|
এই সংবাদটি পড়েছেন 121 জন

সিলেটে চারমাসে ৭১ নারী ও শিশু নির্যাতিত

অথিতি প্রতিবেদক :: সিলেটে একের পর এক ঘটছে নিষ্ঠুর আর পৈশাচিক ঘটনা। বের হয়ে পড়ছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ পচনের ভয়ঙ্কর রূপ। আঁতকে উঠছে মানুষ। ছড়িয়ে পড়ছে ভীতি, আতঙ্ক আর নানামাত্রিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কে কখন শিকার হয়ে যায় এসব নিষ্ঠুরতার সেই ভয় কুরে কুরে খাচ্ছে অনেককে। কে জানে কখন কার পাশের চেনা মানুষটা হয়ে উঠে হিংস্র দানব আর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তারই ওপর। যেখানে শ্বশুরের কাছে নিরাপদ নয় পুত্রবধু সেখানে কে কার থেকে নিরাপদ এ সমাজে?

মানবিকতার পতন কোন স্তরে নামলে শ্বশুর তার পূত্রবধুকে ধর্ষণ করে, ৭০ বছরের বৃদ্ধ ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে এমনকি বেড়াতে আসা স্বজনকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে দানবরা গণধর্ষণ করে। একবার নয়, দুইবার নয়, বারবার দেখছে মানুষ সমাজ পচনের এ ভয়ঙ্কর রূপ। প্রতিবার ঘটে যাওয়া একেকটি বীভৎস ঘটনা ম্লান করে দিচ্ছে আগের বীভৎসতার সব রেকর্ড।

যৌনতা কেন্দ্রিক মানুষের লোভ আর হিংস্ররতার পৈশাচিক ঘটনা ছাড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের বিস্ময়ের সব মাত্রা।

সিলেটে বিগত কয়েক দিনের মধ্যে ঘটেছে বেশ কয়েকটি পৈশাচিক ঘটনা। একটিকে ছাড়িয়ে অপরটি স্থান করে নিয়েছে ভয়ঙ্কর রূপে। গত ৪ এপ্রিল নগরীরের আখালিয়ায় রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত ৩০ বছরের এক বাক প্রতিবন্ধি এক গৃহবধূকে রাতভর গণধর্ষণ করেন ঐ এলাকার ৯নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি মানিকুর রহমান (খট্টা মানিক)। পরে ভোরে ওই এলাকার বকসের কলোনি জাহাজ মঞ্জিল থেকে ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়।

একই মাসের ১৩ এপ্রিল সকাল ১১টায় সিলেট নগরীর পাঠানটুলাস্থ জাহাঙ্গীরনগর এলাকায় সৎ পিতার হাতে মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া মেয়ে। বিগত এক মাস ধরে ধর্ষক সৎ পিতা জসিম উদ্দিন তার মেয়েকে একাধারে ধর্ষণ করে আসছেন। পরে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ধর্ষক জসিম উদ্দিনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

১৪ এপ্রিল সিলেট নগরীর সুবিদবাজার বনকলাপাড়ায় আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে আসা তরুণীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করে দানবরা। পরের দিন অভিযোগের ভিত্তিতে তিনজনকে আটক করে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ। ভিকটিম সিলেট এম এজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার(ওসিসি)-এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ধর্ষিতার স্বজনরা জানান, গত রোববার সন্ধ্যায় দুদু, জলিল, আনোয়ারসহ ১০/১২ জন যুবক ঐ কবিরাজের কাছে গিয়ে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না পেয়ে কবিরাজকে তুলে নিয়ে যায়। রাত ১টার দিকে গিয়ে কবিরাজের ঘরে গিয়ে তারা হানা দেয়। এক পর্যায়ে কবিরাজের বাসায় বেড়াতে আসা তরুণীকে তুলে নিয়ে যায়। রাতভর পাশবিক নির্যাতন করে সকালে তাকে ছেড়ে দেয়। এ বিষয়ে দায়ের করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত সোমবার দুদু, আব্দুল জলিল উরফে ফুকড়া জলিল ও আনোয়ার হোসেনকে আটক করে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ।

দক্ষিণ সুরমার নৈখাই হাজী মোহাম্মদ রাজা চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম ছাত্রীকে এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত ৩ জানুয়ারী নগরীর মদিনা মার্কেট থেকে আখালিয়া নিহারিপাড়ায় পাঠানটুলা দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ওই ছাত্রকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আবদুর রহিম পার্শ্ববর্তী লেকসিটি হাওরে নিয়ে জোরপূর্বক তাকে বলাৎকার করে। ঘটনায় ওই ছাত্রের বাবা বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় শিশু ও নারী নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটছে সিলেটে। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে জনমনে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সিলেট মহানগর পুলিশের ৬ থানায় গত ৪ মাসে নারী শিশু নির্যাতন, যৌতুক, ধর্ষণ ও ধর্ষণ-চেষ্টার শিকার হয়েছে ৩৪ জন। এসব অভিযোগে মামলা হয়েছে ১৩ টি।

এর মধ্যে জালালাবাদ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য ৯ টি মামলা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ১২ জনকে গ্রেফতার হয়েছে। তন্মেধ্যে ২ জনের মামলা নিস্পত্তি হয়। আর জামিনে ছাড়া পেয়েছে ৫ জন। এছাড়া ১ জন পলাতক ও ৯ জন আসামী বিদ্যমান। এয়ারপোর্ট থানায় চারমাসে নারী ও শিশু নির্যাতন হয়েছেন ৬ জন। দক্ষিণ সুরমা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন ৪ জন। সিলেট জেলা পুলিশ সুত্র জানায় সিলেট জেলায় চারমাসে ৩৭ জন নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস এন্ড ট্রাস্টের(ব্লাস্ট) তথ্য অনুযায়ী চলিত বছরের জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত নারী শিশুসহ অন্যান্য নির্যাতনের ঘটনায় ২৫ টি অভিযোগ পড়েছে তাদের কাছে।

সিলেট ফ্রিডম ক্লাবের সভাপতি কামরান তালুকদার বলেন, বাবার হাতে মেয়ে এবং নেতার হাতে বাকপ্রতিবন্ধী ধর্ষিত হয়েছে। আমরা এসব ঘটনায় বেশ উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন প্রকৃত বাবা হোক আর সৎ বাবাই হোক, তাঁর কাছে যদি মেয়ে নিরাপদ না থাকে, তবে আমাদের সমাজ ক্রমেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। দেশে প্রতিনিয়তই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এরকম অবস্থায় সিলেটের নিত্য দিনের ঘটনায় সমাজচিন্তকদের ভাবিয়ে তুলছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ার পেছনে অসহিষ্ণুতা এবং অসম সম্পর্ককে দায়ী করে ব্লাস্টের সিলেট ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী জানান, নারীর প্রতি সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি পরিবারের মধ্যে চর্চার প্রয়োজন। তাহলেই নির্যাতন বন্ধ হবে। তিনি বলেন আজকের তরুন প্রজন্ম কে জাগতে তা না হলে এটা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞ ও নারী নেত্রীরা মনে করছেন, প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, প্রশাসনের ব্যর্থতা, তদন্তে ধীরগতি, বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া, ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। এ ছাড়া আইনি দুর্বলতার কারণে অপরাধীরা পার পাওয়ায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। তবে মহামারী আকার ধারণ করেছে ধর্ষণ।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আমাতুজ জাহুরা রওশন জেবীন রুবা বলেন, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশে আইনের কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও নির্যাতন বাড়ছেই। আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও পদক্ষেপ নিলে নারী নির্যাতনের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে সরকারের পাশাপাশি সামাজিকভাবে সবাই এক হতে হবে।

নারী মুক্তি সংসদ সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি ইন্দ্রানী সেন শম্পা বলেন, নারী নির্যাতন বন্ধে অনেক ভালো আইন থাকলেও সেগুলোর প্রচার ঠিকমতো হচ্ছে না। তা ছাড়া আইন প্রয়োগেও নানা সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীদের শাস্তি দিতে বিলম্ব হচ্ছে? এ ছাড়া প্রভাবশালীরা আইন প্রয়োগের ওপর প্রভাব বিস্তর করে থাকেন? এ ক্ষেত্রে ইন্দ্রানী সেন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনারও প্রস্তাব দেন।

সিলেট জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহিনা আক্তার জানান, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে ও সুরক্ষা আইন প্রয়োগে তারা জনসচেতনা গৃষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন ভূমিকা রাখছেন বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন সবাই কে এই রোগ থেকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিরোধ করতে হবে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা অনেক কমেছে। তিনি বলেন, যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতনের মতো ঘটনা মূলত পুলিশের নজরের বাইরেই অপরাধীরা ঘটায়। সেক্ষেত্রে পুলিশ যখনই ঘটনার খবর পায়, সাথে সাথে অ্যাকশনে যায়। যার কারণে মহানগরীর ৬ থানায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলার অধিকাংশ আসামিকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। যে-কয়েকজন বাইরে আছে তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

জানাযায়, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল টোলফ্রি হেল্পলাইন ১০৯
বাংলাদেশ সরকার ও ডেনমার্ক সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের আধীন নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগামের প্রোগ্রামের আওতায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টারের উদ্দেশ্য :

নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর প্রয়োজনীয় সকল ধরনের সেবা এবং সহায়তা প্রদান নিশ্চিতকরন।

ভিকটিম এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের আইনি বিধি- বিধান সম্পর্কে দিক নির্দেশনা প্রদান

সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে বিরাজমান অন্যান্য হেল্পলাইন সম্পর্কে তথ্যপ্রদান।

ভিকটিম এবং তার পরিবারের সদস্যদের মনোসামাজিক কাউন্সেলিং সেবা প্রদান।

আইনসহায়তা প্রদানকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সমাজকর্মীর মাধ্যমে বিশেষ পরিস্থিতিতে ভিকটিমকে উদ্ধারে সহায়তামহানগরে ৩৪ সিলেট জেলায় ৩৭ জন ।