|
এই সংবাদটি পড়েছেন 12,525 জন

মুক্তিযোদ্ধাদের অমর বীরত্বগাথাঃ দ্যা ট্যাংক ব্যাটল অফ শিরোমনি

নাঈম চৌধুরীঃ ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও ঠিক ওই সময় একটি বৃহৎ প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনা। খুলনার শিরোমনিতে পাকবাহিনীর সঙ্গে এই সম্মুখ যুদ্ধের কারণে খুলনা শত্রুমুক্ত হয় একদিন পর অর্থাৎ বিজয় দিবসের পরদিন ১৭ ডিসেম্বর। সমগ্র বাংলাদেশ যখন বিজয়ের আনন্দে উৎসবমুখর দেশের দক্ষিণে তখন চলছে এই সমরের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ। তখনও মাটি কামড়ে খুলনা দখল করে রেখেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি অংশ, বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেছে শক্ত প্রতিরোধ। এদিকে গোটা দেশ মুক্ত করা থেকে মাত্র কয়েক পা দূরে মুক্তিবাহিনী, সেই সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনী। যুদ্ধটা তখন পরিণত অন্যরকম এক সম্মানের যুদ্ধে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য এটা এক মরণপণ লড়াই, আত্মসম্মানের যুদ্ধও বটে। এদিকে সমস্ত পূর্ব রনাঙ্গনে বিপুল বিজয় পেলেও খুলনায় এসেই প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

ঢাকায় যেহেতু নিয়াজি আত্মসমর্পণ করে ফেলেছে এর আগেই, কাজেই এইখানে প্রবল লড়াই আঘাত করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অহমে। অন্যদিকে নয় মাস ধরে গণহত্যার শিকার বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিবাহিনী তখন ব্যাগ্র হয়ে উঠেছে, সারা দেশ সাফল্যের সাথে মুক্ত করতে পারলেও এখানে এসেই আটকে গেছেন তারা। এই যুদ্ধ তখন মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-মরণের লড়াই।

বিভিন্ন কারণে এই যুদ্ধটিকে গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। প্রথম কারণটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী অফিসিয়ালি আত্মসমর্পন করলেও খুলনা তখনও মুক্ত হয়নি; কাজেই খুলনা মুক্ত করতেই হবে। দ্বিতীয়ত, খুলনার এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল ট্যাঙ্ক, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এবং পদাতিক বাহিনীর সমন্বিত অংশগ্রহন। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্মিলিত ভাবেই রণনৈপুন্যের পরিচয় দেয়। এই সময় খুলনার শিরোমণিতে যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধটি সংঘটিত হয়, তার নাম ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ট্যাঙ্কযুদ্ধগুলোর তালিকায় আছে। ব্যাটল অফ শিরোমণি নামে খ্যাত এই যুদ্ধ সম্পর্কে প্রচুর রোমাঞ্চকর গল্প আছে, আছে মিথও। যেগুলোর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সত্য যা জানা যায়, সেটাও কম রোমাঞ্চকর নয়, বরং অনেক গল্পের চেয়েও শাসরুদ্ধকর মনে হতে পারে।

নৌকায় চড়ে অর্জিত পতাকা হাতে নদী পার হচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধারা

যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। বিমান আক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা সহ যশোর ছিল একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশের সাথে যোগাযোগের যশোরের গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্মিলিত বাহিনীর জন্য যশোরকে শত্রুমুক্ত করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তবে এখানে প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয় তাদের, দু’দিন একটানা প্রচণ্ড আক্রমণের পরেও যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছিল কার্যত অক্ষত। জেনারেল আনসারির অধীনস্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫৭ ও ১০৭ ব্রিগেড এখানে বেশ শক্ত প্রতিরোধই গড়ে তোলে। তবে শেষ পর্যন্ত ৬ ডিসেম্বর ভোরবেলা পাকিস্তান সেনাবাহিনী যশোর ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করা শুরু করে, কিছুটা রহস্যজনক ভাবেই। আট তারিখ পর্যন্ত চলে এই পিছু হটা। আনসারি ৫৭ ব্রিগেডকে নিয়ে মাগুরার দিকে অগ্রসর হয়, অন্যদিকে ১০৭ ব্রিগেড এগিয়ে যায় খুলনার দিকে। ১০৭ ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার মালিক হায়াত খান খুলনাতেই অবস্থান করছিল; বস্তুত, খুলনা থেকে নিজের ব্রিগেডকে নির্দেশ দিত হায়াত খান। যশোরে রয়ে গেল একটি ব্যাটালিয়ন, অগ্রসরমান ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীকে বাধা দিতে। প্রশ্ন হচ্ছে, সুরক্ষিত এই দুর্গ ছেড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কেন সরে গেল? এই প্রসঙ্গে আত্মসমর্পনের পর জিজ্ঞাসাবাদে হায়াত খান জানায়, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর আসার খবরে আশান্বিত হয়ে তারা খুলনা হয়ে সাগরের দিকে এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। শক্তিশালী ক্যান্টনমেন্টে থাকা সত্বেও মূলত নিয়াজির দুর্বল নেতৃত্ব ও ভেঙ্গে পড়ার কারণে পাকিস্তানি সৈনিকেরা বাঁচার কোন আশা দেখেনি। শেষ ভরসা হিসেবেই মার্কিন নৌবহরের আশায় যশোর ক্যাণ্টনমেন্ট ত্যাগ করে তারা।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই পশ্চাদপসরণ সব দিক থেকেই অপ্রত্যাশিত ছিল। আট নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুর ওয়ারলেসে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সর্বপ্রথম জানান, পাকিস্তান সেনাবাহিনী যশোর ছেড়ে অতি দ্রুত খুলনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে; তারা সেটা বিশ্বাস করেননি, সঙ্গত কারণেই। প্রায় সব সমর নায়কের ধারণা ছিল যশোর ক্যান্টনমেন্টের পতন ঘটাতে কমপক্ষে এক মাস সময় প্রয়োজন হবে, সেখানে এত দ্রুত তাদের এই হাল ছেড়ে দেয়ার ঘটনা প্রথম ধাক্কায় কেউই বিশ্বাস করতে পারেননি। মেজর মঞ্জুর একজন সংবাদবাহককে পাঠিয়ে আবার খবর পাঠান। এবার টনক নড়ে মেজর জেনারেল দলবীর সিংয়ের, নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে নেন বিষয়টি [২]। ৭ তারিখ সন্ধ্যাবেলায় যশোর ক্যাণ্টনমেন্ট ছেড়ে খুলনার দিকে অগ্রসর হন দলবির সিং।

এদিকে দশ তারিখে তারিখে খুলনার প্রবেশমুখ ফুলতলায় পৌঁছায় হায়াত খান। এখানে সাময়িক অবস্থান নিয়ে কিছুটা দূরে শিরোমণিকে একটি শক্তিশালী দুর্গে পরিণত করতে সচেষ্ট হয় তারা। সৈনিকদের কাজে লাগিয়ে দেয় হায়াত খান, স্থানীয় বাঙালিদের অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে কাজ করতে বাধ্য করে তারা খুলনা শিল্প এলাকার ইস্টার্ন জুট মিল, আফিল জুট মিল, আলীম জুট মিল সহ প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। স্থানীয় কেবল ফ্যাক্টরিতে স্থাপন করা হয় অস্থায়ী সদর দফতর। স্থানীয় পাকা ভবনগুলো থেকে বাসিন্দাদের বের করে দিয়ে ব্যারাকে রূপান্তরিত করা হয়। স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, আটরা গিলাতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল হুদার বাড়িতে বসানো যোগাযোগ দফতর, বসানো হয় অস্থায়ী শক্তিশালী ওয়ারলেস এবং টেলিফোন। একটি অস্থায়ী হাসপাতালও বসানো হয়। সব মিলিয়ে শিরোমণিকে একটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী ক্যান্টমন্টে পরিণত করে হায়াত খানের বাহিনী। ফরিদপুর, পটুয়াখালি, বরিশাল থেকে পালিয়ে আশা দলগুলোকেও এখানে জড়ো করা হয় [৩]। প্রায় ১৫-২০ গজ পরপর বাংকার খনন করা হয়। চারপাশে প্রচুর ভারী অস্থ্রশস্ত্র সহ ৩২ টি ট্যাঙ্ক মোতায়েন করা হয়। এর সাথে ইপিসিএএফ ও রাজাকার বাহিনীর একটি উইং এবং ১৫০ জন আলশামসও ছিল।

অন্যদিকে দলবির সিং যশোর থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছেন, গাইড হিসেবে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছেন মেজর এম এ মঞ্জুর কর্তৃক নিয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। পথে পাকিস্তানিদের রেখে আসা অনেক প্রতিবন্ধক পার হয়ে এসে ১১ ডিসেম্বর ফুলতলা এলাকায় মুক্তিবাহিনীর একাংশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন মুখোমুখি হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর।

মুক্তিবাহিনীর গাইড দল, ভারতীয় ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে শিরোমণিতে রেখে, এই সুযোগে আমরা দেখে আসি খুলনার অন্যান্য অঞ্চল শত্রুমুক্ত করতে কী তৎপরতা চলছে তখন।

ততদিনে খুলনার মূল শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকাসহ জেলার বেশীরভাগ এলাকাই শত্রুমুক্ত হয়েছে, এদিকে ভারতের স্বীকৃতিও পেয়েছে বাংলাদেশ। খুলনায় অবস্থান নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল তখন তুঙ্গে, একমাত্র খুলনা শহর শত্রুমুক্ত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য এখন। খুলনা তখন বিভিন্ন স্থান থেকে সরে আসা পাকিস্তানি সৈনিকদের একটি মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। শিরোমণিতে ১০৭ ব্রিগেড তো এসে গেছেই, এছাড়াও যেসব জায়গায় এসব পাকিস্তানি সৈনিকরা অবস্থান নেয় সেগুলো হলো – গল্লামারী রেডিও স্তেশন, খুলনা লায়ন্স স্কুল, পিএমজি কলোনী, শিপইয়ার্ড, সাত নম্বর জেটি, টুটপাড়া, নিউফায়ার ব্রিগেড স্টেশন, ওয়াপদা ভবন, গোয়ালপাড়া এবং গোয়ালখালি।

এই অবস্থায় খুলনা শহর দখলের জন্য অগ্রসর হওয়ার জন্য মেজর জয়নাল আবেদিন খানকে নির্দেশ দেন মেজর মঞ্জুর। জয়নাল আবেদিন তখন মুজাহিদ ক্যাপ্টেন শাজাহানের অধীনস্থ ২০০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল নিয়ে খুলনায় প্রবেশ করেছেন। তাদের সাথে যোগ দেন কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্পের পতন ঘটয়ে আসা মুজিব বাহিনীর একটি শক্তিশালী দল। তারা একত্রিত হয়ে একটি লঞ্চে করে বটিয়াঘাটা পার হয়ে জলমা চক্রাখালি হাইস্কুল ভবনে ক্যাম্প বানিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। এর মাঝেই, দশ ডিসেম্বর সকালে লঞ্চে বসেই খুলনা আক্রমণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা স্থির করা হয়। মেজর জয়নাল আবেদিনের সাথে এসময় পরিকল্পনা প্রণয়নে অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহ দাদু, শেখ কামরুজ্জামান টুকু, মির্জা খায়বার হোসেন, লেফটেন্যান্ট আরেফিন, ইউনুস আলি ইনু, সাহিদুর রহমান টুকু, স ম বাবর আলী সহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা।

পরাজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র

১৪ তারিখ মংলা থেকে এসে তাদের সাথে যোগ দিলেন খিজির আলি। দুর্ধর্ষ এই নৌযোদ্ধা ডিসেম্বরের ৮/৯ তারিখে পশুর নদীর পশ্চিম তীরে পাকিস্তানিদের একটি ক্যাম্প দখল করে দু’টি সিক্স পাউন্ডার গান ও একটি মেশিন গান দখল করেন। সিক্স পাউন্ডার গান দু’টির ফায়ারিং পিন ছিল না, খিজির আলী নিজস্ব টোটকা উপায়ে ছেনি ও মুগুর ব্যবহার করে অভিনব কায়দায় এগুলোকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন বাংকারে অতর্কিত গ্রেনেড হামলা চালিয়ে পাকসেনাদের হত্যা করে প্রায় ৫০ ক্যান গুলি উদ্ধার করেন। একটি বিকে টাইপ ওপেন বার্জ দখল করে তাতে এই গোলাবারুদ সংযুক্ত করেন খিজির। এর সাথে যুক্ত করা হয় দু’টি স্টিলবডি লঞ্চ – হেমাটাইট ও আলেক্সান্ডার। অনুসরণ করার জন্য দু’টি কাঠের লঞ্চ সংগ্রহ করে তাতে দলের সদস্যদের রাখার ব্যবস্থা করা হয়, এদের নাম ছিল এম এল আকবর ও এম এল ভাটপাড়া। সব মিলিয়ে ছোট অথচ শক্তিশালী একটি নৌবহর গড়ে তোলেন খিজির। অতঃপর ১৪ ডিসেম্বর খুলনা দখলের চূড়ান্ত যুদ্ধে যোগ দেন তিনি।

এই পরিকল্পনাতেই মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের শত্রুর বিভিন্ন অবস্থানে আক্রমণ শানানোর দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুসারে,

১) ফোহাম উদ্দিন ও নোমান উল্লাহ তাদের বাহিনী নিয়ে সেনের বাজার, রাজাপুর ও রূপসা ঘাটের দিক থেকে খুলনা শহর আক্রমণ করবেন। শিপইয়ার্ড, শিপইয়ার্ড হাসপাতাল ও গোয়ালপাড়া এলাকা থেকে যেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আক্রমণ পরিচালনা করতে না পারে সে ব্যাপারেও তারা ব্যবস্থা নেবেন;
২) বোরহান উদ্দিন তার বাহিনী নিয়ে চন্দনীমহল থেকে আক্রমণ করবেন ক্রিসেন্ট জুট মিল, তীতুমীর নৌঘাঁটি ও গোয়ালপাড়া পাওয়ার স্টেশনে;
৩) কুলটিয়াতে অবস্থান নিয়ে রেডিও স্টেশনে আক্রমণ করবেন ক্যাপ্টেন শাহজাহান ও তার বাহিনী;
৪) ঝাড়ডাঙ্গা ও সাচিবুনিয়ার দিক থেকে লায়ন্স স্কুলে আক্রমণের ভার পড়ে আফজাল হোসেন ও কুতুব উদ্দিনের উপর। গল্লামারীর রাস্তা যাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ব্যবহার না করতে পারে সেই ব্যবস্থাও তারা গ্রহণ করবেন;
৫) মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে একটি দলের দায়িত্ব থাকবে ভৈরব নদী পার হয়ে মংলার দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাধা দেয়া;
৬) লেফটেন্যান্ট আরেফিন ও কমান্ডার খিজির আলী একটি গানবোট দিয়ে নদী পথে বিভিন্ন স্থানে শত্রুর অবস্থানের উপরে আক্রমণ চালাবে, স্থলে নিয়োজিত মুক্তিবাহিনীকে প্রয়োজনীয় কভার দেবে;
৭) মেজর জয়নাল আবেদিনের নেতৃত্বে ২০০ মুক্তিযোদ্ধার একটি দল সরাসরি খুলনা শহরে উঠে গিয়ে শহর দখল করবেন। জয়নাল আবেদিনের সহকারী হিসেবে দায়িত্বে থাকলেন স ম বাবর আলী ও রহমত উল্লাহ দাদু।

ঘড়ির কাটায় তখন ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ শুরু হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে আসছেন খুলনার দিকে, চারদিক থেকে চালানো হবে সাড়াশি আক্রমণ। রাত বারোটা নাগাদ যার যার অবস্থানে পৌঁছে আক্রমণ শুরু করল মুক্তিবাহিনীর গ্রুপগুলো। শুরু হয়ে গেল খুলনা দখলের লড়াই।

ফুলতলাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি অংশ যে অবস্থানটি নিয়েছিল, সেটা ছিল মূলত একটি ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে কিছু সময় আটকে রেখে শিরোমণিতে সরে যাওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়। দলবির সিং এই ধোঁকায় বিশ্বাস করেছিলেন কি না সেটা নিশ্চিত করে বলার কোন উপায় নেই, কিন্তু ফুলতলার অবস্থানটিকে দুর্বল না করে সামনে এগিয়ে যাওয়ারও কোন উপায় ছিল না। অতঃপর ফুলতলার উপরে জোরালো হামলা শুরু করেন দলবির সিং। এর সাথে যোগ দেয় ভারতীয় বিমান বাহিনী। এইখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীও বেশ রণকুশলতার পরিচয় দেয়। ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর আক্রমণ বেশ সাফল্যের সাথেই মোকাবেলা করে তারা। উভয় পক্ষেই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ফুলতলা থেকে দৌলতপুরে শিরোমণির দিকে সরে আসে। ফুলতলার যুদ্ধ ১২ তারিখ পর্যন্ত স্থায়ী হয়, এইদিন মধ্যরাতে ফুলতলা থেকে শিরোমণিতে সরে আসে হায়াত খানের বাহিনী।

১৩ ডিসেম্বর ফুলতলা এলেন মেজর মঞ্জুর, সাথে ভারতীয় রাজপুত ডিভিশনের এক বিশাল বহর। তার সাথে মুক্তিযোদ্ধা আলকাস, কুদ্দুস, রেজোয়ান ও গণি এলেন গাইড হিসেবে। ফুলতলার চৌদ্দমাইল এলাকায় অবস্থানরত শিখ বাহিনীর সাথে মিলিত হন মঞ্জুর। এবার চূড়ান্ত আক্রমণের পালা। এই উদ্দেশ্যে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর একটি অংশ ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও ট্যাঙ্ক নিয়ে ভৈরব নদী পার হয়ে অপর পারে অবস্থান নেয় যাতে পাকিস্তানি সৈনিকেরা নদী পেরিয়ে পালাতে না পারে। বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে জরো হওয়া মুক্তিযোদ্ধারা ব্যারাকপুর, লাকোহাটি, সিদ্ধিরপাশা, ধূলগ্রামে অবস্থান নেয় একই উদ্দেশ্যে – শত্রুকে পালাতে দেয়া যাবে না। খুলনা-দৌলতপুরের পশ্চিমের এলাকাগুলোতেও বিপুল সৈন্য সমাবেশ ঘটায় মুক্তিবাহিনী।

১৩ তারিখে একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। মেজর গণি ও মেজর মহেন্দ্র সিং এর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর একটি বিরাট দল শিরোমণিতে ঢুকে পড়ে; তাদের ধারণা ছিল পাক বাহিনী দৌলতপুর থেকে সরে খুলনা শহরে চলে গেছে। জীবন দিয়ে তাদের এই ভুলের মাশুল দিতে হয়। তারা শিরোমণিতে ঢোকা মাত্রই পাকিস্তানি ট্যাঙ্কগুলো গোলাবর্ষণ শুরু করে দেয়। এই অবস্থায় প্রায় কিছুই করার ছিল না তাদের, প্রায় তিনশত ভারতীয় সৈনিক এসময় নিহত হয়। এই বিপুল ক্ষতি মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাদলকে জয়ের ব্যাপারে আরো উদগ্র করে তোলে ।

এদিন দৌলতপুর-শিরোমণি এলাকায় ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইস্টার্ন জুট মিল এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে হাতাহাতি ও বেয়নেট যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ভারতীয় সৈন্যরা, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যরা পরাজিত হয়ে বন্দী হয়। শিরোমণিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চারটি ট্যাংক প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু করলেও ভারতীয় বিমান বাহিনীর আক্রমণে সেগুলো বিদ্ধস্ত হয়। শিরোমণি রেলস্টেশনের কাছে একটি পাকিস্তানি ট্রাক প্রচুর গোলাবারুদ নিয়ে এগিয়ে আসছিল, সেটিকে বিমান থেকে বোমা ফেলে ধ্বংস করা হয়। রেল স্টেশনের কাছেই পোস্ট অফিসে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলাবারুদের একটি গুদাম। প্রচণ্ড বিমান আক্রমণে সেটি গুড়িয়ে যায়। পাক বাহিনীর অস্থায়ী যোগাযোগ দফতর চেয়ারম্যানে নুরুল হুদার বাড়িটি বিমান আক্রমণে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। পাকিস্তান বিমান বাহিনী আগেই ভেঙ্গে পড়ায় ভারতের বিমান আক্রমণের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তবে মুসলিম লীগ নেতা মুনসুর সাহেবের জুট প্রেসে শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসা রাজাকারেরা এসময় গুলি করে বিমান ভূপতিত করার চেষ্টা করে। প্রায় সাথে সাথেই পালটা বিমান আক্রমণে এই ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়ে যায় ভারতীয় বিমান বাহিনী।

যুদ্ধের নির্মম কিন্তু অনিবার্য শিকার কোলাটেরাল ড্যামেজ হিসেবে ট্যাঙ্ক ও বিমান হামলায় প্রাণ হারান এলাকার কিছু সাধারণ মানুষ, ক্ষতিগ্রস্থ হয় কল কারখানা। আহতও হয় অনেকে।

১৪ ডিসেম্বর সারাদিনও প্রচণ্ড যুদ্ধ চলে। তবে এই সময় থেকে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে পাকিস্তানিদের ডিফেন্স লাইন। এর বড় কারণ ক্রমাগত যুদ্ধে গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়া। টানা যুদ্ধ করতে গিয়ে খাবারেও টান পড়েছে। খাদ্য ও গোলাবারুদ সরবরাহের সবকটি লাইন অকেজো করে দেয়া হয়েছে ততক্ষণে। ট্রাক বা গাড়িতে এসব দ্রব্য পৌঁছাবার চেষ্টা করলেও সেগুলো ধ্বংস করা করে দেয়া হচ্ছে। কাজেই শিরোমণিতে অবস্থান নেয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনী তখন সব দিক দিয়েই কোণঠাসা। ১৫ তারিখে যুদ্ধের তীব্রতা কমে আসে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাধ্য হয় যুদ্ধবিরতিতে যেতে। শিরোমণির ঐতিহাসিক যুদ্ধের প্রথম পর্বও সেই সাথে শেষ হলো।

এদিকে ঢাকায় ততক্ষণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু খুলনায় তখনও হাল ছাড়তে নারাজ বিভিন্ন জায়গা থেকে পিছু হটে আসা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দলগুলো। বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে প্রচণ্ড যুদ্ধ। ঢাকায় জেনারেল অরোরার মুখে চিন্তার ভাঁজ, খুলনায় উদ্বিগ্ন দলবির সিং। ব্যাপারটা এখন শুধু একটি এলাকা দখলেই সীমিত নেই, পরিণত হয়েছে ইগোর লড়াইতে। মুক্তিবাহিনীর গ্রুপগুলো তাদের নির্ধারিত অবস্থানে গিয়ে আক্রমণ শুরু করেছে। মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়েছে এলাকাবাসীও।

রাত একটা নাগাদ নিজস্ব নৌবহর ও বাহিনী নিয়ে খিজির আলী পৌঁছলেন মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুরের বাড়ির পেছনে। নদীপথে খিজির আলী এগিয়ে যাবেন তার নৌবহর নিয়ে, আর স্থল্পপথেও সমান্তরালে এগোবেন মেজর জয়নাল আবেদিনের বাহিনী। পরিকল্পনা মেনেই এগিয়ে যেতে থাকেন তারা। খান এ সবুরের বাগান বাড়িতে গোলাবর্ষণ করতে করতে খিজির আলি এগিয়ে এলেন শিপইয়ার্ডের দিকে। শেষ রাতের দিকে শিরোমনি থেকে মেজর মঞ্জুরের কাছ থেকে ওয়ারলেসে নির্দেশ পান জয়নাল আবেদিন ও খিজির। এরপরে শুরু হয় সমন্বিত আক্রমণ।

শিপইয়ার্ড এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি অংশ ট্যাঙ্ক নিয়ে প্রস্তুত ছিল, মুক্তিবাহিনী এসে পৌঁছতেই তারা গোলাবর্ষণ শুরু করে। খিজির আলীর বাহিনীও সমানে জবাব দেয়। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর, খিজির বাহিনীর সিক্স পাউন্ডার গানের সামনে টেকা মুশকিল হয়ে ওঠে পাকিস্তানি সৈনিকদের জন্য। ট্যাঙ্ক ফেলেই পালিয়ে যায় তারা। শিপইয়ার্ড থেকে কিছু সামনে দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির কাছেও কিছু ট্যাঙ্ক মোতায়েন ছিল, একই ভাবে তারাও ট্যাঙ্ক ফেলে পিছু হটে যায়। এর আগে পাকিস্তানি সৈন্যরা বোট ও ফ্লাট ব্যবহার করে রূপসা নদীতে এগিয়ে যাবার পথ বন্ধ করে রেখেছিল। খিজির আলী সেই বাধা সরিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন। নদীর তীরে পাকবাহিনীর যেসব বাংকার ছিল সেগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে আসেন খিজির আলী। জেলা প্রশাসকের বাসভবনের কাছাকাছি এসে শত্রুর গুলিতে নিহত হন খিজির বাহিনীর গানারের হেলপার ইব্রাহিম। আহত হন আরো দু’জন। তবে এই বিপর্যয় সত্ত্বেও তাদের গতিতে ছেদ পড়েনি। বীর দর্পেই খিজির তার গানবোট নিয়ে লঞ্চ টার্মিনালের এসে থামেন, বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করেন খুলনায়। খুলনা শহর দখলের এক পর্ব সমাপ্ত হলো।

ওদিকে জয়নাল আবেদিনের নেতৃত্বে রহমত উল্লাহ দাদু ও স ম বাবর আলী তাদের বাহিনী নিয়ে জলমা চক্রাখালি স্কুল ছেড়ে এগিয়ে আসছে গল্লামারীর দিকে। পথে প্রচন্ড যুদ্ধে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। ভোর ছটা নাগাদ গল্লামারী পৌঁছে যায় এই দলটি। এই সময় অল্পের জন্য জয়নাল আবেদিন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান, বদলে তার হেলমেটটি উড়িয়ে নিয়ে যায় একটি বুলেট। আরো সতর্ক ভাবে এগিয়ে এসে বাগমারায় পৌঁছে যান তারা, পথে আত্মসমর্পণ করে বহু পাকিস্তানি সৈনিক। এসময় এইসব সৈনিকের চোখে মুখে হতাশার ছাপ ছিল স্পষ্ট; জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, নিশ্চিত পরাজয় জেনে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্যই তারা আত্মসমর্পণ করেছে।

এদিকে সেই ভোরে জয়নাল আবেদিনের বাহিনীর গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসছে। শেষ মুহূর্তে এসে বিপর্যয় আশঙ্কা করে হিসেব কষে গুলি খরচ করা শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধারা। তবে এর পরে আর বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি তাদের, অচিরেই তারা হাদিস পার্ক এলাকায় পৌঁছে গেলেন। কাল ৯ টায় হাদিস পার্কে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন বাবর আলী, তার সাথে যুদ্ধজয়ী শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা।

খুলনা শহর ধরতে গেলে তখন পুরোপুরি শত্রুমুক্ত, শুধু শিরোমণিতে চলছে মরণপণ লড়াই।

দ্যা ট্যাংক ব্যাটল অফ শিরোমনিতে পরাজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র

১৫ তারিখ যুদ্ধবিরতির পর আশা করা হয়েছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর যুদ্ধ চালাবে না। তবে এই আশাকে ভুল প্রমাণ করে ১৬ ডিসেম্বর রাত ৯ টায় আবার কেঁপে উঠলো শিরোমণি রনাঙ্গন। এসময় হঠাৎ করেই তীব্র আক্রমণ চালায় হায়াত খানের বাহিনী। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীও পালটা জবাব দিতে শুরু করে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। দুই পক্ষই সমানে গোলাবর্ষণ করছে, দুই পক্ষেই ক্যাজুয়ালিটি হয়ে চলেছে প্রচুর। রাত তিনটার দিকে হঠাৎ আক্রমণ আরো জোরালো করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, হঠাৎ করে একসাথে বেশ কয়েকজন আঘাতের শিকার হন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার সহ ৭ জন্য নিহত ও প্রায় ৩০ জন আহত হয়েছেন। মুক্তিবাহিনীর ক্ষতি হয়েছে আরো বেশী – নিহত ৩১ জন, আহত প্রায় চার গুন। রাত ৩ টা ১০ মিনিটে মেজর মঞ্জুর এয়ার কভারেজ চেয়ে মেসেজ পাঠালেন মিত্র বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে। জানানো হলো, বিমান প্রস্তুত হয়ে আছে দমদম এয়ারপোর্টে, দূরত্ব হিসেব করে বোঝা গেল অন্তত রাতের মাঝে বিমান সাহায্য আসা সম্ভাবনা কম।

প্রচণ্ড বিপর্যয়ের এই মুহূর্তে মেজর হুদাকে সাথে নিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ছুটলেন মেজর মঞ্জুর। সেখানে প্রায় দশ মিনিট ধরে ভারতীয় কমান্ডারের সাথে আলোচনা হয় তাদের। মঞ্জুরের দাবী ছিল, যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে সম্মিলিত বাহিনীর দায়িত্ব তার হাতে ছেড়ে দেয়া হোক। এয়ার কভারেজ ছাড়া এই মুহূর্তে পাকিস্তানি ট্যাঙ্কের সামনে মার খাওয়া ছাড়া উপায় নেই। কাজেই স্ট্র্যাটেজিতে পরিবর্তন প্রয়োজন। দ্বিধান্বিত ভারতীয় কমান্ডার ইতিস্তত করতে থাকলে মেজর মঞ্জুর তার কোমরের বেল্ট খুলে টেবিলে রাখেন, এর অর্থ জয়ী না হয়ে আর ফিরবেন না তিনি। ভারতীয় কমান্ডার ওয়ারলেসে দলবির সিংয়ের সাথে আলোচনা করে শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত বাহিনীর দায়িত্ব তুলে দিলেন মেজর মঞ্জুরের হাতে। বেরিয়ে যাবার আগে তাকে আলিঙ্গন করে শুভকামনা জানাতেও ভুললেন না।

যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসার আগে নিশ্চিত মৃত্যু ধারণা করে এক সৈনিকের কাছে একটি চিঠি রেখে যান মঞ্জুর। এক বাক্যের এই চিঠিতে তিনি শেষ বিদায় নিয়ে নেন তার স্ত্রীর কাছ থেকে।

এবার শুরু হলো চূড়ান্ত যুদ্ধ। পরিকল্পনার নতুন ছকে শিরোমণির ডানে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের কলামটিকে পেছনে সেকেন্ড ডিফেন্স এনে মেজর হুদাকে এর দায়িত্ব দেন মঞ্জুর। ফ্রন্ট লাইনের সম্মিলিত বাহিনীকে শিরোমণির ডানে ডিফেন্সে পাঠিয়ে দেন, বাম দিকের ও পেছনের তিনটি কলামকে ফ্রন্ট লাইনের ডিফেন্সে নিয়ে আসেন। ডানে ও পেছনে সেই ফাঁকা স্থান পূরণ করে সম্মিলিত বাহিনী। প্রধান সড়কের নিচে লুকিয়ে থাকা মিত্র বাহিনীর ট্যাঙ্কগুলোড় দু’টিকে সংকেত অনুযায়ী শিরোমণি-খুলনার প্রধান সড়কে ও ছ’টিকে ডানদিকের নিচু বেতে গাছের সারির পাশ দিয়ে পাক ডিফেন্সের পেছনে দ্রুত গততে পৌঁছে যাবার জন্য প্রস্তুত করেন, প্রচুর ক্যাজুয়ালিটির আশঙ্কা সত্ত্বেও। প্রতিটি ট্যাঙ্কের পেছনে থাকলেন ১২ জন করে সুইসাইড কমান্ডো। এর মাঝেই দ’জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হলেন, আহত হলেন আরো একজন। ভারতীয় বাহিনীরও একজন আহত হলেন।

ভোর পাঁচটার সামান্য আগে শিরোমণিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থানে আঘাত হানলেন মেজর মঞ্জুর। পঁচিশটিরও বেশী ট্যাঙ্ক, দেড় শতাধিক কামান, কয়েক শত মর্টার নিয়ে সবার আগে এসএসআর হাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে শত্রুব্যূহে ঢুকে গেলেন মঞ্জুর। পূর্বের নির্দেশ অনুসারে দু’টি টি-১৬০ ট্যাঙ্ক শিরোমণির প্রধান সড়ক দিয়ে এবং পাঁচটি একই ট্যাঙ্ক ডান দিক থেকে এগিয়ে গেল দ্রুত গতিতে। এরপরেও সব ঝাঁপসা, শিরোমণির সেই দুর্ভেদ্য পাকিস্তানি দুর্গে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর এই সম্মিলিত দলটির কী পরিণতি হলো, তা বোঝার কোন উপায় নেই তখন আর।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পারলেন মেজর হুদা। তার অধীনস্ত সেকেন্ড লাইনকে দ্রুত ফ্রন্টলাইন প্রতিরক্ষার দায়িত্ব বসিয়ে দিলেন। ডান দিক থেকে ছুটে আসছে মিত্রবাহিনীর ট্যাঙ্ক। প্রায় তিন মাইল এলাকা জুড়ে দুই পক্ষের কামান ও ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষণের চিহ্ন ছড়িয়ে পড়লো। আশে পাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা গুঁড়িয়ে যাচ্ছে; প্রবল গোলাবর্ষণের আলোতে আকাশ হয়ে উঠেছে ফর্সা। এর মাঝেই মেজর মঞ্জুর তার বাহিনী নিয়ে লড়ছেন। মেজর মঞ্জুর নিজেই অন্যান্য গেরিলাদের মতো লুঙ্গি পড়ে মাথায় গামছা বেধে বেঁধে শ্রমিকের বেশে দুই হাতে দুইটা স্টেনগান নিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমন করেন। ট্যাংক বহরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে ট্যাংক গুলো থেকে গানম্যানদের টেনে বের করে এনে হত্যা করা হয়। লড়াই চলছে ট্যাঙ্কের সাথে ট্যাঙ্কের, সেই সাথে হাতাহাতি। মুহুর্মুহু সেই আক্রমণের মুখে পিছু হটতে শুরু করে পাকিস্তানি সৈনিকরা। কেউ একজন চিৎকার করে জানিয়ে দেয় – খানেরা পালিয়ে যাচ্ছে। এর পর আর মুক্তিবাহিনী পেছনে তাকায় নি। দ্বিগুন উৎসাহে এগিয়ে গিয়ে গুঁড়িয়ে দিতে থাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুর্গ। ভোর পৌনে ছটা নাগাদ চলে এলো ভারতীয় বিমান বহর। প্রচণ্ড গোলাবর্ষণে শেষ হয়ে গেল ব্রিগেডিয়ার মালিক হায়াত খানের শেষ প্রতিরোধ। ১৫৭ টি মৃতদেহ ও প্রচুর আহত সৈনিক পেছনে রেখে পাঁচ শতাধিক সৈন্য সহ হায়াত খান আত্মসমর্পণ করে মেজর মঞ্জুরের কাছে।

এর সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় শিরোমণির ট্যাঙ্ক যুদ্ধ, একই সাথে সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয় খুলনা। বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পুরোপুরি পরাজিত হলো। এর পর গোটা বাহিনীকে সার্কিট হাউজে নিয়ে আসা হয়, সেখানেই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে। যদিও ঢাকায় আত্মসমর্পণের পরেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই বাহিনীর প্রত্যেকের জন্য মৃত্যুদণ্ডই ছিল প্রাপ্য। কিন্তু যেহেতু ইতোমধ্যেই বিপুল সংখ্যক হতাহত হয়েছে এবং পাঁচশতাধিক সৈনিককে হত্যা করা হলে আন্তর্জাতিক জটিলতাও বাড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, তাই তাদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়া হয়। সার্কিট হাউজে লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে চূর্ণ হয় মালিক হায়াত খানের দর্প, সমাপ্তি ঘটে মুক্তিযুদ্ধের শেষ অধ্যায়টিরও।

অনেক বিখ্যাত সমরবিদ ২য় বিশ্বযুদ্ধের ট্যাংক ব্যাটল অব আল আমিন এর সাথে দ্যা ট্যাংক ব্যাটল অফ শিরোমনির তুলনা করেন। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা, মেজর মঞ্জুরের অসম সাহসিকতা ও যে পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানী বাহিনীকে এ ট্যাংক যুদ্ধে পর্যুদস্ত করা হয় তা আজ ভারত, পোল্যান্ডসহ বিশ্বের ৩৫টা দেশের মিলিটারি একাডেমীগুলোতে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত বিষয় হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এক অন্যতম বীরত্বগাথা এই “দ্যা ট্যাংক ব্যাটল অফ শিরোমনি”।

দ্যা ট্যাংক ব্যাটল অফ শিরোমনি’তে শিরোমনি বাজার ও এর উল্টো দিকে বিসিক শিল্পনগরী ঘিরে কমবেশি চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে এমন কোন গাছ বা ভবন ছিল না যেটি অক্ষত ছিল। প্রতিটি গাছ ও ভবনে শত শত গুলি ও শেলের আঘাতের চিহ্ন ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত দেখা গেছে। আজও কিছু তাল গাছ এবং পুরাতন বড় গাছে সে আঘাতের সাক্ষ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ওইসব গাছ-পালা ও ঘরবাড়ি দেখে মানুষ শিরোমনি যুদ্ধের ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পারতেন।

উল্লেখ্য, অফিসিয়ালী ১৭ ডিসেম্বরকে খুলনা মুক্ত দিবস হলেও ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত খালিশপুর, শিপইয়ার্ড ও লবণচরা থেকে বিক্ষিপ্তভাবে পলাতক পাক সেনাদের আটক করা হয়।

তথ্যসুত্রঃ ইন্টারেন্ট, উইকিপিডিয়া ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন গ্রন্থ