Fri. Dec 13th, 2019

একের পর এক সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক, কারণ-নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি

এম,এ,রউফঃ সাংবাদিকরা আজ নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে আছেন। এই ঝুঁকি ক্রমশই বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এসেছে নানা পরিবর্তন, সেই সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি নানা মাত্রা পেয়েছে। গণমাধ্যম নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

সাংবাদিককে বলা হয় জাতির বিবেক। কি ভোর, কি মধ্যরাত? সময়-অসময় গণমাধ্যমকর্মীরা জনসাধারণের সংবাদ জানার আগ্রহ মেটানোর তাগিদে ছুটে চলেন। নাওয়া-খাওয়া ভুলেই মানুষকে ঘটনাপ্রবাহ জানানোতে তাদের স্বার্থকতা। যুগে যুগে সাংবাদিকরা শিকার হয়েছেন হামলা-নির্যাতনের। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো সিলেটেও সাংবাদিকদের কর্মজীবন নিরাপদ নয়; স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। পদে পদে গণমাধ্যমকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

সম্প্রতি সিলেটে,সাংবাদিক মইনুল হক বুলবুলকে গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন (ইমজা), সিলেট। ইমজা নেতৃবৃন্দ বলেন, এভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক ও আইনজীবীকে তুলে নেওয়া কেবল আইনের অপপ্রয়োগই নয়, একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার বলেও আমরা মনে করি।
বুলবুকে আটকের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি দাবি করে তাদের আন্দোলন এখনও চলছে।

তারা বলেন, বুলবলকে আটকের পর এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনের লুকোচুরিও আমাদের বিস্মিত করেছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও মইনুল হক বুলবুলের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি।

সিলেটে মেয়র আরিফের রোষানলে সাংবাদিক পাবেল উচ্ছেদ অভিযানের ছবি ধারণ করতে গিয়ে মেয়রের রোষানলে সাংবাদিক নাজমুল কবির পাবেল। নগরীর বন্দরবাজার এলাকার হাসান মার্কেটের সামনে এমন ঘটনা ঘটে। মেয়রের সাথে থাকা সিসিকের গণসংযোগ কর্মকর্তা এ সময় পাবেলকে অশ্লীল বাক্য দিয়ে গেট আউট বলে সিকিউরিটি দিয়ে পাবেলকে তাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

এদিকে, আদালতপাড়ার মতো স্পর্শকাতর স্থানে ঘটছে,সাংবাদিক নির্ষাতন সাংবাদিক পেটানোর ঘটনা। পুলিশ ফাঁড়ির সামনে পুলিশের হাতেই পেটানো হচ্ছে সাংবাদিককে। ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে আলোকচিত্রীর ক্যামেরা। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতারা ডেকে নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে মারধোর করছেন সাংবাদিকদের।

এসবেই শেষ নয়। সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের ঘর-বাড়িতে গিয়েও হামলা করছে। এসব ঘটনার বিপরীতে জেলা প্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা এবং রাজনীতিবিদদের ভূমিকা কোন কাজে আসছে না। তারা দায়সারা গোছের দায়িত্ব নিয়েই নিরাপদে থাকছেন। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে সাংবাদিকদের উপর হামলাকারীরা। আর এসব কারণে সাংবাদিকতা ক্রমশ হারাচ্ছে স্বাধীনতা।

সম্প্রতি সিলেটে আদালতপাড়ায় দুই আলোকচিত্রী সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে যখন সিলেটের সর্বস্তরের সাংবাদিকরা আন্দোলন-সংগ্রামের ব্যস্ত ঠিক এমন মুহুর্তে ঘটলো ট্রাফিক পুলিশের হাতে আরোও দুই সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা। এটির সমাধান তাৎক্ষণিক হয়ে গেলেও প্রকাশ্যে আরো দুই সাংবাদিককে হতে হলো নির্যাতনের শিকার। ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের হাতে মির্জাজাঙ্গাল নিম্বার্ক আশ্রমের ফটকে এ হামলা করা হয়। আহতরা হলেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সিলেট ব্যুরোর স্টাফ করেসপনডেন্ট মাধব কর্মকার ও ভিডিওগ্রাফার গোপাল বর্ধন।

মাধব ও গোপাল জানান, দুপুরে সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ার পথে হামলা করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা। তারা জানান, হামলাকারীরা মাধবকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। এ সময় তারা ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। গোপাল বর্ধনের মোবাইল ফোন সেট ছিনিয়ে নিয়ে যায়। মাধব কর্মকার বলেন, মদনমোহন কলেজ ছাত্রলীগ ক্যাডার রাজেশ সরকার ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক মোসাদ্দেক হোসেনের নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি দল অতর্কিত হামলা চালায়।

হামলার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। কামরান এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, হামলার সাথে জড়িততদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এখনো কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি জৈন্তাপুরে পাথর কোয়ারিতে জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষের মামলার আসামি জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলীর অনুসারীরা আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরা ভাংচুর করে। ওইদিন দুপুরে সিলেট জেলা দায়রা জজ আদালত চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় আহত দুই সাংবাদিক দৈনিক শুভ প্রতিদিন ও যুগান্তরের আলোকচিত্রী মামুন হাসান ও যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরাপার্সন নিরানন্দ পালক

নিরানন্দ পাল বলেন, এ সময় ভিডিও ধারণ করতে গেলে আদালতের বারান্দায় লিয়াকত আলীর অনুসারীরা তাদের উপর হামলা চালায় ও ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ভাংচুর করে। ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির অস্থায়ী কার্যালয়ে সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘দেশে সাংবাদিককে লাঞ্চিত করা, মারধর করা পেশাগত কাজে বাধা দেয়া নতুন নয়। এরূপ কর্মকান্ড সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন আঘাত। সাংবাদিক নির্যাতনকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই তারা আরো উৎসাহী হচ্ছে। সাংবাদিকতার মতো স্বাধীন ও মুক্ত পেশা হুমকির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিলেট সফরকে কেন্দ্র করে সংবাদ তৈরি করতে গিয়ে নগরীর সোবহানীঘাটে ট্রাফিক পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হন চ্যানেল এসের দুই সাংবাদিক। চ্যানেল এসের প্রতিবেদক মোয়াজ্জেম সাজু ও ক্যামেরাপার্সন মো. রুহিনকে সোবহানীঘাট ট্রাফিক পয়েন্টে মারধোর করে ক্যামেরা ছিনিয়ে নেন দুই ট্রাফিক পুলিশ। পরে বিষয়টি সেদিন রাতেই সমাধান করা হয়।

আদালত পাড়ায় সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে ৬ দিনব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেছে সিলেটের পাঁচ সাংবাদিক সংগঠন। এতে সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরাসহ সমাজের সুধীজনরাও অংশ নেন। ৩ ফেব্রুয়ারি বেলা সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন, ৪ ফেব্রুয়ারি জেলা পরিষদের সামনে কালো ব্যাজ ধারণপূর্বক অবস্থান কর্মসূচী, ৫ ফেব্রুয়ারি হামলাকারীদের আইন মোতাবেক শাস্তির দাবিতে পুলিশ কমিশনার বরাবরে স্মারকলিপি এবং ৬ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি, ৭ ফেব্রুয়ারি ঘন্টাব্যাপী কর্মবিরতি এবং ৮ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালন করেছেন সিলেটের সর্বস্তরের সাংবাদিকরা। এই কর্মসূচি শেষ হতে না হতেই শনিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) আরেক দফা সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলো।

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সিলেটের জ্যেষ্ঠ ফটো সাংবাদিক আতাউর রহমান আতার উপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা। ২১ ডিসেম্বর নগরীর মাছিমপুরে একটি শিশুকে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে মারধরের দৃশ্য দেখে আতা সন্ত্রাসীদের বাধা দিয়েছিলেন। সেটিই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাঁর। ক্ষিপ্ত হয়ে সন্ত্রাসীরা তাঁর উপর এবং তাঁর বাসায় হামলা চালায়।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নগরীর আখালিয়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হন স্থানীয় একটি দৈনিক কাজীরবাজারের ফটো সাংবাদিক রেজা রুবেল (৩৫) ও তাঁর মা এবং ছোট ভাই। আহত রেজা রুবেলের ভাষ্যমতে, আখালিয়ায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাদকসেবী বাবলু সহযোগীসহ রুবেলের বাসায় প্রবেশ করে। তাদের আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাবলু রেজা রুবেল ও তাঁর স্বজনদের হুমকি দেয়। রেজা সাধারণ ডায়েরি করেন থানায়। পরে তাকে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে বাবলু বিভিন্ন মাধ্যমে হত্যার হুমকি দিতে থাকে। বিষয়টি নিয়ে আরেকটি সাধারণ ডায়েরি করেন রুবেল। পরে পুলিশ বাবলু ও তার সহযোগী শরীফকে গ্রেফতার করে। আদালত তাদেরকে কারাগারে প্রেরণ করে। জামিনে বেরিয়ে এসে বাবলু বেরিয়ে এসে ১০/১৫ জন সন্ত্রাসী নিয়ে রেজার বাসায় দুই দফা হামলা ও ভাঙচুর চালায়।

সিলেটের সাংবাদিক সমাজ গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিনের

ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে না আসলে যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত হবে সাংবাদিক।

সাংবাদিকতার নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবার আগে তার নিজকে সচেতন থাকতে হবে। প্রযুক্তির এ সময়ে নিজকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা বলয় তৈরি করাও জানতে হবে। শারীরিক ও ডিজিটাল দুভাবেই তার নিরাপত্তার কৌশলগুলো আয়ত্তে থাকতে হবে। পেশার মানোন্নয়ন ও পেশার স্বার্থে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, একজন সাংবাদিককে কোনো রকম আক্রমণ মানে পেশাকে আক্রমণ, পেশাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা, পেশাকে ছোট করা। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। নিজের পেশার মানুষকে ছোট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কাদা ছোড়াছুড়ি না করে পেশার মর্যাদা রাখতে হবে। পেশাগত কারণে আর কোনো সাংবাদিককে যেন হত্যা, হামলা বা হুমকির সম্মুখীন হতে না হয় সে জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজ এবং সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায়। কারণ মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য প্রয়োজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা। আর মুক্ত গণমাধ্যম একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।

লেখক, সাংবাদিক এম এ রউফ