Mon. Dec 16th, 2019

নন্দিতা সিনেমা হলে জমজমাট জুয়ার আসর

ডেইলি বিডি নিউজঃ সিলেটের নন্দিতা সিনেমা হল। সিলেটের বিভিন্ন প্রান্ত হতে লোকজন এখানে আসে সিনেমা দেখার উদ্দেশ্য। কিন্তু সিনেমার আড়ালে নন্দিতা হলে এভাবেই চলছে রমরমা জুয়া বানিজ্য। জুয়ার আসর দিন থেকে শুরু হয়ে রাত অবধি চলে। কিশোর থেকে বয়স্ক মানুষের আনাগোনা এই জুয়ার আসরে। গত ৭ জুন বিকাল ৫টায় সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় প্রকাশ্যে চলছে জুয়া আসর। সিলেট নগরের তালতলা রোডে অবস্থিত নন্দিতা সিনেমা হল। ছবি দেখতে আসা লোকজন ছুটছেন টিকিট কাউন্টারের দিকে। টিকিট কাউন্টার ঘেঁষে রয়েছে একটি কক্ষ। সেখানে বেশ কিছু লোক জটলা বেঁধে আছেন। প্রবেশ করতেই দেখা গেল, একটি বোর্ড ঘিরে কক্ষের মেঝেতে চার-পাঁচজন লোক বসে আছেন। তাদের ঘিরে আছেন আরো ১৫-২০ জন লোক। সবার নজর সেই বোর্ডের দিকে। বোর্ড সাজানো হয়েছে চিংড়ি, বউ ও রুই মাছের প্রতীকী ছবি দিয়ে। চিংড়ির এবং রুই মাছের পাশে লেখা রয়েছে (ডাবল) আর বউয়ের ছবির পাশে (সিঙ্গেল) লেখা। একজন টাকা গুনছেন, বাকিরা ধারাবাহিকভাবে একটি ঘুঁটি ঘুরাচ্ছেন। কেউ রুই, কেউ চিংড়ি কেউবা আবার বউয়ের প্রতীকী ছবি বাজি ধরেছেন। ২০ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার নোট ছোড়ছেন ছবি সংবলিত ওই বোর্ডের দিকে। সে খেলায় মেতেছেন বৃদ্ধ থেকে শুরু করে তরুণ ও মধ্যবয়সীরা। তবে সেখানে রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশাচালক ও খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যা বেশ লক্ষণীয় ছিল। এক তরুণের সাথে আলাপকালে তিনি জানান, তিনি জুয়া খেলতে এখানে এসেছেন বন্ধুর সঙ্গে। তার বন্ধু নিয়মিত এই খেলা খেলেন। এর বেশি আর কিছু বলতে রাজি হননি ওই তরুণ। ডানদিকে থাকাতেই চোখ আরেক যুবকের দিকে। কথা হয় তার সঙ্গে। পেশায় অটোরিকশাচালক। তিনি বললেন জুয়া তিনি নিয়মিত খেলেন। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি এখানে আসেন। খেলার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রুই মাছের ছবি খেললে ২০ টাকায় মিলে ৪০ টাকা, এটাকে সিঙ্গেল বলে। আর চিংড়ি কিংবা রুই খেললে ২০ টাকায় মিলে ৬০ টাকা, এটাকে ডাবল বলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অটোচালক জানান, তার মতো অনেকেই প্রতিদিন এখানে খেলতে আসেন। বাজির এই খেলায় কেউ জিতেন কেউবা আবার হারেন। তিনি আরো জানান, নন্দিতা সিনেমা হল ছাড়াও নগরের কানিশাইল, বেতের বাজার, কাজির বাজার, বন্দর বাজার, কাস্টগড় এলাকায় একাধিক বোর্ড রয়েছে। সরেজমিনে সেসব এলাকা গিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। মজনু মিয়া নামক এক ব্যক্তি জানান, তিনি পেশায় পিকআপ (মিনি ট্রাক) চালক। তিনি একসময় ওই খেলা নিয়মিত খেলতেন। তার এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি এ খোলার সম্পর্কে জেনেছেন। এরপর তিনি এ খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, গত এক বছরে তিনি বাজির এ খেলায় প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা নষ্ট করেছেন। বর্তমানে নিঃস্ব হয়ে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মজনু মিয়ার মতো আরো অনেকেই প্রতিদিন এভাবে নিঃস্ব হচ্ছেন। তবু থামছে না এই জুয়া খেলার আগ্রাসন। মাঝে মধ্যে পুলিশের লোক দেখানো তৎপরতা চোখে পড়লেও তা স্থায়ী হয়নি বেশি দিন। অভিযোগ রয়েছে পুলিশ প্রশাসনের অসাধু কিছু কর্মকর্তা আর কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় নগরজুড়ে নীরবে চলছে ‘বউ নামক’ নামক এই জুয়া খেলা। একে দিগুণ টাকা লাভের লোভে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষ। সিনেমা হলের পার্শ্বের এক চায়ের দোকানি জানান, এখানে প্রতিদিন জুয়ার আসর বসে। বিকেল থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে এ আসর। বেলা যত বাড়ে লোকজনের সমাগমও তত বাড়ে। তিনি জানান, এই বোর্ডের নিয়ন্ত্রক স্থানীয় কাজিরবাজারের এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে তিনি (বোর্ড মালিক) এ খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ওই প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর নাম বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওই চায়ের দোকানদার। নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর-অপরাধ) বিভূতি ভূষণ ব্যানার্জী বলেন, জুয়াড়িদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। প্রতিদিনই নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে জুয়াড়িদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। নগরে সব ধরনের জোয়া খেলা বন্ধ করতে পুলিশ প্রশাসন জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।