|
এই সংবাদটি পড়েছেন 28 জন

হাওর রক্ষায় নতুন প্রযুক্তি : একশ’ বছরেও ফসল হারাবেনা হাওরাঞ্চল

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : দুই বছর পূর্বে আগাম বন্যায় হবিগঞ্জ তথা হাওর এলাকার কৃষকের চোখের সামনে তলিয়ে যায় পাকার অপেক্ষায় থাকা মাঠ ভর্তি ধান। প্রতিবছরই পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার চোখরাঙানী মোকাবেলা করতে হয় কৃষকদের। শুধু বিনিদ্র রজনী কৃষকদেরই কাটে না। হবিগঞ্জ শহরবাসীও খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে না ঘুমিয়ে রাত কাটান। তবে এই সমস্যার সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহীদুল ইসলামের একটি উদ্ভাবন এই সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। তার এই উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল রক্ষা ও নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করলে ব্যয় হবে কম। বাঁধ হবে টেকসই এবং ১শ বছরেও কিছুই হবে না।

আজ বুধবার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিকেজিসি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে জেলা পর্যায়ে ইনোভেশন শোকেসিং এর একটি স্টলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্ভাবনটি প্রদর্শন করা হয় এবং সকলের দৃষ্টি কারে।

স্টলে থাকা এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহীদুল ইসলাম জানান, তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তিটি হলো যখন ফসল রক্ষা বাঁধ বা নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হবে তখন প্রথমেই জিও টেক্সটাইল ব্যবহার করে একটি টিউব তৈরি করতে হবে। ওই টিউব এর ভিতরে থাকবে বালি। টিউবটি স্থাপন করার পর এর উপর মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি করতে হবে। এভাবে বাঁধ তৈরি করলে বন্যা বা বৃষ্টির সময় বাঁধ তেমন একটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। শুধুমাত্র উপরের মাটি হালকা সরে যেতে পারে। সামান্য মেরামতেই বাঁধ সুরক্ষিত থাকবে। জিও টেক্সটাইল সূর্যের আলো লাগলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেহেতু টিউবটি মাটির নিচে থাকবে সেহেতু সেটি সূর্যের আলোর নাগাল পাবে না। এতে করে সেটি ১শ বছরেও কিছু হবে না।

তিনি আরো জানান, শুধু মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি করে তা সুরক্ষিত রাখা যায় না। তাই এই প্রযুক্তির আবিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান প্রযুক্তিতে একটি টেকসই বাঁধ নির্মাণে প্রতি মিটারে খরচ পড়ে ৫০ হাজার টাকা। নতুন এই প্রযুক্তিতে খরচ পড়বে প্রতি মিটারে মাত্র ৮ হাজার টাকা। বর্তমান প্রযুক্তির চেয়ে নতুন প্রযুক্তির স্থায়িত্বও হবে বেশী। এমনিতে প্রতি বছরই বাঁধ মেরামত করতে গিয়ে প্রতি বছর সরকারের হাজার হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু প্রায় সময়ই শেষ রক্ষা হয় না। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সামান্য অর্থে নিয়মিত মেরামত কাজ করলেই চলবে। এই প্রযুক্তি হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জসহ হাওর এলাকার এক কোটি জনগণকে সুরক্ষিত রাখবে বলে আশাবাদী তিনি।

কিভাবে এই উদ্ভাবন এর আগ্রহ পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বছর দেড়েক পূর্বে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত সোনাই নদীর বাঁধ বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হয়। কিন্তু ২ মাস পর যখন আবার পানি আসে তখন বাঁধ আবারও ভেঙে যায়। তখন আমি চিন্তা করি কিভাবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায়। তখন আমি পরীক্ষামূলকভাবে আমার উদ্ভাবিত পদ্ধতি প্রয়োগ করে জিও টেক্সটাইল দিয়ে টিউব তৈরি করে বাঁধ নির্মাণ করি। এতে হাতে নাতে ফল পাওয়া যায়। এখন পর্যন্ত ওই বাধের সামান্য ক্ষতি হয়নি। পরবর্তিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এই প্রকল্পটিকে আমার উদ্ভাবন হিসেবে দাখিল করি। গত ২৯ জুলাই আমাকে পত্র দিয়ে জানানো হয়েছে আমার উদ্ভাবনটি সারা দেশের মাঝে সেরা হয়েছে। এখন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের সকল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে মন্ত্রণালয়।

তিনি বলেন, আমার এই সফলতার পেছনে আমার সহকর্মীদেরও অবদান আছে। সকলে মিলেই আমরা এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছি। এই উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশ উপকৃত হলে আমি ধন্য হব।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই উদ্ভাবনে উল্লসিত হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদ। তিনি বলেন, আমরা এমন উদ্ভাবন করব যাতে তা দেশের কাজে লাগে এবং অবশ্যই সেই উদ্ভাবন দেশের সেরা হয়। হবিগঞ্জের উদ্ভাবন দেশের সেরা হওয়ায় অন্যান্য বিভাগও ভালো কাজ করতে আগ্রহী হবে। এই উদ্ভাবনের বাহিরেও হবিগঞ্জে আরো বেশ কয়েকটি উদ্ভাবন প্রশংসিত হয়েছিল। এর মাঝে রয়েছে অনলাইনে ভূমি কর নির্ধারণ।

বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী ও গবেষক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল বলেন, আমাদের হাওর অঞ্চলের উজানে ভারতের আসাম, মেঘালও ও ত্রিপুরার পাহাড়ী অঞ্চল। সেখান থেকেই বিভিন্ন নদী আমাদের এলাকায় প্রবেশ করেছে। ফলে ভারতেও ওই সকল এলাকায় অধিক বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে আমাদের হাওর এলাকাকে প্রায়ই আকস্মিক বন্যার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু এই সমস্যা মোকাবেলায় তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। দেরিতে হলেও হবিগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাওর রক্ষায় যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তা প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে সরকারের ব্যয় সাশ্রয় হবে বলা হয়েছে। এই প্রযুক্তি অবশ্যই কাজে লাগানো উচিত।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে একটি গোষ্ঠী চায় না কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হউক। বার বার কাজ করলে তাদের কমিশন পাওয়া বা ব্যবসা করার সুবিধা হয়। এই প্রযুক্তি নিয়ে যাতে এ ধরনের না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন