Mon. Dec 16th, 2019

সিটি কর্পোরেশনের মরদেহের নিরাপত্তায় উদ্যোগ নেই মরে গেলেই দায়িত্ব শেষ

ডেইলি বিডি নিউজঃ সিলেট নগরের নাগরিকই শুধু নয়; শহরতলিসহ পুরো মহানগর, আশেপাশের উপজেলাগুলোর অগণিত মানুষের শেষ ঠিকানা হযরত মানিক পীর (রাহ.) টিলা। নগরীর নয়াসড়ক থেকে কুমারপাড়া এলাকার মধ্যবর্তিস্থানে বিশাল এলাকা নিয়ে বিদ্যমান টিলার একেবারে উপরে হযরত মানিক পীর (রাহ.) মাজারের অবস্থান। মাজার ঘিরে আশেপাশের জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠেছে কবরস্থান। এটিই নগরীর প্রধান নাগরিক কবরস্থান। স্থানীয়দের কাছে ‘মানিক পীর টিলা’ নামেই পরিচিত। এখানে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন অগণিত মানুষ।

সাধারণ-অসাধারণ, জ্ঞানী-গুণী অনেকেরই শেষ ঠিকানা এটি। কতোজন যে এখানে সমাহিত, সঠিক কোন হিসেব কারোর কাছেই নেই। হযরত শাহজালাল (রাহ.) দরগাহ গোরস্থানের চেয়েও মানিক পীর টিলায় বেশি মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে। যা স্বাভাবিকভাবে চোখ ফেললে অনুধাবন করা যায়। আর এসব কারণে এ গোরস্থানে মানুষের আনাগোনা প্রতিনিয়তই, কি দিন- কি রাত। কেউ আসেন স্বজনদের কবর জিয়ারতে; কেউ আসেন নতুন মরদেহের দাফনে। প্রতিদিনই এখানে কেউ না কেউ সমাহিত হচ্ছেন। এমন দিন খুবই বিরল- এখানে নতুন কোন কবর হয়নি। আর এসব কারণে সিটি কর্পোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত এই নাগরিক গোরস্থানটির গুরুত্ব অসামান্য।

নগরীর এমন কোন ঘর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে মানিক পীর (রাহ.) টিলাতে তাদের কোন আত্মীয়-স্বজনের কবর নেই। কিন্তু নগরের বাসিন্দাদের ‘সর্বোচ্চ আবেগের’ এই স্থানের রক্ষণাবেক্ষণে সিটি কর্পোরেশনের উদাসীনতা- নগরবাসীকে আহত করছে। নতুন করে মানিক পীর কবরস্থানে উন্নয়ন কাজ চলমান থাকলেও নগরবাসী যে কারণে ‘চরমভাবে মর্মাহত’ সেদিকে কোন খেয়াল নেই তাদের। অথচ মানিক পীর টিলার রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন সকাল বেলা সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নগরভবনে যান; সারাদিনের কাজ শেষে রাতের বেলা এ পথ ধরেই তিনি ঘরে ফেরেন। টিলা থেকে পায়ে হাটা দুরত্বে কুমারপাড়াতেই ‘মেয়র হাউজ’।

অন্যতম এই নাগরিক গোরস্থানে সম্প্রতি উন্নয়ন কাজের নামে তুলে নেওয়া হয়েছে কবরস্থানের সকল বেড়া। কবরস্থানে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। ‘বেড়া তুলে নেয়া ও মাটিভরাটের কাজ’কে নগরবাসী স্বাগত জানিয়েছেন। নতুন এই উদ্যোগের কারণে কবরের পরিবেশ সুন্দর হয়েছে বলেও স্বীকার করছেন তারা। কিন্তু এরই সাথে তারা মারাত্মকভাবে ব্যথিত হয়েছেন নতুন কবরগুলোর ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায়। যুগ যুগ ধরে মানিক পীর টিলার মতো বিশাল কবরস্থানে মৃতদেহের নিরাপত্তার জন্য রয়েছে মাত্র ৯টি লোহার খাঁচা। আর শিশুদের কবরের জন্য এ সংখ্যা ৫টি। বাস্তব বিবেচনায় অন্যতম এই গোরস্থানে প্রয়োজন অন্তত অর্ধশত লোহার খাঁচা। সম্প্রতি বেড়া তুলে নেওয়ার কারণে লোহার খাঁচার প্রয়োজনীয়তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ১০০টিতে। এমনটিই বলছেন কবরে জিয়ারত করতে আসা বিভিন্ন এলাকার লোকজন।

তারা বলছেন, যেকোন নতুন কবরের মৃতদেহের নিরাপত্তার জন্য কমপক্ষে চল্লিশ দিন থেকে তিনমাস পর্যন্ত লোহার খাঁচা রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু দেখা যায় কবরে মৃতদেহ রেখে আসার ২/৩দিনের মাথায়ই লোহার খাঁচা সরিয়ে নেয়া হয় নতুন কবরের জন্য। আর এতে আগের কবরটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়ে। বিশাল এই টিলায় রয়েছে শিয়াল-কুকুরের অবাধ বিচরণ। এছাড়া আরোও অনেক রকম প্রাণীর উৎপাতও রয়েছে।

জানা গেছে, বছর দু’য়েক আগে এই টিলাতে সমাহিত করা একটি শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে পাশ্ববর্তি একটি বাসার বারান্দায়। মরদেহটির মাথার পিছনের অংশের কোন অস্তিত্বই ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে এটি কবর থেকে কোন প্রাণী টেনে-হিচড়ে নিয়ে ওই বাসার বারান্দায় নিয়ে ফেলেছে। পরদিন ভোরবেলা ওই বাসার বাসিন্দারা মরদেহটি পেয়ে কবরস্থানের দায়িত্বশীলদের অবগত করেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল তখন। শিশুটির কবর থেকে লোহার খাঁচা সরিয়ে নিয়ে নতুন আরেকটি শিশুর কবরে দেয়া হয়েছিল। আর এ কারণে কবরটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। বেদনাবিধুর এমন ঘটনাতেও টনক নড়েনি সিটি কর্পোরেশনের, হযরত মানিকপীর (রাহ.) মাজার কর্তৃপক্ষের। বছরে বছরে দেয়ালে রঙ মাখিয়েই তারা ‘উন্নয়নের’ দায় সেরেছেন। কিন্তু নগরবাসীর আত্মীয়-স্বজনদের মরদেহের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাদের কোন কর্মতৎপরতাই চোখে পড়েনি।

গত এপ্রিল মাসে হঠাৎ করেই নগরভবন কর্তৃপক্ষ আকস্মিক নাগরিক কবরস্থানের সকল বেড়া তুলে নেন। তখন সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ বিভাগ থেকে প্রেরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কবরস্থানে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংস্কারের আওতায় কবরস্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, হেলে পড়া গাছ কর্তন ও ছাটাই, রঙ করে সৌন্দর্যবর্ধন প্রভৃতি কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া কবরস্থানে মাটিভরাট, মরদেহ গোসলখানা সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।

সিটি কর্পোরেশনসূত্র জানায়, ইতোমধ্যে মানিক পীর কবরস্থানের চারপাশের দেয়ালে রঙ করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের বাণীও লিখা হয়েছে দেয়ালে। টিলার উপরস্থ মানিক পীর (রাহ.) এর মাজারে ওঠার সিঁড়িগুলোও রঙ করা হয়েছে।

ওই উন্নয়নকাজের বিষয়ে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বক্তব্য ছিল, ‘মানিক পীর কবরস্থানের পেছনের কিছু অংশ অনেকেই অবৈধভাবে দখলে নিয়েছিল, সেগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে। অবৈধভাবে কেউ যাতে কবরস্থানের জায়গা দখল করতে না পারেন সে ব্যবস্থা করা হবে। কবরস্থানে জায়গা সম্প্রসারিত করা হবে যাতে করে মৃতদেহ কবর দেওয়ার সময় কোন বেগ পোহাতে না হয়। মৃতদেহ গোসলের জন্য মহিলাদের গোসলখানা ও পুরুষদের গোসলখানা আলাদাভাবে তৈরি করা হবে। আগামীতে মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য অত্যাধুনিক মরচুয়ারিও (হিমাগার) স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে নগরভবন কর্তৃপক্ষের।’

কবরস্থানে লোহার খাঁচার সংকটের বিষয়টি এক সপ্তাহ আগে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে জানানো হয়। তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙিতেই শুনিয়েছেন আশার বাণী ‘হবে’। খুব শিগগিরই এখানে ১০/১২টি লোহার খাঁচা দেয়া হবে। কিন্তু বিশাল গোরস্থানে ১০/১২টি লোহার খাঁচা পর্যাপ্ত কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে মেয়র আরিফ বলেন, ‘এখানে উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। পর্যাপ্ত বাতির ব্যবস্থা করা হবে। আগামীতে কোন লোহার খাঁচা বা পিঞ্জিরার প্রয়োজন পড়বে না। যদি প্রয়োজন হয়, তখন খাঁচা আরোও বাড়ানো হবে।’ আলাপকালে মেয়র খাঁচার বিষয়ে বলেন, ‘বিগতদিনে বেশ কয়েকটি খাঁচা চুরি হয়েছে। এজন্য নতুন করে বেশি খাঁচা দেয়া হয়নি। বিকল্প কোন ব্যবস্থা করা যায় কি না সেটিও আলোচনা করা হবে।’সুত্র-একাত্তরের কথা