|
এই সংবাদটি পড়েছেন 59 জন

ব্রিটেনে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা চালু হতে পারে এ বছরই

ডেইলি বিডি নিউজঃ যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবার প্রেক্ষাপটে চলতি বছর থেকে সেদেশে কারি ইন্ডাস্ট্রির জন্য ওয়ার্ক পারমিট ভিসা চালু হতে পারে। সম্প্রতি ব্রিটেনের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের মাইগ্রেশন এডভাইজারি কমিটি (ম্যাক)ও সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের কারি ইন্ডাস্ট্রির শ্রমিক সংকটের বিষয়টি সামনে এনে এই খাতকে ‘শর্টেজ অকুপেশন লিস্টে’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে, ব্রিটেনের কারি ইন্ডাস্ট্রির জন্য বিদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক সংগ্রহের বিষয়ে নতুন কোন স্কিম আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে, ম্যাক প্রধান স্যার আলেক্স মেনিং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন বলে জানা গেছে। সার্বিক বিবেচনায় এ বছরই ব্রিটেনে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা চালু হতে পারে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ২০০৬ সালে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় যুক্তরাজ্যে যাবার সুযোগ পান।

ব্রিটেনের কারি ইন্ডাস্ট্রি সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শ্রমিক সংকটের কারণে গত প্রায় দেড় দশক ধরে চরম সংকটের মুখে পড়েছে ব্রিটেনের কারি ইন্ডাস্ট্রি।

বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন (বিসিএ) সভাপতি কামাল ইয়াকুব সিলেটের ডাক-কে জানান, ব্রিটেনের ইন্ডিয়ান কারি ইন্ডাস্ট্রি নামে পরিচিতি থাকলেও মূলতঃ উপমহাদেশীয় খাবার পরিবেশনে নিয়োজিত প্রায় সাড়ে ১২ হাজার রেস্টুরেন্টের অধিকাংশের মালিক বাংলাদেশিরা। কিন্তু, শ্রমিক সংকটের কারণে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ২/৩ টি রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে, শতবর্ষ প্রাচীন ব্রিটেনের এই কারি ইন্ডাস্ট্রি কার্যতঃ এখন হুমকির মুখে রয়েছে।

কামাল ইয়াকুব জানান, এ মুহূর্তে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলোতে শেফ, তান্দুরি শেফ, কিচেন পোর্টার, ওয়েটারসহ বিভিন্ন পদে প্রায় ৩৬ হাজার শ্রমিক প্রয়োজন। কিন্তু, এসব পদে দক্ষ শ্রমিক না থাকার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারি ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

আগামী ৩১ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবার কথা যুক্তরাজ্যের। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটে যুক্তরাজ্যের ৫২ শতাংশ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবার পক্ষে মত দেন। বেক্সিট কার্যকর হলে যুক্তরাজ্যে হঠাৎ করেই শ্রমিক সংকট দেখা দেবে। এক্ষেত্রে কারি ইন্ডাস্ট্রিতেও দেখা দেবে শ্রমিক সংকট। ফলে যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন পলিসিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ইতোমধ্যে, যুক্তরাজ্য সরকার কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ শ্রমিক আমদানির জন্য একাধিক পাইলট প্রজেক্ট ঘোষণা করেছে। ফলে, কারি ইন্ডাস্ট্রির জন্য ওয়ার্ক পারমিট চালু হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছেন এই খাতের সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কারি ইন্ডাস্ট্রির শ্রমিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে এবং বিদেশ থেকে বিশেষতঃ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত থেকে এই খাতের শ্রমিকদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট চালুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন তারা। এ দাবিতে গত বছরের ১০ জুলাই লন্ডনে পার্লামেন্ট হাউজের সামনে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ করেন কারি ইন্ডান্ট্রি সংশ্লিষ্টরা। ঐদিন তারা সংসদে ৩০ জন এমপির সাথে মতবিনিময় করে ওয়ার্ক পারমিট চালুর দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তারা সরকারের প্রতি যে সব দাবি জানান, তার মধ্যে ছিল বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়ার অনুমতি প্রদান, অবৈধ শ্রমিকদের বৈধতা দান, যখন তখন রেস্টুরেন্টগুলোতে ইউকে বর্ডার এজেন্সির তল্লাশি বন্ধ করা এবং এখাতকে ‘শর্টেজ অকুপেশন লিস্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত করা। সে সময় আন্দোলনকারীরা শেফদের জন্য ১২ মাসের ওয়ার্ক পারমিট ভিসা এবং লো স্কিল্ড ওয়ার্কার (যেমন- কিচেন পোর্টার, ওয়েটার ইত্যাদি)-এর জন্য ৬ মাসের ওয়ার্ক পারমিট ভিসা চালুর প্রস্তাব দেন।

এসব দাবিতে তারা যুক্তরাজ্যের হোম সেক্রেটারি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সাজিদ জাভিদের কাছে ১৭৮ পৃষ্ঠার একটি শ্বেতপত্রও দাখিল করেন।

ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ডের প্রতিষ্ঠাতা এনাম আলী এমবিই জানান, গত দেড় যুগ ধরে বৈষম্যমূলক ইমিগ্রেশন নীতির বিরুদ্ধে জোর লবিং ও প্রচারণা চালিয়ে আসছেন এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। ২০০৫ সালে ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ড চালু হওয়ার পর এটা গণদাবিতে পরিণত হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন থেকে শুরু করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মেসহ বিভিন্ন স্তরে এই দাবি তুলে ধরা হয়েছে।

এনাম আলী জানান, গত ২০ বছর ধরে নানা রকম ক্যাম্পেইন পরিচালনার পর ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসছে। লো স্কিল ওয়ার্কারদের কাজের সুযোগ দিতে মাইগ্রেশন এডভাইজারি কমিটি (ম্যাক) কারি ইন্ডাস্ট্রির অনুকূলে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। ফলে যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ বিশ্বের যেকোন জায়গা থেকে ব্রিটেনে কাজের সুযোগ পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এতে কর্মী সংকটে জর্জরিত ব্রিটিশ কারি ইন্ডাস্ট্রিতে দক্ষ শেফ ও দক্ষ জনশক্তি আনার সুবিধা হবে। এক্ষেত্রে আবারো সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট শ্রমিকদের।

তিনি বলেন, ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন নীতিতে সমঅধিকারের দাবি নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়েছেন, তারা এটাকে নিজেদের প্রচারণার সাফল্য বলেই মনে করছেন।
ব্রিটেনের বাঙালি রেস্তোরাঁ মালিকদের দীর্ঘদিনের প্রচারণার ফলে বিষয়টি যুক্তরাজ্যে আইন প্রণেতাদেরও নজরে আসে। গত বছর হাউজ অব কমন্সে এক বক্তৃতায় ব্রিটেনের কারি হাউজের জন্য এশিয়ান দেশগুলোতে আরো বেশি সংখ্যক শেফ আনার অনুমতি দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান পল স্কলি হাউজ অব কমন্সের অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ অন দ্যা কারি ক্যাটারিং ইন্ড্রাস্ট্রি‘র চেয়ারম্যান, ব্র্রিটিশ এমপি পল স্কলি। হাউজ অব কমন্সের ডিবেইটে অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি জানান। কারি হাউজ রক্ষায় এশিয়ান দেশ থেকে আরো বেশি দক্ষ শেফ আনার উপর জোর দেন তিনি। তার মতে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলে কারি হাউজগুলো আবারো জমে উঠবে। দক্ষ শেফ সংকটে জর্জরিত কারি শিল্পের বর্তমান দুরবস্থায় তিনি ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন পলিসিকে দোষারোপ করেন।

হাউজ অব কমন্সের এই ডিবেইটে অংশ নিয়ে তার মতামতকে সমর্থন জানান কনজারভেটিভ এমপি এ্যান মেইনও। তিনি বলেন, সরবকারের জটিল ইমিগ্রেশন পলিসির কারণে সংকটে পড়েছে ফুড ইন্ডাস্ট্রি।

ব্রিটেনের বাংলাদেশি রেস্তারাঁ মালিকরা মনে করছেন, ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে বিদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নিয়ে আসা সম্ভব হলে কারি ইন্ডাস্ট্রি আবারো প্রাণ চঞ্চল হবে।

ব্রিটিশ সরকারের ইন্ডিপেন্ডেন্ট মাইগ্রেশন অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠকে নতুন ইমিগ্রেশন নীতির প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, কম দক্ষ জনশক্তি ব্রিটেনে আনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো রুট থাকা উচিত নয়। আর ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ জানিয়েছেন, নতুন পরিকল্পনার আওতায় কৃষি, স্যোশাল কেয়ার ও রেস্টুরেন্টসহ কিছু সুনির্দিষ্ট খাতে কম দক্ষ জনশক্তি আনার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।

যুক্তরাজ্যেও হোম অফিসের একটি সূত্র জানায়, টিয়ার-২ টাইপ ভিসার ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ ও পরিধি বাড়াবার পরিকল্পনাও রয়েছে ব্রিটিশ সরকারের।]

উল্লেখ্য, ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটেনের রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন (বিসিএ) বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শেফসহ কারি ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশী ক্যাটারার্স ও স্টাফদের বিভিন্ন সমস্যা, প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধারাবাহিক কাজ করে আসছে। বিসিএ ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশি কারি ইন্ড্রাস্ট্রির বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন ফোরামে দাবি দাওয়া তুলে আসছে। বিসিএ সভাপতি কামাল ইয়াকুব এবং সাধারণ সম্পাদক অলি খাঁন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিসিএ’র দীর্ঘদিনের দাবির জন্য না হলেও ব্রেক্সিটের কারণে সরকার অভিবাসননীতি শিথিল করছে। নতুন অভিবাসন নীতিতে সুষ্পষ্টভাবে রেস্টুরেন্টগুলোর জন্য ওয়ার্ক পারমিট ইস্যুর বিষয়টি থাকবে বলে আমরা আশাবাদী।