Mon. Apr 12th, 2021

কোটিপতিও ঘর পেয়েছেন মাস না যেতেই ঘরের নাজুক অবস্থা

কুমিল্লাঃ কুমিল্লার মুরাদনগরে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প-২’ এর আওতায় ‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের মধ্যে যাদের জমি আছে ঘর নাই, এমন অসহায় দুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তালিকা করে ৩৭৬টি পরিবারকে বিনামূল্যে ঘর দেয়ার কথা থাকলেও উপকারভোগীদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে সরকারি এ ঘর দেয়া হয়েছে বিত্তশালীদের। অপরদিকে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে এসব ঘর নির্মাণ করায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে অল্প দিনের মধ্যেই। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ঘর বণ্টন করায় এ আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হতদরিদ্ররা। অর্থের বিনিময়ে ঘর পাবার বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় উপজেলার সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, প্রতিটি ঘর থেকে গড়ে ২০ থেকে ৫০ হাজার করে টাকা নিয়েছে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার, চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা।

আর যারা টাকা দিতে পেরেছে তাদের নামের তালিকা নিয়েছে জনপ্রতিনিধিরা। অপর দিকে ঘর তৈরির মালামাল উপকারভোগীদের বাড়ি নেয়ার জন্য পরিবহন ভাড়া বাবদ ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়েছে।

এ ছাড়া আগামী প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অনেকের কাছ থেকে অগ্রিম ১০ হাজার করে টাকা নেয়ারও অভিযোগ উঠেছে। সদর ইউনিয়নের ঘোড়াশাল গ্রামের মোতাহার হোসেন কালা মিয়া ইউপি সদস্য আবদুল মালেকের দোকান বাকির ২০ হাজার ও নগদ ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘর পেয়েছে। কাজিয়াতল গ্রামের ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলামের ভাই ও মৃত সামছুল হকের ছেলে সুমন ঢাকায় নিজ মালিকানাধীন বাড়িতে বসবাস করলেও তিনি ঘর পেয়েছেন।

একই এলাকার মৃত মজলু মিয়ার স্ত্রী নূরজাহান বেগমের বরাদ্দ ঘর স্থানীয় মহিলা মেম্বার শাহানাজ বেগমের বাড়িতে নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্বধইর পুব ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মামুনুর রশিদের ভাই ও দৈলবাড়ি গ্রামের মৃত আবদুর রাজ্জাকের ছেলে ইউছুফের নামে ঘর নেয়া হয়েছে। আকুবপুর ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও মেটেংঘর গ্রামের জুয়েল রানা কোটিপতি হয়েও ঘর পেয়েছে। পূর্বধইর গ্রামের মৃত সাহেব আলীর ছেলে রশিদ মিয়া স্থানীয় ইউপি সদস্য মোশাররফ হোসেনকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ঘর পেয়েছেন। পরে আরো ২০ হাজার টাকা মেম্বারকে দেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দেয়া হচ্ছে। মীর্জাপুর গ্রামের মৃত মঙ্গল মিয়ার ছেলে খোরশেদ মিয়ার পুরাতন ঘরটি স্থানীয় মেম্বারকে দিয়ে পেয়েছে নতুন ঘর। মীর্জাপুর গ্রামের পুকুরপাড় এলাকার মৃত সুন্দর আলীর ছেলে রবিউল ও রামচন্দ্রপুর উত্তর ইউনিয়নের সোনাকান্দা গ্রামের মৃত কুদ্দুছ মিয়ার ছেলে শাহ আলম চট্টগ্রামে বসবাস করলেও ছোট ভাই উমরের বাড়িতে ঘর নির্মাণ করে বিক্রি করে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপকারভোগী বলেন, আমাকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দামের একটি ঘর দেয়ার কথা বলে দুই বারে বিশ হাজার করে ৪০ হাজার টাকা নিয়েছে। পরে আরো ১০ হাজার টাকা চাইলে ৮ হাজার টাকা দেই। যাচাই করার জন্য স্যারেরা এলে তাদের খানা খাইয়ে আরো এক হাজার টাকাও দিতে হয়েছে। আর ঘর নির্মানের মালামাল চার ধাপে আমাদের বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য প্রতিবার এক হাজার টাকা করে চার হাজার টাকা নেয়। মুরাদনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবদুল হাই খান অভিযোগ পাওয়া ঘরগুলোর বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে স্বীকার করে জানান, মেম্বারের আত্মীয়স্বজন গরিব হলে কী তারা ঘর পাবে না! ইউপি সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে মতবিরোধ থাকায় এমন অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিতু মরিয়ম জানান, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে তা সত্য নয়। তবে বিভিন্ন ইউনিয়নে কিছু অনিয়ম হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করেছেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।