের উপকণ্ঠে এসে থেমে যায় ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা। লাহোর প্রতিরক্ষার সেই যুদ্ধ ছিল আধুনিক যুগে বাঙ্গালি সেনাদের অংশ নেওয়া প্রথম সক্রিয় ও সর্বাত্মক যুদ্ধ। এর আগে বাঙ্গালিদের দেখা হতো নন-মার্শাল রেস (অযোদ্ধা জাতি) উদ্ভূত সৈন্য হিসেবে।
 
১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের ৮ টি ডিভিশনের মধ্যে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মাত্র ৪ টি ব্যাটেলিয়নের মাধ্যমে সংগঠিত ছিল। এর অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল আতিক হক। মাত্র এই ৪ টি ব্যাটেলিয়ন নিয়ে তিনি যুদ্ধে যে দক্ষতা দেখান তার জন্য যুদ্ধের পর পাকিস্তান বাধ্য হয় তাদের সর্বোচ্চ সামরিক পদক প্রদান করতে।
 
সে যুদ্ধে পরবর্তীতে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থান পাওয়া প্রায় প্রত্যেক সমরনায়কই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, আবু তাহের, আবুল মনজুরসহ প্রত্যেকেই বীরত্ব দেখান। জিয়াউর রহমান ৪৬৬ জন সৈন্যের একটি বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। সেই বাহিনীই প্রথম ভারতীয় বাহিনীর সামনে পড়ে। তাজুল ইসলাম নামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন এনসিও নিজের বুকে মাইন বেঁধে আগুয়ান ভারতীয় ট্যাংক বহরের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেন।
 
স্থলবাহিনীর পাশাপাশি বিমানবাহিনীতে কর্মরত সেনারাও ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে কৃতিত্ব দেখান। বাঙ্গালি বৈমানিক মোহাম্মদ মাহমুদুল আলমের নাম এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। একটি হীনবল এফ-৮৬ স্যাবর জঙ্গিবিমান দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প্রথম মিনিটেই পাঁচটি ভারতীয় হকার হান্টার বিমান ভূপাতিত করে বিমানযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা রেকর্ড গড়েন। যার মধ্যে প্রথম চারটি ভূপাতিত করেন মাত্র ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে। এটি আজ পর্যন্ত একটি বিশ্বরেকর্ড। পুরো যুদ্ধে তিনি মোট নয়টি ভারতীয় জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করেন। পাকিস্তানে এখনো তিনি একজন জাতীয় বীর হিসেবেই পরিগণিত। ২০১৪ সালে তার নামে পাঞ্জাবের মিয়ানওয়ালী বিমানঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে ‘পিএএফ বেস এম এম আলম’। লাহোরের একটি প্রধান সড়কের নামও এম এম আলম রোড। ঢাকা মিউনিসিপালটি করপোরেশন ৬৫’র যুদ্বের পর তাকে ঢাকায় একটি বাড়ি উপহার দেয়।
 
আরেক বাঙ্গালি বৈমানিক সাইফুল আজমও বীরত্বের সাথে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাথে ডগফাইট করে একটি জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করেন। পরবর্তীতে সাইফুল আজম ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধেও অংশ নেন। সেখানেও তিনি ইসরাইলি বিমানবাহিনীর ত্রাসে পরিণত হন। তিনি যতগুলো ইসরাইলি বিমান ভূপাতিত করেন তা আজও রেকর্ড হয়ে আছে। আজ পর্যন্ত অন্য কেউ একা এতগুলো ইসরাইলি বিমান ধ্বংস করতে পারেনি। সাইফুল আজম বিশ্বের ২২ জন লিভিং ঈগলের একজন বলে বিবেচিত। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ অমীমাংসিতভাবে সমাপ্ত হলেও এর কিছু সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য থেকে যায়। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই বাঙ্গালিদের কপাল থেকে নন-মার্শাল রেসের কলঙ্ক মুছে যায়।
 
বাঙ্গালিদের নন-মার্শাল রেস বা অযোদ্ধা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। বাঙ্গালিদের বিদ্রোহ দমন করে রাখার জন্য ব্রিটিশরা অপপ্রচার চালাত, বাঙ্গালিরা কৃষিকাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে যতটা দক্ষ যুদ্ধে ততটাই অদক্ষ। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ বাঙ্গালি অফিসারই বীরত্ব পদক লাভ করেন। জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক হিলাল-ই-জুররাত লাভ করেন। জিয়ার ইউনিট তিনটি তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক সিতারা-ই-জুররাত ও নয়টি চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক পদক তমঘা-ই-জুররাত অর্জন করে।
 
 
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টঃ মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূমিকা অতুলনীয়। একাত্তরের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ছিল উত্তাল। স্বাধীনতাকামী মানুষের আকাশ ভেদি সেøাগানে প্রকম্পিত। শেখ মুজিবের ডাকে পুলিশ, ইপিআর, সরকারী-বেরকারী চাকরিজীবী থেকে শুরু করে সাড়ে সাত কোটি বাঙালী তখন আনুগত্য প্রকাশ করে তাঁর নির্দেশ মেনে চলছিল। শুধু কর্মরত বাঙালী সেনারা তখনও আনুগত্য প্রকাশের পর্যায়ে ছিল না। তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা চালানোর পর। বাঙালী সেনাদের অনেকে পাকিস্তানীদের হাতে নিহত হন সে সময়েই।
 
বাঙালী সৈনিকদের সমন্বয়ে গঠিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কী পর্যায়ে ছিল ১৯৭১ সালে বা কী অবস্থা হয়েছিল তাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দিকে তাকালে এই প্রশ্ন সামনে আসবেই। এই সৈনিকদের হাল-হকিকত কী দাঁড়িয়েছিল ১৯৭১ সালে সে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোন কাজ হয়নি তেমন। ছিল যারা সহকর্মী; তারাই শত্রুতে পরিণত হয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কাছে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের শীর্ষ কর্তারা কেউ সারেন্ডার করেন, কেউ মারা পড়েন।
 
১৯৭১ সালে পাকিস্তানী শাসন যন্ত্র যখন এদেশের নিরীহ বাঙ্গালীদের হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা করছিল তখন থেকেই বাংলাদেশ অবস্থানকারী এই রেজিমেন্টগুলোর অনেক অফিসার পরিকল্পনা করছিলেন বিদ্রোহ করে বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেওয়ার। এখানে উল্লেখ্য,সামরিক আইনে বিদ্রোহের চেষ্টা,পরিকল্পনার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যোগ্য অপরাধ। কোর্ট মার্শালের ভয় বিন্দুমাত্র দমিয়ে রাখতে পারেনি দেশপ্রেমিক এই সব বীর সেনাদের। পাকিস্তানের তৎকালীন এক মেজর সাদিক সালেকের “Witness to surrender” বই থেকে জানা যায় বাঙ্গালী সেনারা ঊর্ধ্বতন অফিসারের নির্দেশ অমান্য করবে, কিন্তু তারপরও নিজ জাতভাই এর উপর গুলি চালাবে না। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নিশ্চিত জীবন ছেড়ে দিয়ে পরিবার-পরিজনদের পাকিস্তানী বাহিনীর কব্জায় ফেলে এবং মাথার উপর মৃত্যু দণ্ডের খড়গ নিয়ে সেই সব বীর সেনা এবং অফিসাররা শুরু করেন অনিশ্চিত বাংলাদেশের স্বপ্নের উদ্দেশ্যে যাত্রা। এভাবেই শুরু। দেশের টানে,সব কিছু ফেলে শুরু হয় নয় মাসের সংগ্রাম। যেসব সৈনিক এবং অফিসার বিদ্রোহ করেছিলেন তারা শুধু নিজেদের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম নিয়েই সেসময় ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়েছিলেন। বাকী সব জিনিসপত্র তারা ফেলে আসেন এবং যা পরবর্তীতে পাকবাহিনীর সদস্যরা লুণ্ঠন করে। ফলে যারা সেদিন বিদ্রোহ করেছিলেন, যুদ্ধের পর আক্ষরিকঅর্থে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু পর্যন্ত ছিলনা।
 

ব্রিটিশকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বাঙালীর অংশগ্রহণ ছিল নামমাত্র। পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭০ পর্যন্ত তাতে বাঙালীর প্রতিনিধিত্ব ছিল শতকরা ৫ ভাগ। ৯৫ ভাগ পাকিস্তানীর পাশে ৫ ভাগ নস্যি যেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট বা প্রতিষ্ঠানে বাঙালীরা ছিল ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায়। পুরোপুরি বাঙালী সৈনিকের গঠিত কোন ইউনিট বা প্রতিষ্ঠানও ছিল না। একমাত্র পদাতিক বাহিনীর রেজিমেন্টগুলো ছিল পাকিস্তানীদের আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক ভিত্তিতে। প্রাদেশিক ভিত্তিতে সৈনিক রিক্রুটমেন্ট বা নিয়োগ করা হতো। অঞ্চল ভিত্তিতেই নামকরণ করা হয় রেজিমেন্টগুলোর। একাত্তর সালেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চারটি পদাতিক রেজিমেন্ট ছিল। পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, বেলুচ রেজিমেন্ট, ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এগুলোর আবার একাধিক ব্যাটালিয়ন ও ব্রিগেড ছিল। বাঙালীরা অন্য রেজিমেন্টগুলোতে কাজ করার সুযোগ পেত তা নয়। বাঙালী রেজিমেন্টেরও শীর্ষ পদসহ অন্যপদগুলো বাকি তিন রেজিমেন্ট থেকে আসা সেনাদের দখল বা নিয়ন্ত্রণে থাকত। কুমিল্লার বুড়িচংয়ের মেজর জেনারেল গণি বা টাইগার গণি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর কমাণ্ডারদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী

 
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালী সৈনিক সমন্বয়ে গঠিত একমাত্র রেজিমেন্ট ছিল ইস্ট বেঙ্গল। যার ছিল মাত্র ৮ ব্যাটালিয়ন সৈনিক। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল ছিল নাম। এই ৮ ব্যাটালিয়নের মধ্যে ২৫ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের লাহোর, করাচিতে ছিল তিনটি ব্যাটালিয়ন। আর পূর্ববাংলায় ৫টি। এই ৫টি ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়কদের মধ্যে দু’জন ছিলেন বাঙালী। বাকি তিনজন পাকিস্তানী উর্দুভাষী অবাঙালী।
 
প্রথম ইস্ট বেঙ্গল ছিল যশোরে। যার অধিনায়ক বাঙালী লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল জলিল এবং দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল জয়দেবপুরে। অধিনায়ক বাঙালী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদুল হাসান খান। এই দুই রেজিমেন্টের দুই অধিনায়কই পাকিস্তানীদের কাছে বড় কোন চাপ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেন। এই দুই ব্যাটালিয়ন সেনাদের কেউ কেউ পাকিস্তানীদের হাতে নিহত হলেও অধিকাংশই পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
 
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে আওয়ামী লীগ- এমন হিসাবটা পাকিস্তানী সামরিক জান্তাদের ধারণার বাইরে ছিল। ‘বাঙালীর হাতে পাকিস্তানের শাসনভার যে দেয়া যায় না’ এই মতে একাট্টা ছিল সামরিক জান্তারা। তাই তারা ‘পূর্ব পাকিস্তান’ জুড়ে পাকিস্তানী সেনাবহর সংখ্যা বাড়ানোতে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিল। ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানী সেনা ছিল বাংলাদেশে দশ থেকে বারো হাজার। ১৫ মার্চ থেকে এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। সারা বাংলায় পাকিস্তানীদের মাত্র ৪টি ব্রিগেড ছিল। ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানীদের শক্তি ছিল ১৪তম ডিভিশনের কয়েকটি ব্যাটালিয়ন মাত্র।
 
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারত সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এ সময় বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। এই বাহিনী ‘ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়ার্টার্সের’ অধীনে কুখ্যাত লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর নেতৃত্বে ৫টি পদাতিক ডিভিশন ও ১টি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্রিগেডের ছত্রছায়ায় ছিল। শুধু এক লাখ পাকিস্তানী সেনারাই গণহত্যা, বর্বরতা, নৃশংসতাসহ যুদ্ধ করেনি, তাদের সহযোগী হিসেবে ছিল আরও বাহিনী। বাংলাদেশীয় দালাল, চাটুকার, মোসাহেবদের দিয়ে পাকিস্তান বাহিনী গঠন করেছিল এক লাখের বেশি আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী। এছাড়াও ছিল পাকিস্তানী সেনাদের পক্ষে বাংলাদেশে বসবাসকারী তিন লক্ষাধিক অবাঙালী বিহারি মুসলমান। সব মিলিয়ে পাকিস্তানী সেনা সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল নিয়মিত বাহিনীর সৈনিক ১ লাখ ও রাজাকার বদরসহ আধা সামরিক আরও ১ লাখ সদস্য। মানবতাবিরোধী সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে এরা জড়িত ছিল।
 
অপরদিকে জুলাই মাস পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল- ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ হাজার সেনা, রাইফেলসের ১২ হাজার সেনা এবং আনসার, মুজাহিদ, পুলিশ ও ছাত্র স্বেচ্ছাসেবক ছিল মাত্র কয়েক হাজার। অস্ত্র বলতে ৩০৩ রাইফেল, সামান্যসংখ্যক হালকা মেশিনগান এবং নগণ্য ভারি মেশিনগান ও তিন ইঞ্চি মর্টার। পরে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে। নিয়মিত বাহিনী ও গণবাহিনী এবং অন্যান্য বাহিনী মিলিয়ে কয়েক লাখ যোদ্ধা যুদ্ধ করেছিল। শেষে ভারতীয় সেনারা এসে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনী গড়ে তোলাতে সেনা সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়ে।
 
পাকিস্তানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যে তিনটি রেজিমেন্ট ছিল, সেখান থেকে অনেক মেজর, ক্যাপ্টেন পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। বাকিরা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। অনেক বাঙালী সেনা পাকিস্তানীদের হয়ে বাঙালী নির্বাণে নেমেছিল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন, যারা ‘সিনিয়র টাইগার’ নামে পরিচিত তারা সব সেনা, অস্ত্র ও রসদসহ বাঙালী অধিনায়ক লে. কর্নেল রেজাউল জলিলের নেতৃত্বে যশোরের চৌগাছায় অবস্থান করছিল। তারা ২৪ মার্চ থেকেই বার্ষিক ‘ফিল্ড এক্সারসাইজ’ উপলক্ষে সেখানে ছিলেন। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর খবর জানার পরও তারা নির্বিকার ছিলেন। দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের মুক্তিযুদ্ধের সেনা অধিনায়ক মেজর আবু উসমান চৌধুরী দু’দফা পত্র পাঠান লে. কর্নেল জলিলকে। যাতে উল্লেখ করেন, ‘দেশ ও দশের লোকের নিরাপত্তা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বিপর্যস্ত। মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত, জ্ঞানী-গুণী ও ছাত্ররা হতাহত হচ্ছে। তাই এর বিরুদ্ধে আমি আমার ইপিআর বাহিনীকে নিয়ে বিদ্রোহ করেছি। বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি। আর কে কি করছে জানি না। কিন্তু আপনি সিনিয়র, আপনার কাছে সৈন্য আছে, হাতিয়ার আছে, আপনি আসুন, অধিনায়কত্ব গ্রহণ করুন। আমরা সম্মিলিতভাবে এদের হনন করতে সক্ষম হব।’ প্রথম দফা চিঠিটি পেয়ে কোন জবাব না দিলে পরদিন ২৮ মার্চ একই পত্র পাঠালে কর্নেল জলিল পত্রবাহককে ‘পাগলের প্রলাপ’ বলে হেসে উড়িয়ে দেন, কোন জবাব না দিয়ে। এমনকি এ বিষয় নিয়ে পুনরায় না আসার জন্য বার্তাবাহককে সতর্ক করে দেন।
 
কী করলেন এই কর্নেল, পরের দৃশ্যে দেখি তাকে। যশোর সেনানিবাসের পাকিস্তানী কমান্ডারের নির্দেশে কর্নেল জলিল ‘সিনিয়র টাইগার’দেরসহ সব অস্ত্রশস্ত্র ও যানবাহন নিয়ে ২৯ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্ট পৌঁছেন। এবং সব জমা দেন। পাকিস্তানী ব্রিগেড অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার সরদার আবদুর রহিম দুররাণী অস্ত্রগারের চাবি হস্তগত করেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিনিয়র টাইগারদের এর পরের পর্বের ইতিহাস অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক। টাইগার ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘৩০ মার্চ সকাল ৯টার সময় যশোর সেনানিবাসে পাকিস্তানী বাহিনী প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওপর অতর্কিতে তিন দিক থেকে আক্রমণ করে। তার আগে সকালে ব্রিগেডিয়ার দুররাণী ব্যাটালিয়ন অফিসে যান এবং কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জলিলকে বলেন যে, আমাদের ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করা হলো এবং আমাদের অস্ত্রশস্ত্র জমা দিতে হবে। তারপর ব্রিগেডিয়ার আমাদের ব্যাটালিয়ন অস্ত্রাগারে অস্ত্রশস্ত্র জমা করে চাবিগুলো হস্তগত করেন।’ আর একই সময়ে পাকিস্তানী বাহিনী যশোরের পুলিশ লাইন ও ইপিআর সেক্টর সদরে বেপরোয়া আক্রমণ চালায়।
 
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদ থেকে পদত্যাগকারী ও মুক্তিযুদ্ধের নৌ-কমান্ডের উপ-অধিনায়ক আহমদ রেজা ‘একাত্তরের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘কর্নেল জলিলের অধীনস্থ রেজিমেন্ট পাকিস্তানী কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশে যশোর সেনানিবাসে ফিরে যায় এবং সেখানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের ঘিরে ফেলে ও হামলা চালায়। যার ফলে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। মাত্র এক দেড়শ’ সৈনিক কোনমতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তাদের সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন হাফিজ। অবশ্য কর্নেল জলিল ইতোমধ্যে আত্মসমর্পণ করে বন্দিত্বের বিনিময়ে জীবন রক্ষা করতে সমর্থ হন। পাকিস্তানে তিনি লে-কর্ণেল পদে উন্নীত হন। কর্নেল জলিল পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে ক্রীড়া পরিষদের কর্মকর্তা ছিলেন দীর্ঘদিন।
 
২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল জয়দেবপুরে। অধিনায়ক বাঙালি লে. কর্নেল মাসুদের রেজিমেন্টটি ২২ মার্চ থেকেই একরকম বিদ্রোহ করে। মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীর অধীনে রেজিমেন্টটির এই অংশটি এরই মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার আবরারের বাঙালী নিরস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। ২৫ ও ২৬ মার্চ ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট শুরুর পর তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান ছেড়ে সরে যায়। রেজিমেন্টের অপর দলটি মেজর শফিউল্লাহর অধীনে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে ছিল। তারই নেতৃত্বে সেনারা বিদ্রোহ করে। এমন পরিস্থিতিতে লে. কর্নেল মাসুদ স্ত্রী পুত্র কন্যাসহ সেনানিবাসে নিজ গৃহে অবস্থান করছিলেন। তিনিও আত্মসমর্পণ করেন। পুরো নয় মাস তার পরিবারটি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিল মেজর জিয়ার পরিবারসহ। অধীনস্থ রেজিমেন্টের বিদ্রোহের দায়িত্ব তাকে গ্রহণ করতে হবে; তিনি তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু কেন-সে প্রশ্নের জবাব মেলেনি।
 
তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল রংপুরে। যার অধিনায়ক ছিলেন পাকিস্তানী লে. কর্নেল ফজলুর রহমান। এখানে বাঙালী সেনারা সুবিধা করতে পারেনি।
 
চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল কুমিল্লায়। যার অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল খিজির হায়াত খান পাঞ্জাবি। উপ-অধিনায়ক হিসেবে মেজর খালেদ মোশাররফ ২৪ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেয়ার পর পরই তাকে পাঠানো হয় একটি কোম্পানিসহ শমসেরনগর। আরেকটি কোম্পানি মেজর শাফায়েত জামিলের অধিনায়কত্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থান করছিল। ২৭ মার্চ শাফায়াত জামিল অধিনায়ক খিজির হায়াত খানকে আটক করেন। এই দুটি কোম্পানি প্রথমেই বিদ্রোহ করে এবং পাকিস্তানী সেনাদের ওপর হামলা চালায়।প্রায় সবাই যুদ্ধে অংশ নেয়।
 
অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল চট্টগ্রামে। পাঞ্জাবি লে. কর্নেল রশিদ জানজুয়া ছিলেন এর অধিনায়ক। তবে এই ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক ছিলেন বাঙালী মেজর জিয়াউর রহমান। এই বেঙ্গল ব্যাটালিয়নকেও পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানোর জন্য ২৫ মার্চের আগেই আদেশ জারি করা ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানি সেনা একজন পাঞ্জাবি অফিসারের নেতৃত্বে ‘এডভান্সড পার্টি’ বা অগ্রবর্তী দল হিসেবে পাকিস্তানের খাবিয়ান সেনানিবাসে চলে যায়। ব্যাটালিয়নের একটি কোম্পানিকে কর্নেল জানজুয়ার আদেশে ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে গোলাবারুদ খালাস করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়োজিত রাখা ছিল। অবশিষ্টাংশ লে. কর্নেল জানজুয়ার অধীনে ষোলশহর নামক স্থানে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান পাড়ি দেয়ার জন্য দিন গুনছিল। কোন ব্যাটালিয়নকে দেশের এক উইং থেকে অন্য উইং-এ পাড়ি দেয়ার প্রাক্কালে গাড়ি, অস্ত্রশস্ত্রসহ গোলাবারুদ ইত্যাদি জমা দিতে হয় নিয়মানুযায়ী, যা বদলিস্থানে যোগদানের পর পুনরায় পূরণ করা হয়। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের এই ব্যাটালিয়নটির এই অবস্থা তখন। কেবল সৈনিকদের দৈনন্দিন প্রশিক্ষণের জন্য ন্যূনতম গাড়ি ও হাতিয়ার ছিল। এই ব্যাটালিয়নটি পুরোপুরি যুদ্ধোপযোগী ছিল না। সব মিলিয়ে রেজিমেন্টের প্রায় তিনশ’ বাঙালী তখন চট্টগ্রামে ছিল।
 
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের রিক্রুটিং ট্রেনিং সেন্টারটি ছিল চট্টগ্রামের সেনানিবাসে। যার নাম ছিল ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার’ বা ‘ইবিআরসি’। একাত্তরের মার্চে এই সেন্টারে সব মিলিয়ে আড়াই হাজার সেনা ছিল। সেন্টার কমান্ড্যান্ট ছিলেন বাঙালি ব্রিগেডিয়ার এ আর মজুমদার। আর প্রধান প্রশিক্ষক কর্মকর্তা ছিলেন বাঙালি লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী। এছাড়া সেন্টারে বেশকিছু বাঙালি অফিসার অবস্থান করছিল। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হামিদ ২৪ মার্চ পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার আনসারীকে নিয়ে হেলিকপ্টারে চড়ে চট্টগ্রাম যান। চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ ভার প্রদান করেন আনসারীকে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের স্থলে। আর মজুমদার ২৫ মার্চ আটক হন এবং পুরো নয় মাস বন্দী জীবন কাটান।
 
২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে বন্দী হন লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী। তিনি পাকিস্তানীদের বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সেনারা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে সেই বিশ্বাসের জবাব দিয়েছিল। চট্টগ্রামে তখন পাকিস্তানী সেনা সংখ্যা ছিল মাত্র শ’তিনেক। আর ইপিআর তথা রাইফেলসের বাঙালী সৈনিকই ছিল প্রায় দেড় হাজার।
 
অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের মাত্র ৩টি কোম্পানি ২৫ মার্চ ষোলশহরে অবস্থান করছিল। পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার আনসারী রেজিমেন্টের অধিনায়ক জানজুয়াকে নির্দেশ দেন, যে কোন মূল্যেই হোক সব অবরোধ পরিষ্কার করতে হবে। নির্দেশানুযায়ী জানজুয়া অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ষোলশহর হতে সেনানিবাস পর্যন্ত সব ব্যারিকেড সরাবার কাজে নিয়োগ করলেন। হাজার হাজার জনতার বাধা সত্ত্বেও সেনারা ব্যারিকেড সরাতে বাধ্য হলো। রাত নয়টার মধ্যে তারা সব সরায়। এই ব্যাটালিয়নকে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত করে রাখা এবং বাঙালী অফিসারদের সৈনিকদের কাছ হতে পৃথক করে রাখা, এমনকি সুযোগমতো হত্যা করার উদ্দেশ্যে ব্রিগেডিয়ার আনসারী ও জানজুয়ারা পরিকল্পনা করে। তাই ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর ষোলশহর থেকে ব্যাটালিয়নের ‘সি’ কোম্পানিসহ মেজর মীর শওকতকে ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মেজর জিয়াকে চট্টগ্রাম বন্দরে রিপোর্ট করার জন্য বলা হয়। এই বাঙালী সেনারাই পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সঙ্গে ইপিআর বাহিনী। এই ব্যাটালিয়নের সব সেনাদের একত্রিত করে অধিনায়কত্ব নিজ হাতে নিয়েছিলেন মেজর জিয়া। তারা পাকিস্তানী বেশকিছু সেনাদের হত্যা করে। এই ব্যাটালিয়নটি চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছিল। তারা ১১ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামকে ধরে রাখে। কালুরঘাটে হেরে গিয়ে পিছু হটে। এখানে ক্যাপ্টেন হারুন আহমদ চৌধুরী গুরুতর আহতাবস্থায় দু’জন সহযোদ্ধার সহায়তায় পেছনে সরে আসেন। আর আহতাবস্থায় লে. শমশের মবিন চৌধুরী পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পড়েন। তিনি পুরো ৯ মাস ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। স্বাধীনতার পর তাকে জার্মান পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্য।
 
মুক্তিযুদ্ধের নৌ-কমান্ডোর উপ-অধিনায়ক আহমদ রেজার মনে হয়েছে, ‘ইবিআরসির অধিকর্তা ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর বন্দী হন। তখনকার অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার সেই সময় ঢাকায় আসার কোন যুক্তিই সুবিবেচিত মনে হয়নি।’ কিন্তু এমনটা কেন হলো, সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একদা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আহমদ রেজা। লিখেছেন, ‘দুটি বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিকর্তা ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের অধিকর্তা- এই তিনজন কেনো এমন বিবেচনাহীন হলেন? জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অপরাধ কি কেবল তাদের? ঢাকা সেনানিবাসে একক কোন বাঙালী ইউনিট ছিল না। তাই ২৫ মার্চ বা তার পরবর্তী সময়ে সেখানে কোন আক্রমণ, প্রতিরোধ বা প্রতি আক্রমণ ঘটেনি।’
 
১৯৭১ এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ জুড়ে পাকিস্তানী সেনার অবস্থান ছিল দশ থেকে বারো হাজার। ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানীদের শক্তি বলতে ছিল ১৪তম ডিভিশনের কয়েকটি ব্যাটালিয়ন মাত্র। সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানীদের ৪টি ব্রিগেড ছিল। এর মধ্যে ঢাকায় ৫৭তম ব্রিগেড, যশোরে ১০৭তম ব্রিগেড, রংপুরে ২৩তম ব্রিগেড, কুমিল্লায় ৫৩তম ব্রিগেড। এই চার ব্রিগেডে যে সেনা ছিল তা তুলনায় বেশি নয়। পদাতিক ব্যাটালিয়ন ছিল ১৫টিÑ যার মধ্যে ১১টি পাকিস্তানী ও ৪টি ইস্ট বেঙ্গল, ১টি আরমার বা ট্যাংক রেজিমেন্ট, ১টি কমান্ডো ব্যাটালিয়ন, ৫টি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ১টি এফ এফ ব্যাটারি বিমান বিধ্বংসী কামান, ২টি মর্টার ব্যাটারি (১২০ মি.মি. মর্টার)। এসব রেজিমেন্ট ৮টি ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করছিল।
 
ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিল ২২তম বেলুচ রেজিমেন্ট, ১টি এফ এফ ব্যাটালিয়ন, ১টি পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন ও ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্যাটালিয়ন (জয়দেবপুর) এবং ২টি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি। চট্টগ্রামে ছিল ২০তম বেলুচ রেজিমেন্ট ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের অংশ। যশোরে ২৭তম বেলুচ রেজিমেন্ট, ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ২২তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং ১টি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি। রাজশাহীতে ২৫তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। সৈয়দপুরে ২৬তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট ও ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। রংপুরে ১টি আরমার (ট্যাঙ্ক) রেজিমেন্ট, ১টি মর্টার ব্যাটারি ও ৬ষ্ঠ বালুচ রেজিমেন্ট। সিলেটে ৩১তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। কুমিল্লাতে ছিল ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ১টি কমান্ডো ব্যাটালিয়ন, ১টি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি ও ১টি মর্টার ব্যাটারি।
 

১৯৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝি হতে পুরো এপ্রিল পর্যন্ত সেনা সংখ্যা বাড়াতে থাকে পাকিস্তান। এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নবম এবং ষোড়শ ডিভিশন দুটিকে বাংলাদেশে আনা হয়। নবমকে পাঠানো হয় যশোর এবং ষোড়শকে উত্তরবঙ্গ। চতুর্দশ ডিভিশন ঢাকা ও ময়মনসিংহ এলাকায় গণহত্যা, নির্যাতন, লুটপাট, ধর্ষণ কাজে নিয়োজিত থাকে। ১৫ এপ্রিলের পর সামরিক জান্তারা ৩৬ ও ৩৯ ডিভিশন দুটিকেও বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এদের বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব দেয়া হয় সামরিক প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাকিস্তানে যে তিনটি রেজিমেন্ট ছিল, সেখান থেকে অনেক মেজর ক্যাপ্টেন পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। বাকিরা ১৯৭৪ সালে দেশে ফেরত আসেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও পুরো যুদ্ধকালে প্রতিরোধ গড়েছিল স্থায়ীভাবে সর্বত্র।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবর্ণ জয়ন্তীতে প্রকাশিত স্বারক ডাকটিকেট

 
এই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টই ছিল পরবর্তীতে গঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রান। ২০০০ সাল পর্যন্ত এই রেজিমেন্টই ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একমাত্র ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট। চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর কারনে যখন পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তাল,তখন এই রেজিমেন্ট এর সদস্যরা বিদ্রোহ দমনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট এর সদস্যরা ইউএন পিসকিপিং মিশনগুলোতে সাফল্যের সাথে অংশগ্রহন করে তারা তাদের যোগ্যতা প্রমান করছেন। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট আমাদের গর্ব, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গর্ব, সমগ্র বাংলাদেশী জাতির গর্ব।
(সংকলিত)