|
এই সংবাদটি পড়েছেন 72 জন

সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ২৭ বছরেও পড়েনি কর্তৃপক্ষের চোখ

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ২৭ বছরেও পড়েনি কর্তৃপক্ষের চোখ। ১শ’ শয্যার স্থানে নেই ৩০ শয্যার সুবিধাও। পাশেই নতুন সদর হাসপাতাল না করে এটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের দাবি শিশু হাসপাতাল করার মতো অবকাঠামো ও স্থান নেই।

সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল পথ চলতে শুরু করেছিল ১৯৯২ সালে। ১৪ বছর পড়ে থাকা ভবনে তখন নামমাত্র জনবল ও যন্ত্রপাতি দিয়ে চালু করা হয়েছিল হাসপাতালটি। এরপর কেটে গেছে ২৭ বছর। এর একের পর এক প্রতিশ্রুতি মিলেছে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ঘোষণা এসেছে, একের পর এক চিঠি গেছে সংশ্লিষ্ট অধিদফতরে; কিন্তু কারও চোখ তাতে পড়লে তো! ১০০ শয্যার হাসপাতাল এখনও ৩০ শয্যারও হয়ে উঠতে পারেনি- না জনবল, না সুযোগ-সুবিধা, না যন্ত্রপাতিতে। রয়েছে জরুরি বিভাগ; কিন্তু চিকিৎসক না থাকলে সেবা দেবে কে?

হাসপাতাল সূত্র জানায়, নগরীর চৌহাট্টায় ১৯৭৮ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পরিত্যক্ত থাকা পুরনো মেডিকেলের স্থাপনায় নামমাত্র জনবল দিয়ে তড়িঘড়ি করে চালু করা হয় এ ‘সদর হাসপাতাল’টি। সরকারি মান অনুযায়ী ৩৫ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে চিকিৎসকসহ মোটে ১১টি পদ দিয়ে শুরু হয় কার্যক্রম। এরপর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে তা। দুই যুগ পর ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ হাসপাতালকে ১০০ শয্যা বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানে এক সমাবেশে হাসপাতালটিতে শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। গণপূর্ত বিভাগ অবকাঠামো সংস্কারে ৩ কোটি টাকা ব্যয় করলেও ফেরত যায় ৭ কোটি টাকা।

এরপর বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল হিসেবে চালু করতে পদ সৃষ্টি করে জনবল নিয়োগের জন্য ২০১৫-১৬ সালে চার দফা চিঠি পাঠানো হয় স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। একই সময়ে ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ২৮ কোটি টাকা চেয়ে আবেদন করা হয়। ২শ’ শিশুকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য বর্তমান ভবন সম্প্রসারণের জন্য চিঠি দেয়া হয়। পরে ‘শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ শিশু হাসপাতাল’ নামকরণ, কার্যক্রম চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন চেয়ে দেয়া হয় একাধিক চিঠি। কিন্তু এখনও বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল হয়ে উঠেনি এটি।

কাগজে-কলমে ১০০ শয্যার হলেও জনবল নেই ৩০ শয্যা হাসপাতালেরও। সিনিয়র কনসালটেন্ট, জুনিয়র কনসালটেন্ট, মেডিকেল অফিসার দু’জন করে। আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও), অ্যানেসথেটিস্ট, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, ডেন্টাল সার্জনের পদ রয়েছে একটি করে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আরএমও পদটি শূন্য। একজন জুনিয়র কনসালটেন্টকে অতিরিক্ত হিসেবে ওই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীর ১৫ পদের ৩টিই শূন্য। ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীর ২৮টি পদের মধ্যেও শূন্য রয়েছে ১টি। উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক, নার্সিং সুপারভাইজার, সিনিয়র স্টাফ নার্স, স্টাফ নার্স, সহকারী নার্সের ১১১টি পদের মধ্যে ২২টিই শূন্য আছে। ল্যাব টেকনিশিয়ান আর অপারেটরের অভাবে অচল হয়ে আছে যন্ত্রপাতি। এসব সংকটে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

সঙ্গত কারণেই হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- প্রকৃত অর্থে এটি এখন কী, সদর হাসপাতাল নাকি শিশু হাসপাতাল!

বিপরীতে জীর্ণ শামসুদ্দিন হাসপাতালের পাশেই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ভেঙে নির্মাণ করা হচ্ছে ২৫০ শয্যার নতুন ‘সদর হাসপাতাল’। এ নিয়ে ক্ষুুব্ধ শামসুদ্দিন হাসপাতালে কর্মরতরা। তারা মনে করেন, একটি মহল সিলেটবাসীর আবেগ নিয়ে খেলছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের শীর্ষপদে সিলেটের লোক থাকার পরও এসব বিষয় বুঝতে না পারা দুঃখজনক। তাদের দাবি, শামসুদ্দিন হাসপাতালকে সংস্কার করে প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো দিয়ে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা যেতে পারে। আর ঐতিহ্যবাহী আবুসিনা ছাত্রাবাস সংরক্ষণ করে মানসম্মত জায়গায় বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল করা যেতে পারে।

তাদের মতে, শামসুদ্দিন হাসপাতালের এখন যে অবকাঠামো, তাতে শিশু হাসপাতালে রূপান্তর করতে গেলে বড় অঙ্কের ব্যয় সামলাতে হবে সরকারকে। অথচ এর ভবন সম্প্রসারণ করেই এখানে বড় আকারে সদর হাসপাতাল করা যেতে পারে। তাতে ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতাল গড়তে যে বিশাল ব্যয় বর্তমানে সরকার করছে, সেটিও করতে হবে না। সেক্ষেত্রে এর চেয়ে কম ব্যয়ে আধুনিক শিশু হাসপাতাল সুবিধাজনক কোনো স্থানে গড়ে তোলা যেতে পারে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ভাষ্যও তাই। তারা বলছেন, বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের যে বৈশিষ্ট্য ও জায়গা থাকা প্রয়োজন, সেটা শামসুদ্দিন হাসপাতালের নেই। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি বিভাগের মতো সিলেটেও বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল হবে। তবে সেটার জন্য অন্যত্র জায়গা করতে হবে।

সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত আরএমও ডা. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ রোগীকে সেবা দেয়া হয় এই হাসপাতালে। প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো না থাকলেও সীমিত ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা সেবার মান ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তবে জনবল, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো সংকট, পানি ও টয়লেটের সমস্যা সমাধান হলে হাসপাতালটি কাক্সিক্ষত সেবার পাশাপাশি ভালোমানের সেবাও দিতে পারবে। তিনি বলেন, বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন।

শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের অধীক্ষক ব্রিগেডিয়ার ইউনুছ রহমান বলেন, বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদফতর বা মন্ত্রণালয়ের লোকজন জানেন। এটি এখন আর আমার অধীনে নেই। শামসুদ্দিন হাসপাতালের সব সংকট সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করেছি। আশা করি, দু-চার মাসের মধ্যেই সমাধান হয়ে যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সিলেটের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল হবে।