|
এই সংবাদটি পড়েছেন 530 জন

রহস্যময় মিরাজের আধ্যাত্মিক আলোচনা

সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইনঃ পবিত্র কোরআনে আল্লাহর ঘোষণা, ‘পরম পবিত্র ও মহিমান্বিত সত্তা তিনি, যিনি বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসদিজে আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই।

নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’ এভাবেই আল্লাহ পাক রাসূল (সা.)-এর মিরাজ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যা ইসলামের ইতিহাসে এক অলৌকিক নিদর্শন। মিরাজ নিয়ে মানুষের গবেষণার অন্ত নেই।

শরিয়ত ও মারেফাতের দৃষ্টিকোণ থেকে মিরাজের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এর যেমন রয়েছে বাহ্যিক শিক্ষা তেমনি অভ্যন্তরীণ শিক্ষা। আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের অপূর্ব শিক্ষা। এর মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সম্পর্কের গভীরতা জানা যায়।

এ জন্য ইলমে মারেফাতের জ্ঞান থাকতে হবে। অতি অল্প সময়ে মিরাজের বিস্তৃত ঘটনাবলী শরিয়তি হিসেবে মিলানো সম্ভব নয়। নিরাকার আল্লাহর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সশরীরে মোলাকাতের মাঝেও যে রহস্য, তা উদ্ঘাটনের জন্য ইলমে তাসাউফের জ্ঞান প্রয়োজন।

যথার্থ জ্ঞান না থাকায় অনেকে বলেন, নিরাকার আল্লাহকে দেখা অসম্ভব। তারা মিরাজের ঘটনা পরিপূর্ণ বিশ্বাস করতে পারে না। এমনকি রাসূল (সা.)-এর হাদিস, আস-সালাতু মিরাজুল মুমিনিন। এর মর্মার্থ না বুঝে নামাজে আল্লাহর সঙ্গে মিলনের কথাও মানে না।

তারা নিজেরা মিরাজ করতে না পারার কারণে অন্য কেউ সেটা পারে তা মানতে নারাজ। ফলে তারা আল্লাহর নিকটতম জনের শান-মান সম্পর্কে ওয়াকেবহাল নন। তাদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেন না। যাদের অন্তর্চক্ষু নেই তারা বলে, নিরাকার আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়।

অথচ সূরা হজে আল্লাহ পাক বলেছেন, জাহেরি চোখের অন্ধত্ব প্রকৃত অন্ধ নয়। বরং অন্তর চক্ষুর অন্ধত্বই প্রকৃত অন্ধ। আয়াতের বর্ণনা মতে জাহেরি চোখ ছাড়াও অন্য চোখ আছে। যে চোখের দৃষ্টিসীমা অসীম।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক আরও বলেছেন, ভূ-পৃষ্ঠের ওপরে সবই ধ্বংস হবে, আপনার রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে। (সূরা আর-রহমান, আয়াত ২৬-২৭)। এ আয়াতে স্পষ্ট যে, আল্লাহর সত্তা বা অস্তিত্ব আছে। কিন্তু অন্ধরা তা দেখতে পারে না। এখানে বলা যায়, নবী-রাসূলগণ ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)কে দেখেছেন ও কথা-বার্তা বলেছেন। অথচ তাঁর পাশে থেকেও অনেকে তা দেখতে পাননি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহর ঘোষণা, যে ব্যক্তি নিজ রবের সাক্ষাৎ লাভের আকাক্সক্ষা রাখে, সে যেন নেক কাজ করে এবং ইবাদতে অপর কাউকে শরিক না করে। (সূরা কাহাফ, আয়াত-১১০) রাসূল (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের জন্য মিরাজ।

এমনিভাবে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্বন্ধে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ রয়েছে। যারা মৃত্যুর আগেই সাধনার মাধ্যমে অন্তর চক্ষু খুলতে পেরেছেন তারাই এই দুনিয়াতে আল্লাহ ও রাসূল (সা.)কে দেখে থাকেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহর ঘোষণা, আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর বা আলো। (সূরা নূর, আয়াত-৩৫) তাঁর মহাসত্তার এই অবস্থাকে সুপ্ত অবস্থা বলে। যে অবস্থাতে তাঁকে দেখা যায় না। যেমন, পানি জলীয়বাষ্প আকারে বাতাসে মিশে থাকা অবস্থায় আমরা তা দেখতে পাই না। এটি পানির অন্য একটি রূপ।

কোনো সাধক যখন সাধনার মাধ্যমে আল্লাহকে পেতে চায়, তখন আল্লাহ বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্নরূপে দেখা দিয়ে থাকেন। সাগরের পানি যেমন পৃথক হয়ে জলীয়বাষ্প আকারে বায়ুমণ্ডলে বিরাজমান থাকে। এভাবে আল্লাহ পাক তাঁর সৃষ্টির মধ্যেও বিরাজমান।

আল্লাহ পাক আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানব জাতিকেই তার প্রতিনিধি বা খলিফা নিযুক্ত করেছেন। মানুষের কালবে আল্লাহ বিরাজ করেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, মুমিন ব্যক্তির কালবেই আল্লাহর আরশ। সাধনার মাধ্যমে এক সময় মানুষ নিজের ভেতরের সুপ্ত নূরের সন্ধান পেয়ে যান।

সুফিদের ভাষায় যাকে পরম আত্মা বলে। মানুষের নফস যখন পরম আত্মার সঙ্গে মিশে যায় তখন দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না।

আত্মজাগরণ বা কাশফ খোলার জন্য মুর্শিদের সাহচর্য গ্রহণ করা আবশ্যক। এর জন্য ধ্যান, জ্ঞান, মোরাকাবা, মোশাহেদা প্রয়োজন। তাই রাসূল (সা.) সর্বক্ষণ হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এ ধ্যান হতেই ইলমুল লাদুন্নীর উৎপত্তি।

অলি আউলিয়ারা ইলমুল লাদুন্নীর ধারক ও বাহক আর কেতাবি মাওলানারা শুধুই জাগতিক জ্ঞানের বাহক। মাদ্রাসা, মক্তবে ছাত্রদের কামেল, ফাজেল, আলেম, মাওলানা, মুফতি প্রভৃতি টাইটেল দিয়ে জাগতিক সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়। কিন্তু এক লাখ মতান্তরে দুই লাখ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরের একজনও মাদ্রাসার ধারে-কাছে যাননি।

নবুয়তের যুগে মুমিনরা তাদের অভিভাবক নবী-রাসূলদের মাধ্যমে আল্লাহর সন্ধান পেয়েছিলেন। আর বেলায়েতের যুগে সাধকের জন্য অভিভাবক হচ্ছেন অলি-আল্লাহরা।

আল্লাহর গাইবি জ্ঞান কোনো পুস্তকে লিপিবদ্ধ নেই। এর অবস্থান হল কালব বা সিনা। রাসূল (সা.)-এর মিরাজে বাহক সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গিয়ে জিবরাইল আমিন থেমে যান। রাসূল (সা.)কে বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ঊর্ধ্বে আমার যাওয়ার সাধ্য নেই।

গেলে আমার ৬০০ নূরের পাখা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। বাকি পথ আল্লাহর নবী একা যান এবং আল্লাহর সঙ্গে কালাম করেন। কালামের বাহক তো জিবরাইল (আ.) ছিলেন না বা জিবরাইল (আ.) তার খবরও জানতে পারেননি। ওই একান্ত আলাপের কথাগুলো কোন কিতাবে লেখা হল? না সিনার ভেদ সিনায় রইল। এটাই আশেকের গোপন ভেদ।

তাই ইশকে ইলাহি বা আল্লাহ প্রেম লাভের জন্য কামেল মুর্শেদের চরণে ফানা হতে হয়। মুর্শেদের চরণে ফানা হলে আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্যে পৌঁছানো যায়। মুর্শেদের সাহচর্য ও সান্নিধ্য ছাড়া আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়।

হজরত জানশরীফ শাহ সুরেশ্বরী (রহ.) সিররেহক জামেনূর গ্রন্থে লিখেছেন, জাহেরি শরিয়তের যেখানে শেষ প্রান্ত ও পরিসমাপ্তি, ওখান থেকেই তরিকতের সূচনা ও শুরু। তাহলে যার শুরু ও সূচনা অন্যের শেষ প্রান্ত থেকে হয়, তার শেষ প্রান্ত কতই না মর্যাদাপূর্ণ।

এ জন্যই মিরাজ শরিফের সফরে হজরত জিবরাঈল (আ.) বলেছেন-

শেখ সাদীর ভাষায় : ‘আগার এক সারে মুয়ি বার তার পারাম/ ফরূগে তাজ্জলি বেসুযাদ পারাম।’

অর্থ : যদি আরেক চুল পরিমাণ পা বাড়াই/ তাজাল্লির আগুনে পাখা হবে ছাই।

এর তাৎপর্য হল, ওই মাকামে হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের প্রবেশের অধিকার নেই। তার এই ক্ষমতা নেই যে, জালালি মাকামের তেজস্বিতা নিজের আয়ত্তে নেবে বা ওই জগতের অবস্থা জানবে। এ জন্য তিনি অক্ষম হয়ে পড়েন।

আল্লাহর অলিগণ ফানাফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহর স্তরে পৌঁছে আল্লাহর সান্নিধ্যে অবস্থান করে থাকেন। যার শিক্ষা রাসূল (সা.)-এর মিরাজের ঘটনার মাধ্যমে সবাইকে অবহিত করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআন মজিদে বর্ণিত হয়েছে, কাবা-কাওহাইনে আও আদনা’ অর্থাৎ আল্লাহ এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে ব্যবধান ছিল দুই ধনুকের মধ্যবর্তী মানে কোনো ব্যবধানই ছিল না।

এ পর্যায়ে পৌঁছানো সাধারণ কোনো ব্যাপার নয়। তাই সাধারণ মানুষ এ অবস্থা উপলব্ধিও করতে পারে না। যদিও রাসূল (সা.) উপায় বলে দিয়েছেন। নামাজের মধ্যেই হবে মুমিনের মিরাজ। তাই হজরত জানশরীফ শাহ সুরেশ্বরী রহ. নূরেহক গঞ্জেনূর গ্রন্থে লিখেছেন,

একেক সন্ধানে যদি পড়িবে নামাজ এক এক নামাজে হবে শত মেরাজ ॥

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ইসলামী চিন্তাবিদ