|
এই সংবাদটি পড়েছেন 11 জন

ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দুর্ভোগে নগরবাসী

ডেইলি বিডি নিউজঃ মুষলধারার বৃষ্টিতে ছয় দিনের মাথায় আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। শনিবার নগরীর বেশির ভাগ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে।

প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, বাসা-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল-ক্লিনিকে পানি প্রবেশ করে। হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে যায় অনেক এলাকা। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। নগরীর বেশির ভাগ খাল ও নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি সরে যেতে পারেনি। অনেক এলাকায় রাস্তা ও জনবসতির মধ্য দিয়ে খালের উপচেপড়া পানি বইতে দেখা যায়।

থইথই পানিতে দিনভর চরম দুর্ভোগের মধ্যে কাটাতে হয়েছে নগরবাসীকে। জীবনযাত্রা হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। সড়ক ডুবে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ ছিল যানবাহন চলাচল। এ সময় নগরজুড়ে দেখা দেয় তীব্র যানজট। পানি জমে যায় ফ্লাইওভারেও। সড়কের দুর্ভোগ এড়াতে যেসব যানবাহন ফ্লাইওভারে ওঠে সেগুলো সেখানে আটকা পড়ে। স্রোতের কারণে অনেক সড়কে হেঁটেও যাতায়াত করা যায়নি।

কর্মজীবী নারী ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ছিল তুলনামূলক বেশি। গাড়ির অভাবে রাস্তায় রাস্তায় আটকে পড়ে নারী ও শিশুরা। ভয়ে অনেককে কান্নাকাটিও করতে দেখা যায়। নগরীর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণে সেনাবাহিনীর চারটি টিম কাজ করছে। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নেয়া মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে পড়ায় নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের সূত্রপাত হয়। বিকাল পর্যন্ত অন্তত দুটি এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানি না ঘটলেও দু’জন আহত হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে। ষোলশহর বন গবেষণাগার ইন্সটিটিউটের সামনে রেললাইনে পানি ওঠায় দুপুর পর্যন্ত চলেনি চবি’র শার্টল ট্রেন।

চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস জানায়, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯৮ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আজ রোববারও বৃষ্টি হতে পারে। তবে সোমবার থেকে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে পারে।

সোমবার ভারি বর্ষণে নগরীতে সৃষ্টি হয়েছিল মৌসুমের প্রথম বড় আকারের জলাবদ্ধতা। এরপর থেকে বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানিতে প্রতিদিনই নির্দিষ্ট কিছু এলাকা প্লাবিত হয়। এর মধ্যে শনিবার সকালে এক ঘণ্টার মুষলধারার বৃষ্টিতে দেখা দেয় দ্বিতীয় দফা জলাবদ্ধতা। এর কারণে সোমবারের চেয়েও শনিবার নগরবাসীর বেশি ভোগান্তি হয়েছে। শুক্রবার রাতে কয়েক দফা বৃষ্টিতে নালা ও খালগুলো টইটম্বুর হয়ে পড়ে। শনিবার সকাল থেকে ভারি বর্ষণ হতে থাকলে আবারও জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে নগরী। দুপুরের পর বৃষ্টি কিছুটা কমে এলেও অনেক এলাকা থেকে বিকাল নাগাদও পানি সরেনি। যেসব এলাকা জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে তার মধ্যে রয়েছে- আগ্রাবাদ, হালিশহর, ওয়াসা, লালখানবাজার, মেহেদিবাগ, প্রবর্তক, অক্সিজেন মোড়, মুরাদপুর, জিইসি, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাদুড়তলা, পাঁচলাইশ, শুলকবহর, কাপার্সগোলা, কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া, গোসাইলডাঙ্গা, নিমতলা। এসব এলাকার কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। নগরীর প্রধান সড়ক মুরাদপুর বিশ্বরোডের জিইসি মোড় থেকে দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর হয়ে বহদ্দারহাট পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা যায়। কোমর পানিতে সড়ক তলিয়ে গেলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর সংযোগ সড়কগুলো দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে।

রাস্তার ওপর দিয়ে প্রচণ্ড বেগে পানির স্রোত বয়ে যায়। কোথাও কোথাও তীব্র স্রোতে পথচারীকে ভেসে যেতে দেখা যায়। বহদ্দারহাট থেকে চান্দগাঁও হয়ে কালুরঘাট পর্যন্ত সড়কটিও পানিতে তলিয়ে যায়। সড়কে পানি দেখে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করে কিছু গাড়ি।

কিন্তু বহদ্দারহাট এলাকায় ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে পানি জমে যাওয়ায় ফ্লাইওভারের ওপর আটকা পড়ে শত শত গাড়ি। ফ্লাইওভারের এ অংশে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। এ অবস্থায় নগরীতে রিকশা ও ভ্যান হয়ে ওঠে চলাচলের প্রধান ভরসা। সুযোগ বুঝে রিকশা ও ভ্যানচালকরা আদায় করেছে গলাকাটা ভাড়া।

একটি শিপিং কোম্পানির কর্মকর্তা নুরুল আবসার জানান, আতুরার ডিপো এলাকার বাসা থেকে তিনি সকাল ৯টার দিকে বের হন। রিকশায় মুরাদপুর রেললাইনের কাছে এসে পানিতে আটকা পড়েন। হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে মূল সড়কে এসে দেখেন কোমর পানি। কোনো গাড়ি চলছে না।

এরপর কিছুক্ষণ হেঁটে, কিছুক্ষণ রিকশা বা ভ্যানে আগ্রাবাদ অফিসে পৌঁছাতে তার দুই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘নানা উদ্যোগের কথা শুনছি। এই প্রকল্প হচ্ছে, ওই প্রকল্প হবে। কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা আর নিরসন হচ্ছে না। এটা যেন হয়ে পড়েছে নিত্যসঙ্গী।

মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা অর্জুননাথ জানান, তার বাসার চারপাশে পানি থইথই করে। এ এলাকার ভবনগুলোর নিচতলায় পানি প্রবেশ করে। আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তারা জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে বন্দি। এর মধ্যে শনিবার সকাল থেকে এলাকাটি আবারও তলিয়ে যায়। বাসা-বাড়ির নিচতলা ও দোকানপাট পানিতে তলিয়ে যায়।

প্রবর্তক মোড় এলাকার কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচতলার ছাদ পর্যন্ত পানি ওঠে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের নিচতলায় হাঁটুসমান পানি ওঠে। এ সময় জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও শিশু বিভাগের রোগী ও তাদের স্বজনদের সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয়। চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হয়। নগরীতে জমে যাওয়া পানি অপসারণে মাঠে নামে সেনাবাহিনীর চারটি টিম। জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে।

৪০ জন সদস্য চার দলে ভাগ হয়ে শনিবার প্রবর্তক মোড়-কাপার্সগোলা, জিইসি-দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর ও বহদ্দারহাটে কাজ করে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, সেনা সদস্যরা জলাবদ্ধতার কারণগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি পানি দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা করেন।

টানা বর্ষণে শনিবার দুটি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আরেফিন নগর সংলগ্ন পাহাড় ধসে ঘরে আটকাপড়া শাহিনা আক্তার (৪০) ও তার মেয়ে মর্জিনা আকতারকে (১৮) আহতাবস্থায় উদ্ধার করা হয়। অপরদিকে বেলা ১১টার দিকে খুলশী থানার কুসুমবাগ পাহাড় ধসে শিশু নুসরাত শারমিনকে উদ্ধার করা হয়।
তাকে চট্টগ্রাম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয়দের সহায়তায় সেনাবাহিনীর একটি টিম এবং ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট উদ্ধার অভিযান চালায়।

সৌজন্যে: যুগান্তর