|
এই সংবাদটি পড়েছেন 1,731 জন

সিলেটের নগরীর মোড়ে মোড়ে পিলেচমকানো কিশোর গ্যাংস্টার

বিশেষ প্রতিনিধিঃ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আচমকাই আপনার পাশ দিয়ে সামনে চলে গেলো বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল। হর্ন বা এ জাতীয় কিছু দিয়ে জোরে কানফাটানো শব্দ করছে। সাইলেন্সার খুলে নেওয়া এই দু’চাকার যন্ত্রযানের শব্দে আঁৎকে উঠলেন আপনি। চেয়ে দেখলেন-চালাচ্ছে যারা, তাদের বয়স খুব বেশি হলে চৌদ্দ কি পনেরো হবে। একসাথে ১০/১২ টি মোটরসাইকেল। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আপনি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন।

কিংবা ঘর থেকে বের হয়েছেন। পাড়ার মোড়ে আসামাত্র দেখলেন একটি জটলা। উঁকি দিলেন। ভয়ে আপনার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে গেলো। রড, হকিস্টিক দিয়ে ৪/৫ জন মিলে পেটাচ্ছে একজনকে। যে মার খাচ্ছে তার বয়স বড়জোর ১৫/১৬। আর যারা পেটাচ্ছে তারাও সম-বয়সী। প্রাণ ভয়ে আপনি পালালেন।

মানুষ ইদানিং খুব বেশি করে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। সিলেট নগরীর প্রতিটি এলাকার দৃশ্য প্রায় একইরকম। হর-হামেশা ঘটছে এগুলো। চোখ বুলালেই বিপজ্জনক মুখগুলো ভেসে উঠছে। কারো ছিপছিপে গড়ন, কোঠরে চোখ ঢুকে গেছে কারো। কেউ আবার কেতাদুরস্থ। হাল ফ্যাশনের জামা-কাপড় পরণে, পায়ে আধুনিক ডিজাইনের জুতো। চুল-দাড়িতে তারা ব্যতিক্রম। ইমো সুইপ, লেয়ার স্পাইক কিংবা বাজকাট চুলের ছাটে ‘ভাব নেওয়া’কে ধ্যান-জ্ঞান করে কেউ। চলা-ফেরায়ও তারা অন্যদের থেকে আলাদা। হিংস্র-বেপরোয়া। অবলীলায় রক্তের খেলায় মেতে উঠে। বুকে ছুরি মেরে বসতে পারে। এরা কিশোর অপরাধী-ভয়ঙ্কর কিশোর গ্যাংস্টার।

সাম্প্রতিক সময়ে এরা ভয়ানক বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় ৪/৫ জনের একদল কিশোর খুন করে শাহেদ আহমদকে। সে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র। নগরীর রংধনু আবাসিক এলাকার মৃত আবদুল খালিক তার পিতা। সবাই মিলে ছুরি দিয়ে তাকে খুন করে। শাহেদের বন্ধুরা মদন মোহন কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রকে মারধর করে কিছুদিন আগে। এরপর মার খাওয়া ওই ছাত্রের ‘বন্ধুরা’ প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠে। তারা ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার অংশ হিসেবেই খুনের পথে পা বাড়ায়। অনেকগুলো ঘটনার একটিমাত্র উদাহরণ এটি। খুনোখুনিতে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার এমন ঘটনা কম নয়। নগরী এবং নগরীর বাইরে এ বছরেই খুন হয়েছে আরো অন্তত ৪জন। সবগুলো খুনের পেছনেই কিশোর গ্যাংস্টারদের ‘অভিন্ন চরিত্র’।

সিলেট নগরীর মোড়ে মোড়ে এদের দেখা মেলে, দেখা মেলে অলিতে-গলিতে। আড্ডা দিতে দিতে এরা ভয়ানক কোনো পরিকল্পনাই করে বসে হয়তো । এক গ্রুরুপের কেউ ‘বেয়াদবি’ করে বসেছে। তাকে শায়েস্তা করতে হবে। কিশোররা প্লট সাজায়, পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনার শেষ অংশে থাকে ‘ফেলে দেওয়া’র গল্প। কোনো কিছু বোঝে উঠার আগেই একজনের জীবন শেষ। নিজেদের ভেতরে লোমহর্ষক এমন ঘটনা জন্ম দেওয়ার পাশাপাশি এরা সমাজেও ক্ষত সৃষ্টি করছে-এমন বিশ্লেষণ সংশ্লিষ্টদের। ইদানিং ইভটিজিং, চুরি, ছিনতাই, রাহাজানির সাথে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। একই সাথে আধিপত্য বিস্তার আর নিজের ‘হিরোইজম’ প্রতিষ্ঠায়ও এরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কিশোদের এমন ভয়ানক কাজে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে নেই।

গ্যাংস্টার কারা-এমন জিজ্ঞাসার জবাব পেতে অনুসন্ধান করেছে ভোরের ডাক প্রতিনিধিরা । দেখা গেছে, নগরীর প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়ই এদের বিচরণ। রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে কিশোর মনের রং উবে গেছে তাদের। ‘ছোট ভাই-বড় ভাই’ মিলে আড্ডা দিতে দিতে এক সময় এরা একেকজন হয়ে উঠে দুর্ধর্ষ অপরাধী। সিলেট নগরীর উপশহর, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, বালুচর, সরকারী কলেজ, এমসি কলেজ, মেজরটিলা, মাদানীবাগ, জল্লারপার, লামাবাজার, মির্জাজাঙ্গাল, রিকাবীবাজার, তালতলা, তেলিহাওর, শেখঘাট, মাছুদিঘিরপার, জামতলা, মিরবক্সটুলা, কাজীটুলা, আম্বরখানা, দর্শনদেউড়ি, রাজারগলি, হাউজিং এস্টেট, সুরমা মার্কেট, বন্দরবাজার, শাহী ঈদগাহ, কল্যাণপুর, শাপলাবাগ, পীরমহল্লা, ফাজিলচিশত, দক্ষিণ সুরমাসহ প্রায় সব এলাকাতেই ‘পিচ্ছি বাহিনী’ হিসেবে পরিচিত কিশোররা ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে।

আখালিয়া, মদিনা মার্কেট, কালীবাড়ি এলাকায় কিশোর বয়সের সমর, দিপু, আকিব, রাব্বী, নাঈম, সুমন ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের চোখ রাঙানিতে মানুষ এক দমবন্ধ পরিবেশে বসবাস করছেন। নিজেদের মধ্যে মারামারি ছাড়াও এলাকায় চুরি-ছিনতাই, চাঁদাবাজির মতো অপরাধের সাথে জড়িয়ে হাত পাকাচ্ছে এরা।

আম্বরখানা ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ মোহন, আহমদ, আদামসহ একদল বখাটের হাতে। মির্জাজাঙ্গাল, লামাবাজার, দাড়িয়াপাড়া এলাকায় জয়, লিবন, নাঈম, রাশেদ, ইমন ও তাদের বন্ধু-বান্ধবদের রাজত্ব। এলাকার সাধারণ মানুষের শান্তি হরণ করেছে এরা। উপশহর আই ব্লাক মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় দিদার, মুন্না, রনি, ইমন ও তাদের সহযোগিদের নিয়ন্ত্রণ। কথায় কথায় মারামারি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি এদের পেশা হয়ে গেছে। মুন্না, অপু, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আমীন, জিহাদ, মান্না, সামিয়াল, নিলয়, তাওহীদ, কিবরিয়াসহ অন্য আরেকটি গ্রæপও দাপিয়ে বেড়ায় এই এলাকা। কাজীটুলা ও আশপাশের এলাকায় সৌমিক, ইশরাম কোরেশী নায়েক ও তাদের সতীর্থরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। টিলাগড়, শিবগঞ্জসহ আশপাশে সৌরভ, ইউনুস, রাফি, আসাদ, শাহেদ, অনিক, রাহাত ও তাদের সতীর্থদের উৎপাত চরমে পৌঁছেছে। এই এলাকায় মুতাচ্ছির, রুহেল, আবিদ, সাগর, মাহিন, আফজল ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গদেরও দাপট। এই এলাকায় মিজান, সাকিব, রাহেলসহ আরেকটি গ্রæপের দাপট। দু’দিন পর পরই সেখানে নানা অঘটন ঘটে। তেররতন, সাদাটিকর ও উপশহর এলকায় এহিয়া আলম মুন্না, সানি, তারেক, ফাহিম, সাহেদ, নাসির ও তাদের ঘনিষ্টদের আধিপত্য রয়েছে। একই এলাকায় অন্য একটি গ্রুরুপের রাব্বি, ফাহিম, লিটন ও তাদের সহযোগিরা নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। জেলরোড এলাকায় রিফাত, ইমন, রকিব, ইমতিয়াজ, ইসলাম, ইমন, জুমেল, জুনেদ, তুহিন, আহমদ ও তাদের সতীর্থরা আস্তানা গেঁড়ে নানান অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ সুরমার খোজারখলা আল মারকাজ পয়েন্টে ইসমাঈল, শুভ, সোহেল, নয়ন, জামাল ও তাদের সহযোগীরা আস্তানা গেঁড়েছে। বাবনা পয়েন্টে রায়হান, আরাফাতসহ একটি গ্রুরুপ আড্ডার ছলে নানা অপকর্ম করে বেড়ায়। এলাকার মানুষ অস্বস্তিতে রয়েছেন এদের কারণে।

কিশোর অপরাধীদের বিষয়ে ওয়াকিবহাল পুলিশ প্রশাসনও। বখাটেপনা, মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেওয়া কিংবা অপরাধ সংঘটনের মাধ্যমে সমাজে বিশৃংলা সৃষ্টির বিষয়টিকে পুলিশ নজরে রাখছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার জেদান আল-মুসা বলেছেন, শিশু আইনেই এদের ব্যাপারে বলা আছে। এই আইন প্রয়োগও হচ্ছে। তবে জেদান আল-মুসা গুরুত্ব দিচ্ছেন অভিভাবকদের সচেতনতার উপর। তিনি বলেন, অভিভাবক সচেতন হলে শিশুদের বাজে আড্ডা বন্ধ হয়ে যাবে। তারা অপরাধে জড়িত হতে পারবে না। এর পরও যদি কেউ সোজা পথে না আসে তাহলে সেক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো গতি থাকে না।