|
এই সংবাদটি পড়েছেন 82 জন

সিলেটে নতুন সম্ভাবনা এশিয়ান হাইওয়ে

বিশেষ প্রতিনিধিঃ  শিল্পায়নে পিছিয়ে পড়া সিলেটে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে এশিয়ান হাইওয়ে। সিলেটের দুটি সড়ক এশিয়ান হাইওয়ের সাথে যুক্ত হলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এখানকার অর্থনীতি ও সড়ক যোগাযোগে। সৃষ্টি হবে দেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগের সুযোগ- এমনটা মনে করছেন সিলেটের ব্যবসায়ী নেতারা।

এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নিত করতে ইতোমধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া সুতারকান্দি-সিলেট সড়কটিও এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত করতে শুরু হয়েছে জরিপ কাজ।

এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে সিলেট-তামাবিল সড়ক ৬ লেনে (দুটি সার্ভিস লেনসহ) উন্নীতকরণে লক্ষ্যে গত বছরের শেষের দিকে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাশ হয়।

শিল্প ও বাণিজ্য গতিশীল করতে এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক জোরদারের লক্ষ্যে ‘ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর প্রকল্প’ হিসেবে এটি হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ওই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। এশিয়ান হাইওয়ের অংশ হিসেবে নরসিংদীর কাঁচপুর থেকে সিলেটের শেরপুর হয়ে তামাবিল দিয়ে এই সড়কটি যুক্ত হবে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে।

এই সড়ক ছাড়াও এশিয়ান হাইওয়ের সাথে যুক্ত হতে যাচ্ছে শেওলা-চারখাই-সিলেট সড়কটি। ভারতের সুতারকান্দি স্থলবন্দর দিয়ে হাইওয়েটি প্রবেশ করবে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার শেওলা দিয়ে। এরপর সড়কটি (সার্ভিস দুই লেনসহ ৬ লেন সড়ক) চারখাই, গোলাপগঞ্জ হয়ে সিলেট নগরীর কিনব্রিজ পর্যন্ত আসার কথা। সেখান থেকে এশিয়ান হাইওয়ে চন্ডিপুল হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত যাবে- এমন নকশা প্রণয়ন করেছে সওজ। গত মার্চ মাস থেকে এই সড়কটির সম্ভাব্যতা যাচাই এবং টেকনিক্যাল ও সোস্যাল স্ট্যাডি শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সড়ক ও জনপথের (সওজ) একটি দল শেওলা-সিলেট বর্তমান আঞ্চলিক সড়কটি মাপঝোঁক করে গেছে।

তবে সূত্র জানিয়েছে, এই সড়কের ম্যাপে শেষ পর্যন্ত কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। যানজট এড়াতে সড়কটি কিনব্রিজ পর্যন্ত না এসে দক্ষিণ সুরমার শ্রীরামপুর থেকে পারাইরচক বাইপাস হয়ে বর্তমান সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের সাথে যুক্ত হতে পারে। সিলেটের শেওলা থেকে নরসিংদীর কাঁচপুর পর্যন্ত এই হাইওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮০ কিলোমিটার হতে পারে বলে সওজ সূত্র জানিয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়–য়া জানান, শেওলা-সিলেট-কাঁচপুর এশিয়ান হাইওয়ের প্রকল্প সওজ ঢাকা অফিস থেকে তদারকি করা হচ্ছে। হাইওয়েটি বাস্তবায়ন করতে হলে কি পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা লাগবে, অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকের সংখ্যা, স্থাপনার সংখ্যা এসব বিষয়ে জরিপ চলছে।

অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যাপারেও জরিপ কার্যক্রম চলছে। এসব কার্যক্রম শেষ হলে হাইওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হবে। তবে এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সিলেট-তামাবিল ও সিলেট-শেওলা সড়ক যুক্ত করার আগে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ৬ লেনের কাজ শেষ করতে হবে।

এদিকে, এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সড়ক দুটি যুক্ত হলে সিলেটের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এশিয়ান হাইওয়ের সাথে যুক্ত হলে সিলেটের সীমান্তবর্তী ভারতের সাতটি রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার আরো সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন তারা। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ও সহজ হলে ‘সেভেন সিস্টার’ হিসেবে খ্যাত ভারতে এই রাজ্যগুলোতে পণ্য রফতানির আরো সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়াও চীন, ভুটান, নেপাল, মায়ানমারের সাথেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

সিলেটের ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এশিয়ান হাইওয়ে সবেচেয়ে বেশি সুফল নিয়ে আসতে পারে সিলেটের শিল্পায়নে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় ভারতের সেভেন সিস্টারে বাংলাদেশি পণ্য রফতানির বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সিলেটে গড়ে ওঠতে পারে শিল্প কারখানা। বিশেষ করে সিলেটে নির্মাণাধীন হাইটেক পার্ক এবং প্রস্তাবিত সিলেট ইকোনোমিক জোন ও শ্রীহট্ট ইকোনোমিক জোন বাস্তবায়িত হলে সেখানে দেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগে গড়ে উঠবে শিল্প প্রতিষ্ঠান। এশিয়ান হাইওয়ে ব্যবহার করে এসব ইকোনোমিক জোনে উৎপাদিত পণ্য সহজেই সার্কভূক্ত দেশ ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রফতানি করা সম্ভব হবে। এতে রফতানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এ ব্যাপারে সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বলেন, এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সিলেটযুক্ত হলে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাথে আমাদের কানেকটিভিটি বাড়বে। সিলেটে কাঁচামালের সহজলভ্যতা, পুঁজি ও বিনিয়োগে আগ্রহী উদ্যোক্তা থাকা সত্ত্বেও এতোদিন আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শিল্পায়নে পিছিয়ে ছিলাম। এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হতে পারলেন এখানে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে তা কাজে লাগানো যাবে। এছাড়াও সিলেটে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলে ভারতের সেভেন সিস্টারখ্যাত সাতটি রাজ্যের প্রচুর রোগী ও শিক্ষার্থী পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।