|
এই সংবাদটি পড়েছেন 35 জন

সিলেটে গ্রেনেড হামলার ১৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ

ডেইলি বিডি নিউজঃ গুলশান সেন্টারে হামলার টার্গেট ছিল নেতাকর্মীদের হত্যা করা। কাশ্মীরি জঙ্গী সংগঠন ‘হিজবুল মুজাহিদীন’র দুর্ধর্ষ জঙ্গী আব্দুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট পাকিস্তান থেকে গোলাবারুদ ও গ্রেনেড বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। হরকাতুল জিহাদ হুজি’র নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন ও মুফতি আব্দুল হান্নানের সহায়তায় এগুলো নিয়ে আসা হয়। সিলেট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শরীফ শাহেদুল আলম বিপুলের নিকট দেয়া হয় ৪টি গ্রেনেড। গুলশান সেন্টারে পাকিস্তান থেকে আনা গ্রেনেড দিয়েই হামলা করে জঙ্গীরা। জঙ্গী হুমায়ুন কবির হিমু ও ফখরুল ইসলাম ফাহিম পরিকল্পনা অনুযায়ী মিশন ‘সাকসেস’ করে। আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজসহ দলের নেতাকর্মীদের হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়। নগরীর তালতলার গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলা মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে এ সকল তথ্য পাওয়া গেছে। আগামীকাল বুধবার নৃশংস এই গ্রেনেড হামলার ১৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট সন্ধ্যায় হামলাটি চালানো হয়। হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম বর্তমানে চলছে।
বিস্ফোরক মামলার সাক্ষ্য চলছে
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। সিলেটের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ বেগম মমিনুন নেসা খানমের আদালতে মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। মামলার ৬৪ সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ২৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ১৫ জুন এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ৭ মে ৮ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ৮ আসামীর মধ্যে মুফতি আব্দুল হান্নান, শরীফ সাহেদুল আলম বিপুল ও দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর হয় ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল। ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা মামলায় এই ৩ জঙ্গীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। অপর ২ আসামী মাওলানা তাজ উদ্দিন ও হুমায়ুন কবির হিমু পলাতক রয়েছে। বর্তমানে মামলার অপর ৩ আসামী মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ওরফে খাজা, মোঃ মফিজুল ইসলাম ওরফে মফিজ ওরফে অভি ওরফে মহিব উল্ল্যাহ ও আব্দুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট কারাগারে আটক রয়েছে।
হত্যা মামলার তেমন অগ্রগতি নেই।
একই ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলাটি সিলেটের জননিরাপত্তা বিঘœকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালের বিচারক দিলীপ কুমার ভৌমিক ৫ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। চলতি বছরের ১২ মে ট্রাইব্যুনালের বিচারক অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যাওয়ায় আলোচিত এই মামলার বিচার কার্যক্রম থেমে যায়। এরপর মামলার আর কোনো কার্যক্রম হয়নি বলে আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিস্ফোরক মামলায় কারাগারে আটক ৩ আসামী ও পলাতক ২ আসামীসহ এই ৫ আসামী হত্যা মামলারও আসামী। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিচারক পদায়নের পর মামলার কার্যক্রমে গতি আসবে।
টার্গেট ছিল নেতাকর্মীদের হত্যা করা
গুলশান সেন্টারে হামলার ব্যাপারে জঙ্গী বিপুল আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। ২০০৬ সালের ৬ অক্টোবর সিলেটের প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট নুরে আলম সিদ্দিকী এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে বিপুল বলেছে, ঘটনার দিন হামলার পুরো পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন সম্পর্কে মুফতি হান্নানকে অবগত করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হিমুর কাছে থাকা দুটি গ্রেনেডের একটি আনা হয় গুলশান সেন্টারের জন্যে। হিমু ও ফাহিম গ্রেনেডসহ সেখানে যায়। গুলশান সেন্টারের উল্টোদিকের মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করে তারা। মাগরিবের নামাজের পর গুলশানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় বিপুল। জঙ্গী বিপুল নির্দেশ দেয় সুযোগ পাওয়া মাত্রই হামলা করবে। কিন্তু সামান্য পরই হিমু জানায়, মেয়র কামরান তো চলে গেছেন। আমি তার কাছে দাঁড়ানো থাকায় হামলা করা সম্ভব হয়নি। বিপুল জানতে চায় আর কোন কোন নেতা আছে জানাও। হিমু বলে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজসহ অন্য নেতারা আছে। একথা শোনার পর পরই বিপুল নির্দেশ দিয়ে হিমুকে বলে ‘থ্র’। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই গ্রেনেড হামলা করে জঙ্গীরা। মুহূর্তে রক্তে লাল হয়ে যায় গুলশান সেন্টারের সম্মুখস্থল। হামলায় মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ইবরাহিম আলী নিহত হন। তৎকালীন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজসহ ২১ নেতাকর্মী আহত হন। আহতদের শরীরে এখনো গ্রেনেডের স্পিøন্টার রয়েছে সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা এই গ্রেনেডকে আর্জেস হ্যান্ড গ্রেনেড বলে মতামত দেন বলে মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

আলোচনায় আলী এন্টারপ্রাইজ
এ ঘটনার পরদিন কোতোয়ালী থানায় এসআই এনামুল হক বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-৩৬। এস আই ফজলুল আলম ও সিআইডির এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান মামলার তদন্ত করেন। ২০০৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সিআইডির পরিদর্শক জুবের আহমদ আদালতে অভিযোগপত্র দেন। কোতোয়ালী থানার অভিযোগপত্র নং ৭২০। এতে মুফতি হান্নান, বিপুল, মুফতি মঈনুদ্দিন, মহিবুল্লাহ, রিপন ও পলাতক হিমুকে আসামী করা হয়। ২০১১ সালের ২ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের বিচারক মঞ্জুরুল হক খান গ্রেনেড হামলার প্রকৃত নির্দেশ দাতা, প্ররোচণা দানকারী, গ্রেনেড সরবরাহকারী এবং আলী এন্টারপ্রাইজের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্যে সিআইডির এএসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা দ্বারা তদন্তের আদেশ দেন। মামলাটি পুনঃতদন্তের আদশের পরই আলী এন্টারপ্রাইজ নিয়ে নানান আলোচনা শুরু হয়।
সিআইডির মুখোমুখি ইলিয়াস আলী
মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রওনকুল হক চৌধুরী মামলার পুনঃতদন্ত করেন। তদন্তে জানা যায়, আলী এন্টারপ্রাইজের মালিক সিলেট জেলার বিশ্বনাথের সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী। সিআইডি এ বিষয়ে ইলিয়াস আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে ইলিয়াস আলী জানান, ঢাকার শ্যামলী ২/৩ গোল্ডেন স্ট্রিট, রিং রোড বাসায় বসবাসকালীন সময়ে উক্ত ঠিকানা ব্যবহার করে ১৯৯৪ সালে একটি ঠিকাদারী লাইসেন্স গ্রহণ করেন। লাইসেন্সটি সরকারের ফ্যাসিলিটিজ শিক্ষা ভবন, ঢাকা থেকে ইস্যু করা হয়। উক্ত লাইসেন্স দ্বারা তিনি নিজে কোনো ঠিকাদারী কাজ করেননি। তার পরিচিত রফিক হেলালী লাইসেন্সটি ব্যবহার করে ঠিকাদারী ব্যবসা পরিচালনা করেন। নিজের লাইসেন্সের অভিজ্ঞতা না থাকায় ইলিয়াস আলীর লাইসেন্স ব্যবহার করে সিলেট এমসি কলেজের একাডেমিক ভবনের নির্মাণ কাজ পান। রংপুরের সিরাজ নামের সাব-কন্ট্রাক্টর দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করা হয়। জনৈক আবুল মিস্ত্রির মাধ্যমে সাব-কন্ট্রাক্টর সিরাজের সাথে পরিচিত হয়ে ইট-বালু সাপ্লাই দেয় বিপুল। আলী এন্টারপ্রাইজের সাথে বিপুলের কোনো সম্পর্ক নেই বলে উল্লেখ করা হয়।
পুনঃতদন্ত শেষে আদালতে দেয়া অভিযোগপত্রে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়। ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আগের অভিযোগপত্রের ৬ আসামীসহ মাওলানা তাজউদ্দিন ও মাজেদ ভাটকে আসামী করে ৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়া হয়। সম্পূরক অভিযোগপত্র নং ১৭৮।
দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি চান তারা
গুলশান গ্রেনেড হামলা মামলা দুটির দ্রুত নিষ্পত্তি চান গ্রেনেড হামলায় আহতরা। গুরুতর আহত মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এডভোকেট রাজউদ্দিন বলেন, পা থেকে কোমর পর্যন্ত আহত হই। এখনো পা পুরোপুরি ঠিক হয়নি। কিন্তু মামলার কার্যক্রম ধীরগতিতে চলায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। গুরুতর আহত মহানগর আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তপন মিত্র বলেন, আমাদের নেতা মিসবাহ উদ্দিন সিরাজসহ আমাদেরকে হত্যার উদ্দেশ্যেই হামলা করেছিল। সৃষ্টিকর্তার দয়ায় প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু হারিয়েছি আমাদের ইব্রাহিম ভাইকে। তিনি মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যে সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানান।
পিপির বক্তব্য
গ্রেনেড হামলায় আহতদের অন্যতম ও সিলেটের পিপি এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, মূলত আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতেই গ্রেনেড হামলা করা হয়। জঙ্গী বিপুলের জবানবন্দিতেও বিষয়টি পরিষ্কার উঠে এসেছে। গুলশান সেন্টারে হামলায় আহতদের দেখতে জননেত্রী শেখ হাসিনা সিলেটে এসে ঢাকায় কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। জঙ্গীরা পরে নেত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২১ আগস্ট ঢাকায়ও হামলা করে। জঙ্গীরা সংঘবদ্ধভাবে একের পর এক হামলা করে। তদন্তে এর পেছনে মদদদাতাদেরও পরিচয় বেরিয়ে এসেছে। গুলশান সেন্টারে হামলা মামলার মধ্যে একটির সাক্ষ্য চলছে। আরেকটি বিচারক না থাকায় ধীরগতি চলছে। বিচারক আসার পর এ মামলাও দ্রুততার সাথে অগ্রসর হবে। তিনি বলেন, এ মামলার প্রধান ৩ আসামীর ইতোমধ্যে অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বাকি জঙ্গীদেরকেও শাস্তি ভোগ করতে হবে। মামলা দুটি কম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা রয়েছে।