Thu. Dec 12th, 2019

সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো

ডেইলি বিডি নিউজঃ প্রাচীন ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করছে পুরান ঢাকার বেশ কিছু স্থাপনা। সম্প্রতি এমন একটি ভবন ধসে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর পর নতুন করে এসব ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ভাঙ্গার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন,এই ভবনগুলো না ভেঙ্গে সংস্কার করলে মৃত্যুঝুঁকি যেমন কমে যাবে তেমনি রক্ষা পাবে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ভেঙ্গে ফেলা নয়, বরং এ স্থাপনাগুলো সংস্কার করে রক্ষার দাবি তাদের।

ঢাকাকে উত্তর কলকাতা,দিল্লী,আহমেদাবাদ কিংবা লন্ডনের মতো করে পুরাকীর্তির ঐতিহ্য বহাল রেখে সাজিয়ে তোলা যেতে পারে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা আরও দাবি করেন,এ ধরণের পদক্ষেপ নিতে পারলে ঢাকাকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের নতুন ক্ষেত্রও উন্মোচিত হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রাচীন স্থাপনাগুলো সংস্কার না করে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও রাজউক বলে অভিযোগ করছেন তারা।

২০০৯ সালে রাজউকের পক্ষ থেকে পরিচালিত জরিপে পুরান ঢাকার ৯৩টি ভবন এবং ফরাশগঞ্জ,সূত্রাপুর, শাখারিবাজার, রমনা অঞ্চলকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ওই জরিপে আরও দেখা যায়,এই এলাকাগুলোর মোট ১৩টি সড়কের স্থাপনাগুলো হেরিটেজের অন্তর্ভূক্ত ছিল। ঢাকার পাতলা খান লেন,হেমেন্দ্র দাস লেন,প্যারিদাস রোড,ফরাশগঞ্জ রোড,বি কে দাস রোড,কে বি রোড,আজিমপুর,হাজারিবাগ, ওয়ারীসহ বিভিন্ন এলাকার পুরনো স্থাপনাগুলোর কোনরকম ক্ষতিসাধন,অনুমতি ছাড়া সংস্কার বা ভেঙ্গে ফেলার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এই স্থাপনাগুলোর দেখভালের দায়িত্ব ঢাকা জেলা প্রশাসন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। এসব স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অযত্ন অবহেলা বা দেখভালের অভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনা ঘটলেই ভবনগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার কথা বলা হয়; এমন দাবি করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) জিওডেসেক কনসালট্যান্টস অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তালিকা করে পুরান ঢাকার ৫৭৩টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১৪৫টিকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব ঝুকিপূর্ণ ভবনের অনেকগুলোই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্থাপনা বা সংরক্ষিত ঐতিহ্যের তালিকায় পড়ে। যেমন হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত ফরাশগঞ্জের ‘বড়বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত ভবনটি সিটি কর্পোরেশন ও রাজউক বিপজ্জনক হিসেবে দেখিয়ে ভেঙ্গে ফেলার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু চারদিক থেকে আপত্তি উঠলে তা থেকে সরে আসে সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনা শাখা। এরকম জটিলতার মধ্যে রয়েছে আরো অনেকগুলো স্থাপনা। যেমন লক্ষী নারায়ন জিউ মন্দির, বনগ্রাম রোডের ব্রিটিশ কালেক্টরেট ভবন, সূত্রাপুরের ফায়ার সার্ভিস ভবন, পাটুয়াটুলি রোডের ২৭ নাম্বার হোল্ডিং(জেলা প্রশাসনের ৮ নম্বর হেরিটেজ)।

ঢাকার নগর সংস্কৃতির ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছে নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন ‘আরবান স্টাডি গ্রুপ’। ২০১২ সালের সংগঠনটির করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ২০১৬ সালে ১৬০০ স্থাপনার তালিকা করে। কিন্তু আদালতকে উপেক্ষা করে রাজউক শুধু ৭৫টি গুরুত্বপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ করলে আবারো রিট করা হয়। এর পর পুনরায় এ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। নতুন তালিকায় ২২০০ স্থাপনা স্থান পায়। এখন পর্যন্ত সেটিই চূড়ান্ত বলে দাবি করছে আরবান স্টাডি গ্রুপ।

নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্যমতে, পুরনো ঢাকাকে নতুন ঢাকার মতো করে ধরে নিয়ে পরিকল্পনা করা যাবে না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এরকম করলে আবাসনের চাহিদা মেটানো যাবে কিন্তু এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বা প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যকে ধ্বংস করা হবে। পুরনো ঢাকাকে ঘিরে এমন পরিকল্পনাই নেয়া উচিৎ যাতে করে পুরনো ঢাকার স্থাপনার ঐতিহ্য অটুট থাকে।

হেরিটেজ স্থাপনা কিভাবে ভাঙ্গার তালিকায় আসে এমন প্রশ্ন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ঢাকা রিজিওনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাখি রায়কে করা হয়। এ ব্যাপারে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন এরকম হেরিটেজ কি আছে ভাঙ্গার তালিকায়? ফরাশগঞ্জের বড় বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনার কথা জানানো হলে তিনি এ ব্যপারে কোনো মন্তব্য করেননি।

স্থাপনা সংরক্ষণে তাদের ভূমিকার বিষয়ে জানতে চাইলে রাখি রায় বলেন,তালিকা ধরে ধরে তারা পর্যায়ক্রমে কাজ করছেন । পুরান ঢাকার হেরিটেজ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত এলাকা এবং স্থাপনাগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,পুরনো হলেই কোন স্থাপনা সংরক্ষিত হতে পারে না। সংরক্ষণ করতে হলে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকতে হবে।

ঢাকার স্থাপনাগুলোর ঝুঁকি নিয়ে আরবান স্টাডি গ্রুপের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ তাইমুর রহমান বলেন, প্রকৃতপক্ষে দেখা গেছে যেসব ভবন ধসে পড়েছে সেসব ভবনের পাশের নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্ট নির্মাণ করতে গিয়ে পুরনো ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিলো,সময়মতো সংস্কার করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ যদি ভবনগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করে সময় মতো সংস্কার করতো তাহলে এসব দুর্ঘটনা ঘটতোই না।

তাইমুর রহমান ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেন। তিনি বলেন,একটি ভবনের ‘সয়েল টেস্ট’ করতেই বেশ কিছুদিন লেগে যাবার কথা। সুতরাং এক মাসের মধ্যে ৭০০-৮০০ ভবনের তালিকার যথার্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

পুরান ঢাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সুকলাল দাস লেন, প্যারিদাস রোড, রূপচান লেনের কয়েকটি বাড়ি ভাঙ্গার কাজ চলছে। এছাড়াও সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, আজিমপুর, চকবাজারে পুরানা ভবনের আধিক্য কমে আসছে। যেসব পুরানা ভবন ব্যক্তিগত দখলে আছে সেসবের নকশা নষ্ট হচ্ছে। সেগুলো সংস্কার করা হচ্ছে না। কিন্তু মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন অনেকেই।

সিটি কর্পোরেশন যদি সংস্কার করে ভবনের নকশাকে অক্ষুণ্ণ রেখে তাদের বসবাসের নিশ্চয়তা দিতে পারতো তাহলে ঝুঁকি কমে যেতো বলে মনে করেন ওই সব ভবনের বাসিন্দারা। সুকলাল দাস লেনের ‘ঝুকিপূর্ণ’ ঘোষিত একটি বাড়িতে বাস করছেন আজমল হোসেন। তিনি বলেন, এই ভবনটি ভাঙ্গা হবে কিনা, নাকি এটি সংরক্ষণ করা হবে সে বিষয়ে তাদের পরিষ্কার ধারণা নেই। এই ভবনের অন্যান্য বাসিন্দাদের মতো আজমল হোসেনও এই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি চান।

তবে নগরবিদরা বলছেন,এসব করার জন্য সদিচ্ছা বা সঠিক পরিকল্পনা দরকার। ভবনগুলো কীভাবে সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় তার খুব সহজ কতগুলো পথও তারা দেখিয়েছেন। যেসব ভবনের ছাঁদ ঝুঁকিতে আছে সেখানে ভবনের বাহ্যিক কাঠামো ঠিক রেখে ছাদ মেরামত করলেই ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যায়। কারণ এসব ভবনের দেয়াল খুব পুরু থাকে, তাই দেয়াল ধসের সম্ভাবনা নেই। আবার যদি তার কার্নিশের কাঠ বা বিম ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলেও সেটা সংস্কারযোগ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বেজমেন্টকে আদ্রতামুক্ত রাখতে পারলে ভবনের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়।

সূত্র ঃ ইন্ডিপেন্ডেন্ট