|
এই সংবাদটি পড়েছেন 46 জন

সিলেটে আবাসন সংকটে কর্মজীবি নারীরা

নিজস্ব প্রতিনিধি:: সিলেটে আবাসন সংকটে রয়েছেন কর্মজীবি নারীরা। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও সরকারিভাবে কর্মজীবী নারীদের জন্য হয়নি কোনো হোস্টেল সুবিধা। ব্যাক্তি উদ্যোগে যেগুলো আছে, সেগুলোও কেবল ছাত্রীদের জন্য। ফলে সিলেটের কর্মক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি বাড়ার সাথে বাড়ছে দুর্ভোগও। সরকারিভাবে নারীদের হোস্টেল না থাকায় মেসে-কিংবা সাবলেটে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন কর্মজীবী নারীরা। সহ্য করতে হচ্ছে বাড়িওয়ালার যন্ত্রণা।

নানা সমস্যা আর প্রতিবন্ধকতার কারণে কর্মজীবী নারীর স্বাভাবিক জীবন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন চাকরি ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ যে হারে বেড়েছে; সে হারে তাদের মূল্যায়ন বাড়েনি। ফলে কর্ম-উদ্দীপনা অনেকাংশে কমে যাচ্ছে নারীদের।

জানা গেছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সুবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিলেটে আসছেন নারীরা। বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্রে আবাসন ব্যবস্থা না থাকা ও সরকারি হোস্টেল না থাকায় নারীদের ওঠতে হচ্ছে বিভিন্ন মেসে। সিলেটে নারীদের মেস নিরাপদ না হওয়ায় অনেকেই পরিচিত পরিবারের সাথে সাবলেট হিসেবে উঠছেন। মেসে বাড়িওয়ালা ও সাবলেটে একা থাকার কারণে বিভিন্নভাবে ভোগান্তিতে পড়ছেন নারীরা। সিলেটকে নারীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে জনপ্রতিনিধিগণ নানা উদ্যোগের কথা বললেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে দিন বদলের এই যুগে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে নগরীতে কর্মজীবী নারীদের আবাসন সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। এতে করে বিভিন্ন স্থান থেকে কাজের জন্য নারীদের নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সাবলেটে থাকা প্রত্যেক মেয়েকেই ছোট-বড় এমন সমস্যা মোকাবেলা করে থাকতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সাবলেট বাসায় থাকা মেয়েদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কুপ্রস্তাবও দেয়া হয়ে থাকে। রাজি না হলে বাসা ছেড়ে চলে যেতে হয়।
সিলেট পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে ৪ মেয়াদে দু’জন মেয়র দায়িত্ব পালন করেছেন। দেড় দশকে নগরজুড়ে বেশকিছু উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন হলেও কর্মজীবী নারীদের জন্য হয়নি তেমন কোনো উদ্যোগ। গেল নির্বাচনে সিটি মেয়র সিলেট নগরীকে নারীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়নের অপেক্ষা করছেন সিলেটের নারী সমাজ।

সিলেট তাতীপাড়া এলাকায় সাবলেটের বাসিন্দা কুলসুমা কাজ করেন লতিফ সেন্টারে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি আমার রুমে উচ্চস্বরে কথা বলতে পারি না। ঘরে ফ্রিজ রাখা যাবে না। বাড়িওয়ালাদের রান্না করার পরে আমাকে রান্নাঘরে ঢুকতে হয়। পানি ব্যবহার করতে হবে হিসাব করে। এমনটা হাজারো অভিযোগ আর বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হয়। মাঝে মাঝে নিজেকে বন্দি মনে হচ্ছে। এভাবে থাকতে ভালো লাগে না; কিন্তু উপায় নেই তাই বাধ্য হয়ে অনেক কষ্টের মাঝেও থাকছি। আমি জানি, এখান থেকে একবার বাসা ছাড়লে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

নগরীর আড়ংয়ে চাকরি করেন ফাতেমা তার বাড়ী কুলাউড়া। পরিচিত এক পরিবারের সঙ্গে জল্লাপাড় সাবলেটে থাকেন। আড়ংয়ে চাকরি করার কারণে অনেক মেয়েই তার বাসায় আসতেন। কিন্তু বাড়িওয়ালা তাকে জানিয়ে দেন, মেয়েরা এত ঘন ঘন বাসায় এলে তাকে বাসা ছেড়ে দিতে হবে। সাবলেট বাসা পাওয়া কঠিন তাই ফাতেমাকে কষ্ট করেই থাকতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সাবলেট থাকার বিড়ম্বনা সম্পর্কে আম্বরখানা এলাকায় বসবাসকারী সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ফাতেমা ইসলাম বলেন, সিলেটের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি-বেসরকারি হোস্টেলে জায়গা না পেয়ে তারঁ মতো অনেক কর্মজীবী নারী বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অন্যের সঙ্গে রুম ভাগাভাগি করেন বা সাবলেটে থাকেন। একা কোনো মেয়েকে কেউই বাসা ভাড়া দিতে চায় না। তাই বাধ্য হয়েই তাদের খুঁজতে হয় সাবলেট। কর্মজীবী নারীরা সাবলেটে থাকছেন কিছু ছাত্রী কিংবা পরিচিত পরিবারের সঙ্গে। আর সাবলেটে থাকাটা যে কতটা বিপত্তিকর, তা একজন সাবলেটে থাকা মেয়ে ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারেন না। সাবলেট থাকার জন্য প্রত্যেককেই গুনতে হয় অতিরিক্ত ভাড়া। তারপরও তারা রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। উপরন্তু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিড়ম্বনার শিকার হন তিনি ।

সিলেটের নারী মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি ইন্দ্রানী সেন সম্পা বলেন, ইউনিয়নে ইউনিয়নেও কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। অথচ আমাদের নগরীতে মাতৃস্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র আছে মাত্র একটি। নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে একটি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র চালু করা প্রয়োজন। এছাড়া নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতেও সিটি করপোরেশনর মেয়র ও সংসদ সদস্যকে উদ্যোগ নিতে হবে।

সিলেট উইমেন চেম্বার অব কর্মাসের সভাপতি স্বর্ণলতা রায় বলেন, আমি ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী হিসেবে যখন ছিলাম তখন সরাসরি এ বিষয়ে কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আন্তরিকতারসহিত দেখবেন বলে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন অতীতে সিলেটের সংসদ সদস্যরা কেন এ বিষয়ে কথা বললেন না তা আমার জানা নেই।

তিনি বলেন সিটি করপোরেশন বা সরকারি উদ্যোগে সিলেটে কোনো নারী হোস্টেল নেই। ব্যাক্তি উদ্যোগে যেগুলো আছে, সেগুলোও কেবল ছাত্রীদের জন্য। ফলে কর্মজীবী নারীদের আবাসন সংকটে পড়তে হয়। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গণপরিবহন চালু ও কর্মজীবী নারীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সিলেট সরকারী মহিলা কলেজের প্রফেসর ফাহিমা জিন্নুরাইন, বলেন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সিলেট চারদিকে টেকশই কর্মজীবী মহিলাদের নিরাপদ আবাসনের সুবিধা দেয়ার জন্য সিলেটের মতো এত বড় শহরে এখনো কোনো মহিলা হোস্টেলই নির্মান হয়নি। সিলেট নিরাপদের জন্য সকল জেলা থেকে নারীরা এসে কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাপশি নারীরা সমানতালে কাজ করছে।

তিনি বলেন, কর্মজীবী নারীদের জন্য আবাসনের আলাদা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করি। তিনি বলেন, শুধু কর্মজীবী মহিলা কেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রীদেরও হল-হোস্টেলের সমস্যা নিত্যদিনের সঙ্কট। পাবলিক কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসিক হল থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি সামান্য। তারপরেও একই সিটে দুজন ছাত্রী কিংবা নিচে বিছানা পেতে জায়গা করে নিয়ে সরকারী প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা কোনমতে তাদের পড়শোনার জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহিনা আক্তার বলেন, দেশের অন্যান্য বিভাগে রয়েছে অথচ সিলেটে অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী থাকাসত্ত্বেও নেই এটা দু:খজনক তবে নারীদের অধিক হারে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার সিলেট বিভাগীয় শহরের মহিলা হোস্টেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে নগরীর বাগবাড়ীতে জমি দেখা হয়ে গেছে। প্রকল্পটির অনুমোদনের অপেক্ষায় আাছি।