|
এই সংবাদটি পড়েছেন 1,446 জন

শতবর্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

ডেইলি বিডি নিউজঃ ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ উদ্বোধনের সময় সেতুটির প্রধান প্রকৌশলী স্যার রবার্ট উইলিয়াম গেইলস আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘যে সেতু নির্মাণ করে দিয়ে গেলাম, উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এ সেতু চির যৌবনা হয়ে থাকবে।’ কথাটি যে কতখানি সত্য তার প্রমাণ একশ বছরেও সেতুটির গায়ে বার্ধক্যের ছাপ পড়েনি। বিশাল আকৃতির এ ব্রিজের নিচে দাঁড়ালে এখনও মনে হয় তার এ কথাটি সত্য।

১৯১০ সালে নির্মাণ শুরু হার্ডিঞ্জ ব্রিজের। আর উদ্বোধন হয় ১৯১৫ সালে। এর পর কেটে গেছে ১০০টি বছর। ফলে ৯৯ বছরের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালও ফুরিয়ে গেছে। পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত রেলওয়ে ব্রিজ হার্ডিঞ্জ ব্রিজের আয়ুষ্কালও ফুরিয়ে গেছে। এখন কাঠামোর শক্তি বৃদ্ধি করে আরো কয়েক বছর রেল সেতুটি ব্যবহার করা হবে নাকি নতুন করে নির্মাণ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়ায় ট্রান্সএশিয়ান রেল করিডোরে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে সেতুটি। জানা গেছে, সেতুর অবস্থা যাচাইয়ে উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া সেতুটির পুনর্নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কাজ করছে তিনটি বিদেশী প্রতিষ্ঠান। এতে অর্থায়নকরছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

হার্ডিঞ্জ রেল সেতুর অবস্থা যাচাইয়ে ব্রিটিশ আমলের নির্মাণ ম্যানুয়াল সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ১৯৭২ সালের পুনর্নির্মাণ ম্যানুয়ালও ভারত থেকে আনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সেতুটির অবস্থা যাচাই করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। পরে এর নির্মাণ ইতিহাস নিয়ে উচ্চপর্যায়ের প্রকৌশলী জরিপ কাজ শুরু হয়। এক্ষেত্রে সেতুর কাঠামো, ভিত্তি ও পিলারের অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও পদ্মা নদী থেকে বালি উত্তোলন হার্ডিঞ্জ সেতুর জন্য হুমকি হবে কিনা, যাচাই করা হচ্ছে তাও। জরিপের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে, নতুন করে সেতু নির্মাণ করা হবে কিনা। এ ব্যাপার বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও হার্ডিঞ্জ সেতুতে আপাতত কোনো ঝুঁকি নেই। তবে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য সেতুটির অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এজন্য ব্রিটিশ নির্মাণ ম্যানুয়াল ও ভারতের পুনর্নির্মাণ ম্যানুয়াল সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, উচ্চপর্যায়ের কারিগরি দল সেতুটি পর্যবেক্ষণ শেষে রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এখন দুটি বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রথমত. শক্তি বৃদ্ধি করে সেতুটি থেকে কত বছর সেবা পাওয়া যাবে ও এতে ব্যয় কত হবে। দ্বিতীয়ত. শক্তি বৃদ্ধিতে আয়ুষ্কাল খুব বেশিদিন না বাড়লে বিদ্যমান সেতুর উজানে নতুন সেতু নির্মাণ করা যায় কিনা। এক্ষেত্রে ব্যয় কিছুটা বেশি হবে। সবগুলো বিষয় মাথায় রেখেই হার্ডিঞ্জ সেতুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

রেলওয়ের তথ্যমতে, বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে জাপান, স্পেন, হাঙ্গেরির উচ্চপর্যায়ের নয় বিদেশী প্রকৌশলী এবং বুয়েট ও রেলওয়ের আরো ৪০ জন প্রকৌশলী গত আগস্টে হার্ডিঞ্জ রেল সেতু পরিদর্শন করেন। এছাড়া ১৯৭২ সালে পুনর্নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ভারতের প্রকৌশলী ড. অমিতাভ ঘোষালকেও আনা হয় সেতুটি পরিদর্শনে। তবে এখনো প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেনি উচ্চপর্যায়ের কমিটি। এদিকে হার্ডিঞ্জ সেতুর পুনর্নির্মাণ অথবা শক্তি বৃদ্ধির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার স্ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের নেতৃত্বাধীন তিন প্রতিষ্ঠান। এতে বলা হয়েছে, সেতুটির শক্তি বৃদ্ধিতে ১২টি স্প্যানের বিদ্যমান স্টিল কাঠামো (ট্রাস) প্রতিস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে আধুনিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাস ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি কংক্রিটের ক্রস বিমের সঙ্গে যুক্ত স্টিলের টানা (স্ট্রিংগার) ও অন্যান্য কাঠামো প্রতিস্থাপন করতে হবে। এতে সেতুটিতে ২৫ টন এক্সেল লোডের ইঞ্জিন চালানো যাবে। শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। তবে সেতুটি পুনর্নির্মাণের বিষয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি। সব ধরনের প্রতিস্থাপন ও শক্তি বৃদ্ধি শেষে হার্ডিঞ্জ সেতুতে ট্রেন চলাচলে গতিসীমা বাড়ানো যাবে। সাড়ে ১০ ফুট প্রস্থের রোলিং স্টক (ইঞ্জিন-কোচ) বাধাহীন গতিতে সেতুটির ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে ১২ ফুট প্রস্থের রোলিং স্টকের ক্ষেত্রে নির্ধারিত গতিসীমা বহাল থাকবে।

শতবর্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

শতবর্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) সাগরকৃষ্ণ চক্রবর্তী বলেন, এডিবির অর্থায়নে তিনটি বিদেশী সংস্থা সেতুটি পুনর্নির্মাণ ও শক্তি বৃদ্ধির বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে প্রতিষ্ঠান তিনটি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে হার্ডিঞ্জ সেতুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমলে আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ সহজ করতে হার্ডিঞ্জ রেল সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। নির্মাণ শেষে ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ অবিভক্ত ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ এটি উদ্বোধন করেন। তার নামানুসারে এর নামকরণ হয় ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’। রেলওয়ের তথ্যমতে, হার্ডিঞ্জ সেতু নির্মাণে সে সময় ব্যয় হয় ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা (৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪ রুপি)। প্রবাদ আছে ১ টাকায় ১৬ মণ চাল পাওয়া যেত সে সময়। এর মূল পিলারের সংখ্যা ১৬ ও স্প্যান ১৫। সেতুটির দৈর্ঘ্য ১.৮১ কিলোমিটার। নদীর উভয় পাড়ে সেতু রক্ষা বাঁধের দৈর্ঘ্য ছয় মাইলের বেশি। সেতু রক্ষা বাঁধে ব্যবহৃত বোল্ডার পাথরের পরিমাণ নয় কোটি ঘনফুট। পিলাগুলোয় ব্যবহূত কংক্রিট ব্লকের পরিমাণ ২ লাখ ৯৯ হাজার টন। ১৫টি মূল গার্ডার ও ছয়টি ল্যান্ড গার্ডারে ব্যবহৃত ইস্পাতের পরিমাণ ৩০ হাজার টন। সেতুটির সংযোগ সড়কে ১৬ কোটি ঘনফুট ও গাইড বাঁধে ৩ কোটি ৮৬ লাখ ঘনফুট মাটি ব্যবহার করা হয়। হার্ডিঞ্জ রেল সেতুতে শুধু ট্রেন চলাচলের জন্য পাশাপাশি দুটি ব্রড গেজ রেললাইন রয়েছে। রাখা হয়েছে হাঁটার পথও। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেতুটিতে বোমা বর্ষণ করা হলে ১২ নম্বর স্প্যানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে তা মেরামত শেষে ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট সেতু দিয়ে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়।