|
এই সংবাদটি পড়েছেন 1,660 জন

দরিয়া-ই-নূরঃ বাংলার কোহিনূর!

নাঈম চৌধুরীঃ ডিম্বাকৃতির দশটি হীরকখণ্ড। যার মধ্যমণি অপেক্ষাকৃত বড় একটি হীরা। হলুদ আভা ছড়ানো মাঝের এই হীরকখণ্ডটিই হলো দরিয়া-ই-নূর। দরিয়া-ই-নূর বিশ্বখ্যাত হীরক। এর শাব্দিক অর্থ সমুদ্রের আলো। কোহিনূরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হীরকটি বাংলাদেশে প্রাপ্ত রত্নসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকৃতির এবং সবচেয়ে মূল্যবান। দরিয়া-ই-নূর-এর বহিরঙ্গ কার্নিসযুক্ত আয়তাকার। একটি স্বর্ণের বাজুবন্দের মধ্যখানে দরিয়া-ই-নূরকে বসানো হয়েছিলো। এর চারপাশে সংযুক্ত ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট দশটি ডিম্বাকৃতির হীরক। মূল হীরকটির ওজন ২৬ ক্যারেট। ছোটগুলির প্রতিটি ৫ ক্যারেট করে। এ হিসেবে এগুলির সমন্বিত ওজন ৭৬ ক্যারেট। বিশেষ আকর্ষণীয় দরিয়ানূর হীরকটিও কোহিনূরের মত দক্ষিণ ভারতের খনিতে পাওয়া গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

দরিয়া-ই-নূর দীর্ঘদিন মারাঠা রাজাদের অধিকারে ছিল। পরে হায়দরাবাদের নওয়াব সিরাজুল মুলক এটিকে ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকায় ক্রয় করেন। পরবর্তী সময়ে কোহিনূরের মতোই এ হীরকটিও পারস্য সম্রাটের অধিকারে চলে যায় এবং সম্ভবত সেখানেই এর নামকরণ করা হয় দরিয়া-ই-নূর। অবশেষে দরিয়া-ই-নূর পাঞ্জাবের শাসক রণজিৎ সিংহের করায়ত্ত হয়। ১৮৪৯ সালে  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাঞ্জাবের ওপর আধিপত্য স্থাপন করার পর কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নূরসহ মহারাজ দিলীপ সিংহের খাজাঞ্চিখানার মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী কোম্পানির অধিকারে চলে আসে। এ সময় দরিয়া-ই-নূরের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬৩ হাজার টাকা।

কোহিনূর রানী ভিক্টোরিয়াকে উপহার দেওয়া হয় এবং অন্যান্য মণিমুক্তা কোম্পানির নিকট থেকে যায়। ১৮৫০ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার সম্মানে লন্ডনের হাইড পার্কে একটি প্রদর্শনী মেলার আয়োজন করা হয়েছিলো। এখানে কোহিনূরের পাশাপাশি প্রদর্শনের জন্য দরিয়া-ই-নূরসহ অনেক মূল্যবান মণি মাণিক্য প্রেরণ করা হয়। এ প্রদর্শনীতে দরিয়া-ই-নূরের আশানুরূপ দাম না ওঠায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, হীরকটি ভারতে ফেরত এনে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদনক্রমে কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানি ১৮৫২ সালের নভেম্বরে দরিয়া-ই-নূরের নিলামের আয়োজন করে এবং ঢাকার নওয়াব  খাজা আলীমুল্লাহ ৭৫ হাজার টাকায় এটি নিলামে ক্রয় করেন। ঢাকার নওয়াবগণ হীরকটি একটি বাজুবন্দে যুক্ত করে তা অলংকার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির সহযোগিতায় ঢাকার নওয়াবদের সংগৃহীত বিভিন্ন রত্নসামগ্রীর একটি অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়। এ অ্যালবামে দরিয়া-ই-নূর বিশেষ গুরুত্ব পায়। ১৮৮৭ সালে ভাইসরয় লর্ড  ডাফরিন ও লেডি ডাফরিন কলকাতার বালিগঞ্জের নওয়াব ভবনে দরিয়া-ই-নূর প্রত্যক্ষ করেন। ১৯০৮ সালে নওয়াব  খাজা সলিমুল্লাহ দরিয়া-ই-নূর হীরকটি সরকারের নিকট বন্ধক রেখে যখন ঋণ গ্রহণ করেছিলেন তখন এর মূল্য নিরূপণ করা হয়েছিল ৫ লক্ষ টাকা। পরে ঋণ পরিশোধ করার জন্য সলিমুল্লাহ দরিয়া-ই-নূর বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। এ উদ্দেশ্যে হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ১৯১১ সালে এটি ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু হীরকটি ইউরোপীয়দের তেমন আকৃষ্ট করতে পারে নি। সেখানে এর দাম ওঠে সর্বোচ্চ ১৫০০ পাউন্ড। এ অবস্থায় হীরকটিকে ফেরত এনে কলকাতায় হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ১৯৪৮ সালে পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়।

১৯১২ সালে সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও রানী মেরী কলকাতা সফরে এলে হীরকটি দেখেন। খাজা সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর দরিয়া-ই-নূরকে  ঢাকার নওয়াব এস্টেট-এর কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর কলকাতা থেকে এনে ভারতীয় ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্কের ঢাকা শাখায় জমা রাখা হয়। বর্তমানে দরিয়া-ই-নূর সোনালী ব্যাংকের ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯৮৫ সালে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষায় হীরকটি অকৃত্রিম বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ঢাকার একটি বাংলা দৈনিকের সূত্রে জানা যায়, নবাব সলিমুল্লাহ ১৯০৮ সালে আর্থিক সংকটে পড়লে পূর্ববঙ্গ ও আসাম সরকার থেকে ৩০ বছর মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বার্ষিক শতকরা ৩ টাকা সুদে ১৪ লাখ রুপি ঋণ গ্রহণ করেন। সম্পাদিত বন্ধকি চুক্তি অনুসারে অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে ৫ লাখ রুপি মূল্যের হীরকখণ্ড দরিয়া-এ নূর এবং আরও রত্নাদি ঋণদাতার বরাবর বন্ধক থাকে। সেই ১৪ লাখ রুপির সুদাসল অদ্যাবধি পরিশোধ করা হয়নি। ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যানের একটি চিঠি উদ্ধৃত করে দৈনিকটিতে উল্লেখ করা হয়, দরিয়া-এ নূরসহ ১০৯ প্রকার রত্ন সরকারি মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের ভল্টে রয়েছে। ভূমি সংস্কার বোর্ডের নথিপত্র অনুসারে আরও জানা যায়, ঋণের জামানত সম্পদগুলো ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন স্টেট ব্যাংকে জমা রাখা ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এখন জমা রয়েছে সোনালী ব্যাংকে। তবে এগুলো যথাযথভাবে আছে কি না তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

কথা থাকে, এই মূল্যবান ঐতিহাসিক স্মৃতিসম্পদ দরিয়া-এ নূর অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখার কোনো সুযোগ আছে কি না। এ বিষয়ে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকও বলেছেন, হীরকখণ্ডটি ব্যাংকের ভল্টে বন্দী করে রাখার কোনো যুক্তি নেই। এটি শতাধিক বছর ব্যাংকে থাকায় এমনিতেই জাদুঘর পেতে পারে। এটা সেখানে নিতে তিনি ব্যর্থ প্রয়াসও চালিয়েছেন। তবে চেষ্টা এখনো চলছে। এটা রাখার মতো পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জাদুঘরে রয়েছে। তাহলে বিষয়টির কেন সুরাহা হচ্ছে না, এটা বোধগম্য নয়। প্রশ্ন হতে পারে, ঋণের টাকার সুরাহা না করে এর বন্ধককৃত সম্পত্তি কীভাবে বিলিবণ্টন করা যায়? সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছেন, ১৯০৮ সালে ধার নেওয়া ১৪ লাখ রুপি সুদাসলে বর্তমান মূল্যে কয়েক শ কোটি টাকা হয়েছে। হতে পারে। তবে এই টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই। আর জামানতও নেহাত ফেলনা নয়। বন্ধকি সম্পত্তি সময়ান্তরে ঋণ শোধ না করলে ঋণদাতারই হয়ে যায়। তাই দরিয়া-এ নূরসহ এসব রত্ন সরকারের হয়ে যাওয়ারই কথা। শুধু আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার। কোনো আইনি বিপত্তি থাকলে তা কাটানোর ব্যবস্থাও অযাচিত হবে না।

আর নবাব সলিমুল্লাহর দেনা পরিশোধ! আইনত তিনি এবং তাঁর অবর্তমানে ওয়ারিশগণ দেনাদার, এটা অনস্বীকার্য। সরকার চাইলে ওয়ারিশদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ব্যবস্থাও করতে পারে। অন্যদিকে যদি ঢাকার নবাব পরিবার, বিশেষত নবাব সলিমুল্লাহর শুধু ঢাকা শহর নয়, এই অঞ্চলের জন্য অবদান বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বিনা বাক্যে এটা অবলোপন করা যায়। কয়েক শ কোটি টাকা এখন খুব বেশি টাকা নয়। কয়েক হাজার কোটিকেও তো সামান্যই বলা হয়। উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুতে ঢাকা শহর গড়তে এই পরিবারের অবদান বহুমুখী। ঢাকায় প্রথম সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও টেলিযোগাযোগের ব্যবস্থা হয় তাঁদের পরিবারের অর্থানুকূল্যে। আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (আজকের বুয়েট), মিটফোর্ড হাসপাতালসহ অনেক স্থাপনাতেই রয়েছে তাঁদের অবদান। ঢাকাসংক্রান্ত সব ঐতিহাসিক গবেষণাতেই রয়েছে এর স্বীকৃতি।

নবাব সলিমুল্লাহর কার্যক্ষেত্রটি ছিল আরও বিশাল। তিনি দেখলেন, বঙ্গ প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ। অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে উঠতে পারছে না। সেই বিবেচনা থেকে বাংলা ভাগ এবং নবসৃষ্ট পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় করার দাবিতে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। তাঁর এই রাজনীতিকে বিবেচনা করতে হবে তখনকার সময় ও প্রেক্ষিত সামনে রেখে। সেই সময়ের জন্য এটা প্রাসঙ্গিক ছিল, এমনটাই লক্ষণীয়। এই দলটিতেই দেশ বিভাগ-পূর্বকালে আমাদের অঞ্চলে নেতৃত্ব দিয়েছেন শেরেবাংলা, শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর মাওলানা ভাসানী। সেই সময়ে তাঁদের হাত ধরেই সক্রিয় রাজনীতিতে এসেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। এই রাজনীতি ভুল ছিল, এমন কোনো কথা আমরা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দেখি না। শুনিনি তাঁর কোনো ভাষণে। তবে দেশ বিভাগের পর তদানীন্তন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলাকে একটি উপনিবেশের মতো ব্যবহার করতে থাকায় এখানেই সেই মুসলিম লীগারদের একটি অংশ বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন। গঠন করেন নতুন দল। এর অনেক আগেই নবাব সলিমুল্লাহ প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর বংশধরেরা বাঙালিদের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখতে অক্ষম হন। বরং ক্ষেত্রবিশেষে অবস্থান নেন বিপরীতে। ফলে অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যান এই দেশের রাজনীতিতে। বঞ্চিত হন প্রাপ্য সম্মান থেকে। তাঁদের দিয়ে তো নবাব সলিমুল্লাহকে বিবেচনা করা যাবে না।

১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়। অন্যদিকে ১৯৪৭-এ সেই বঙ্গভঙ্গবিরোধীরাই বাংলাকে ভাগ করতে উঠেপড়ে লাগেন। কেমব্রিজ শিক্ষিকা স্বনামধন্য জয়া চ্যাটার্জির বাংলা ভাগ হলো বইটির ভূমিকায় ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ সম্পর্কে এক স্থানে লিখেছেন, ‘এই আন্দোলনে বাঙালি সমাজের সেই শ্রেণির লোকেরাই নেতৃত্ব দেয়, যারা বাংলার প্রথম বিভাগের সময় থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল, যাদের পরিচিতি ছিল তথাকথিত ভদ্রলোক বা সম্মানিত লোক।’ সুতরাং ১৯০৫ এবং ১৯৪৭ দুবারই বঙ্গভঙ্গ হয়েছে তখনকার বাস্তবতায়। এমন অবস্থায় নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকাকে ধরে নিতে হবে তিনি তাঁর সময়কালের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের অবহেলিত অনুন্নত সম্প্রদায়ের বহুমুখী কল্যাণে সচেষ্ট ছিলেন।

এরপর আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। নবাব সলিমুল্লাহ প্রয়াত হয়েছেন ১৯১৫ সালে। তবে এর জন্য আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে ১৯১১ বাংলা ভাগ রদ হওয়ার পর থেকে। এর নেতৃত্বে ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। ১৯১২ সালেই তাঁর নেতৃত্বে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ১৯১৩ সালে সরকার এই দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেয়। এর পরপরই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিলম্বিত হয় কার্যক্রম। পাশাপাশি কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালিদের একটি প্রভাবশালী অংশের বিরোধিতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এগুলো সবই ইতিহাসের বিষয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার বিকাশ ঘটতে থাকে। অনগ্রসর শ্রেণি ক্রমান্বয়ে করে নিতে থাকে তাদের স্থান। এর বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার বলা বোধ হয় অন্যায্য হবে না। আর এর প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁরা অবদান রেখেছিলেন, তাঁদের পুরোভাগেই ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ।

নবাব সলিমুল্লাহর ঋণের দায় সরকার মওকুফ বা অবলোপন করার ক্ষমতা রাখে। তাঁর বন্ধককৃত সম্পদের মালিকও রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারে। এ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, জনসেবামূলক বিভিন্ন কাজ, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর যে অবদান, এটা বিবেচনায় নিলে কে কার কাছে ঋণী, সেই প্রশ্নও কিন্তু চলে আসে। বৃহত্তর পরিসরে বিবেচনা করলে আমরাই তো নবাব সলিমুল্লাহদের মতো আমাদের মহান পূর্বপুরুষদের কাছে ঋণী।

জানা গেছে, ১৯৭৪ সালে হীরকখণ্ডটি নিজেদের হেফাজতে নেয়ার চেষ্টা করে জাতীয় জাদুঘর। সে সময় ভূমি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে প্রায় ৬০ বছর পর এর মূল্য নির্ধারণ করে ৫ লাখ টাকা। কিন্তু জাদুঘর সেটি সংগ্রহ করতে পারেনি। সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে দরিয়া-ই নূরের গুণগতমান যাচাই, মূল্য নির্ধারণ এবং জাদুঘরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সভাপতি করে একটি কমিটিও গঠন করেছিল সরকার। কিন্তু সে কমিটি কোনো ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এর আগে ১৯৮৫ সালে নবাব পরিবারের ‘বিই’ প্রপার্টির মালিকের পক্ষ থেকে হীরকটির বিশুদ্ধতা যাচাই এবং পরিমাপ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য উটাহ জেমোলজিক্যাল সার্ভিস কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা পরীক্ষা করে হীরকটির অকৃত্রিম বিশুদ্ধতা পেয়েছিল। কিন্তু এখন মহামূল্যবান হীরকখণ্ডটি সোনালী ব্যাংকের ভল্টে আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অনেকের মধ্যে।

এক গবেষণায় ২০ বছর আগে দরিয়া-ই-নূরের মূল্য ধরা হয়েছিল ৫২ কোটি টাকা। যখন টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত তখন দরিয়া-ই-নূরের মূল্য ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ওই হিসাব অনুযায়ী এখন চালের প্রতি কেজির মূল্যমান ধরলে দরিয়া-ই-নূরের বর্তমান বাজারমূল্য শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

সম্প্রতি এই বিখ্যাত ও মূল্যবান হীরকখণ্ডটি সোনালী ব্যাংক সদরঘাট শাখার ভল্ট থেকে উধাও হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে নানা মহল থেকে। নবাবদের উত্তরসূরি এবং প্রত্নসম্পদ গবেষকরাও একই আশংকা করছেন। এ অবস্থায় জাতীয় সংসদের ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছিল। কেবিনেট সচিবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা পরিদর্শনের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছিল। পরিদর্শন তো দূরে থাক, এখন পর্যন্ত তদন্ত কমিটিই গঠিত হয়নি।

নবাবদের স্মৃতিচিহ্ন এই আহসান মঞ্জিল ১৯৭৪ সালে নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সেসময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কার্যত ধ্বংসের হাত থকে রক্ষা পায় ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি। একই ভাবে নবাবদের ব্যবহৃত অমূল্য রত্নপাথর দরিয়া-ই-নূর সময়ের সাক্ষী, কালদর্শী, দরিয়া-ই-নূর এর ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষকেই। এমনটাই মনে করেন গবেষকরা।

লেখক পরিচিতিঃ নির্বাহী সম্পাদক, ডেইলি বিডি নিউজ ডট নেট।