|
এই সংবাদটি পড়েছেন 106 জন

পর্যটকের চোখে উত্তরবঙ্গ

মোঃসাইফুল্লাহ রাব্বী : মানুষ স্বভাবতই সুন্দর ও সৌখিন জিনিসের প্রতি অনুরাগী। সুন্দরের প্রতি ভালোবাসা ও ভালোলাগা প্রতিটি সৃষ্টির সহজাত স্বভাব। জন কিটসের সেই বিখ্যাত উক্তিটির সাথে বলতে চাই সুন্দরই সত্য, সত্যই সুন্দর অতঃপর যাহা সত্য তাহাই সুন্দর। প্রতিটি সুন্দরের কোনএক অজানা মোহ থাকে যে মোহ মানুষকে তার কাছে টেনে নিয়ে যায়। সুন্দর ও সত্যের সন্ধানে বহু মনিষী ও বিখ্যাত ব্যক্তি ঘর ছেড়েছেন ছুটে গেছেন দূর-দূরান্তে সৌন্দর্যকে অবলোকন করতে।

সময়ের পরিবর্তনে যুগের সাথে তালমিলিয়ে কখনো কখনো কোন সভ্যতা বা কোন স্থান হয়ে উঠে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক দেশের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে। আবার কালক্রমে কখনো কখনো সেই সভ্যতাতার জৌলুস ও ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার আভাবে। তেমনিএকটি সভ্যতা হচ্ছে বরেন্দ্রভূমি ও উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক মানবসভ্যতা।
কিসের কমতি ছিল এই আঞ্চলিক সভ্যতায়। মৌর্য ও গুপ্তা রাজাদের শাসনামলে মহাস্থানগড় হয়ে উঠেছিল ঐতিহ্যের ধারক-বাহন এবং সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। উত্তরবঙ্গের পুন্ড্রনগর ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। আজ হয়তোবা রাজারানীর রাজ্যের স্মৃতি চিহ্ন আছে, আগের সেই জৌলুস নেই কিন্তু পর্যটকদের আকর্ষণ করার মত দর্শনীয় স্থান, ভিন্নধর্মী খাবার ও আবেদন ছরিয়ে- ছিটিয়ে আছে আঞ্চলের জেলাগুলোর বিভিন্ন স্থানে। যা পর্যটকদের ভুলিয়ে দেবে ভ্রমণের সকল আবসাদ আর ক্লান্তিকে।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের যে জায়গাগুলোতে পর্যটকরা ভ্রমণ করতে পারবেন সে স্থানগুলোর নাম প্রকাশ করা হল যেটা পর্যটকদের ভ্রমণ সহাইয়িকা হিসেবে কাজ করবে।প্রচীনকালে উত্তরাঞ্চল যেসব অঞ্চলের সাথে কোন না কোন ভাবে সংযুক্ত ছিল সেইসব অঞ্চলের বর্তমান জেলাগুলোর পর্যটন আকর্ষণগুলো এই অনুচ্ছেদটিতে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের খ্যাতি বাংলাদেশ ব্যাপি। ভ্রমণপিপাসু মানুষগুলো চাইলে আমের মৌসুমে সেখানে আম বাগানে গিয়ে পাকা আম খেতে পারবে এছাড়াও বিলভাতিয়া, বিলচুড়াইল, বিলহোগলা, ছোট সোনা মসজিদ, দাসবাড়ি মসজিদ যে কারো নজর কারবে।
বরেন্দ্রভূমির রাজধানী হিসাবে খ্যাত রাজশাহী বরাবরই ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করে। বরেন্দ্র জাদুঘর,পুটিয়া রাজবাড়ী, সারদা পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ভদ্রাপাক, পদ্মার চর পছন্দের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
নাটোরের কাচাগোল্লা খেতে কার না মন চায়। তার সাথে দেখতে পাবেন দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী ,নাটোরের রাজবাড়ী,চৌগ্রাম জমিদার-বাড়ী।
নওগাঁর মানুষদের সরলতা যে কাউকে মুগ্ধ করবে। নওগাঁয় কুসুম্বা মসজিদ, পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার, পালরাজাদের স্মৃতিচিহ্ন, বলিহার রাজবাড়ী, জবাই বিল,জগদ্দল বিহার,পত্নীতলা দিব্যক জয়স্তম্ভ দেখতে পারবেন।
যমুনা সেতু সিরাজগঞ্জ জেলাকে নিয়ে গেছে এক ভিন্ন মাত্রায়। বেলকুচির তাতিদের তাত পল্লী ও তাদের তাঁত শিল্প, শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের বাড়ী, দরগাহ মসজিদ, শিব মন্দির ভ্রমণকারীদের আকৃষ্ট করবে।
জয়পুরহাট বহু দিন গৌড়ের পাল ও সেন রাজাদের রাজ্য ভূক্ত ছিল।আছা রাঙ্গাদিঘী, নান্দাইল দিঘী, লাকমা রাজবাড়ী,পাথর ঘাটা দর্শনীয় স্থানগুলোতে দর্শনার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

হাওর- বাওর ও বিল দিয়ে সাজানো পাবনা জেলা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল চলন বিলের একটা অংশ এই জেলাকে ঘিরে। বর্ষার সময় ভরা বিলে নৌকা নিয়ে মাছ ধরা ও টাটকা মাছ দিয়ে খাবার খাওয়া এক নতুন অনুভূতির যোগান দেবে। এছাড়া পাকসি, ঈশ্বরদীর চিনির কারখানা দেখার সু্যোগ থাকবেই।

উত্তরবঙ্গের প্রাণ কেন্দ্র নামে পরিচিত বগুড়াকে ঐ এলাকার রাজধানী বলেই সবার কাছে জানা।উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে পরিচিত। মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বহু রাজাদের রাজ্য এখনো সেই রাজাদের রাজ্যের স্মৃতিপট চোখে পড়বে। এছাড়া মাজার শরীফ, কাটাবিহীন বড়াইয়ের গাছ,পশুরামের প্রাসাদ ও প্রাচীর, গোবিন্দভিটা, মহাস্থানগড় জাদুঘর, বেহুলার বাসরঘর, শিলা দেবীর ঘাট, ভাসুবিহার, বাংলাদেশের একমাত্র মশলা গরেষণা কেন্দ্র দেখতে আসেন অসংখ্য ভ্রমণকারী।

কথিত আছে রাজা গোবিন্দের ষাট হাজার গরুর গো-চরণভূমির নামে গাইবান্ধা জেলার নামকরণ হয়েছে। গাইবান্ধা জেলায় পর্যটকদের মনকাড়ার মতো অনেক জায়গা আছে তার মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ এর কুটিবাড়ী, পলাশবাড়ী এডুকেশন পার্ক, ড্রীমল্যান্ড পার্ক, মাটির নিচে সবুজ ঘর ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার, কাষ্ট কালীর মন্দির,বালাসী ঘাট,যমুনার চরগুলো।

রংপুর জেলার ভিন্নজগৎ, বেগম রোকেয়ার বাড়ী, নীলদরিয়াবিল, তাজহাট জমিদারবাড়ী, রংপুর চিড়িয়াখানা,চিকলী বিল বিনোদের কেন্দ্র হিসাবে বেশ পরিচিতি পাচ্ছে।
দিনাজপুরের লিচুর স্বাদ এক কথায় অতুলনীয়। বাংলাদেশের লিচুর রাজধনী দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির, রামসাগর দিঘীর সৌন্দর্য ভ্রমণ পিপাসুদের বিমোহিত করবে।
ঠাকুরগাঁও জেলার কিছু স্থান পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়তে শুরু করেছে। এখানকার গ্রামগুলো ছবিতে আকা চিত্রের মতো।কুমিল্লা হাড়িপিকনিক কর্ণার, খুনিয়া দিঘীতে লোক সমাগম দিন দিন বেড়েই চলেছে।
নীলফামারী জেলাকে নীলের দেশ বলা হয়। এক সময় বৃটিশররা এখানকার চাষীদের বাধ্য করতো নীল চাষ করতে। এই জেলার প্রত্যেকটি স্থান এক একটি ইতিহাসের সাক্ষী। ইতিহাস জানার পাশাপাশি ভ্রমণকারীরা দেখতে পারবেন নীলসাগর, ময়নামতি দুর্গ, সিন্ধুরমতি দিঘী, মীরজুমলার মসজিদ।
মহা রাজা বিশ্বসিংহের কুড়িটি পরিবারের দেশ থেকেই কুড়িগ্রাম জেলা। বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোই এখনকার প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া শাহী মসজিদ, বীর প্রতীক প্রাপ্ত তারামন বিবিরবাড়ী, নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ী,,চিলমারী বন্দর পর্যটকদেরআকৃষ্টকরবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ছিটমহল ছিল লালমনিরহাট জেলায় যা আজ বিলুপ্ত। ছিটমহলগুলোর বৈশিষ্ট আলাদা দেখে মনে হবে বাংলাদেশের মাঝে আরেকটি ছোট্ট বাংলাদেশ। এই বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো ঘুরে নতুন কিছু অভিজ্ঞতা যোগ করতে পারবেন।
পাচটি গড়ের সমন্বয়ে গঠিত পঞ্চগড় জেলা। যেমনি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর তেমনি আসাধরণ অতিথিপরায়ণ মানুষের বসতি, চা-বাগানে সমৃদ্ধ, পাথর দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন এই জেলাকে। উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের অধিকারী এই জেলার মানুষেরা। ভারতের সাথে সীমান্ত সংযোগ এখানকার অর্থনীতিকে করেছে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। হিমালয়ের কন্যা পঞ্চগড় যেন হিমালয়ের কৃপার দান। বাংলাবান্ধা পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠেছে অন্যরকম আবেদনের জায়গা হিসাবে।
উত্তরবঙ্গের পর্যটনের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রয়োজন শুধু প্রচার-প্রসার ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমগুলো যদি উত্তরবঙ্গ পর্যটন স্থাপনা ও স্থানগুলোকে প্রচার-প্রসারে কাজ করে তাহলে উত্তরবঙ্গ পর্যটনের নতুন একটি দিগন্তের উন্মোচন হবে। বেড়ে যাবে অথনৈতিক সমৃদ্ধি।কমিউনিটি ভিক্তিক ট্যুরিজমের মাধ্যমে কমানো সম্ভব হবে স্থায়ীয় বেকার সমস্যা।সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের পর্যটন সহায়ক মনোভাব বদলে দিতে পারে উত্তরবঙ্গ পর্যটনের উন্নয়নের দুয়ার।

মোঃসাইফুল্লাহ রাব্বী,গেস্ট লেকচারার, বিবিএ ইন ট্যুরিজম এ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ডেফোডিল ইন্সটিটিউট অব আইটি।