Sun. Apr 11th, 2021

সংগ্রাম, স্বাধিকার ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

রাহাত তরফদারঃ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন। ১৯৪৭ সালের ভারতবর্ষের বিভক্তি ও স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আত্মপ্রকাশ করে।

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সভাকক্ষে এক সাধারণ আলোচনায় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে গঠিত ছাত্রলীগের যাত্রা শুরু হয় আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে। ১৪ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটিতে আহ্বায়ক ছিলেন নাঈমউদ্দীন আহমদ। পরে যখন ছাত্রলীগ পূর্ণাঙ্গভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে তখন দবিরুল ইসলাম সভাপতি এবং খালেক নেওয়াজ প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
 .
ছাত্রলীগ তার প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে অদ্যাবধি প্রায় সাত দশকে বাংলাদেশ ও বাঙ্গালীর সংগ্রাম, অধিকার, স্বপ্ন ও সাহসের অগ্রসারথি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। স্বাধীনতা পূর্ব ২৪ বছর এবং স্বাধীনতা উত্তর ৪৪ বছর মোট ৬৮ বছরের ইতিহাসে সংগঠনটি বাঙ্গালী জাতির স্বাধিকারের ইতিহাসের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 .
১৯৫২ সালের মে মাস পর্যন্ত তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে ছাত্রলীগ ব্যতীত অন্য কোন ছাত্র সংগঠন ছিল না। প্রতিষ্ঠার পরই ছাত্রলীগ ভাষার প্রশ্নে ছিল আপোষহীন এবং এ বিষয়ে ১০ দফা দাবিনামা পেশ করে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্রলীগের আহ্বানে ধর্মঘট সফল করতে গিয়ে পিকেটিং করার সময় গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু ও ছাত্রলীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
 .
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে ছাত্রলীগ অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে ছাত্রলীগের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ গণতন্ত্রের মানসপুত্র শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অবরুদ্ধ করে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে বাধ্য করেছিলেন। যা বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের পথে একটি মাইলফলক। ১৯৫৬ সালের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়, ৫৭ সালের শিক্ষক ধর্মঘটে সমর্থন, ৫৮ সালের আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসির বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে দূর্বার গতি লাভ করে। ছাত্রলীগ ১৯৬৬ সালে ১৪-২০ ফেব্রুয়ারি বাংলা প্রচলন সপ্তাহ পালন করে।
 .
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক উত্থাপিত বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ ৬ দফার সাথে ছাত্রসমাজের ১১ দফা দাবি পেশের মাধ্যমে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ অসহনীয় আন্দোলন গড়ে তুলে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী ছাত্র-গণ আন্দোলন ৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বাঙ্গালীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি লাভের জন্য ৭০এর সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই নির্বাচনে ছাত্রলীগের বিশাল কর্মী বাহিনী অক্লান্ত পরিশ্রম করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফাকে ১ দফার গণভোটে পরিণত করে।
 .
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার প্রাণের সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা দলে দলে যোগদান করেছে। যখন ভাবি, মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের ১৭০০০ নেতা কর্মী শাহাদাৎ বরণ করেছেন তখন গর্বে বুক ভরে উঠে, আমিও সেই সংগঠনের উত্তরাধিকার বহন করছি।
 .
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যখন স্বাধীনতার মৌলিক চেতনাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত পাকিস্তানী ভাবধারার সামরিক শাসকবর্গ, তখন ছাত্রলীগ স্বাধীনতার চেতনায় ছিল আপোষহীন। ১৯৭৫-৯০ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৮৩ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের দশ দফা রচনায় ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
 .
১৯৭৫-৯০ সালের সামরিক শাসনের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীরা রাতের শেষে, ভোরের আলো দেখার সৌভাগ্য হয়নি। সামরিক হায়েনার বুলেট তাদের তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
শিক্ষার অধিকার সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শামসুল হক ও পরবর্তীতে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী কমিশনের সহায়তায় এগিয়ে আসে এবং শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করে। ১৯৯৮ সালে স্মরণকালে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় বাংলাদেশ তিন শিফটে রুটি তৈরি করে বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করে। ১৯৯৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদী আন্দোলনেও ছাত্রলীগ সমর্থন দেয়।
 .
২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপি জয়লাভের পর সারাদেশব্যাপী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার, নির্যাতন শুরু হলে ছাত্রলীগ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে প্রাণ হারান শতাধিক নেতা-কর্মী। অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগের মেধাবী নেতা-কর্মীদের। আইএসআই এর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে জামাত বিএনপি স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করার প্রতিবাদী আন্দোলনেও ছাত্রলীগ সরব ভূমিকা পালন করেছে।
 .
১৯৯৬-২০০১ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শিক্ষার অধিকার, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বন্যার্তদের জন্য স্বেচ্ছাশ্রম, বৃক্ষরোপণ সহ দেশ গঠন মূলক কার্যক্রম আত্মনিয়োগ করে।
 .
ইতিহাসের অমোঘ বিধানেই যেন ২০০১-২০০৬ সালের পর আজ আবারো ধ্বংস, মৃত্যু, রক্তপাত, গণতন্ত্রহীনতা এবং ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রামে ব্যাপৃত থাকতে হচ্ছে আমাদের।
 .
সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি থাকাকালীন সময়ে তারেক রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করে বক্তব্য প্রদান করায় আমি বাদী হয়ে এবং তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এমরুল হাসান প্রধান সাক্ষী হয়ে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করি।
 .
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কখনও ইতিহাসের তৈরি করা পথে হাঁটেনি বরং সবসময় ছাত্রলীগ নিজে ইতিহাস তৈরি করেছে। আর সে ইতিহাস তৈরির পথ কখনও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। সে পথ সর্বদাই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত ছিল। আর এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের চলার পথে আলোকবর্তিকা ছিলেন সংগঠনটির আদর্শিক নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছাত্রলীগ সম্পর্কে বলেছিলেন, “ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস।” তিনি আরও বলেন, “নেতার মৃত্যু হতে পারে কিন্তু সংগঠন বেঁচে থাকলে আদর্শের মৃত্যু হতে পারে না।”
 .
আদর্শিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সাংগঠনিক নেতৃত্বেও ছাত্রলীগ সমৃদ্ধ। প্রায় তিন যুগ ধরে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার অগ্রসেনানী দেশ রত্ন শেখ হাসিনার সাংগঠনিক নেতৃত্ব ছাত্রলীগের পথ চলার কঠিন সংগ্রামকে সহজ করে দিয়েছে। তাঁর কঠিন-কোমলের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়া নেতৃত্ব ছাত্রলীগকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “উচ্চ আদর্শ এবং সাদামাটা জীবন-যাপন এই হোক তোমাদের আদর্শ।”