Sat. Dec 5th, 2020

সাচনার শশী পালের ভবন ছিল ‘তরুণী টর্চার’ সেল

বিশেষ প্রতিনিধিঃ জামালগঞ্জের সাচনা বাজারে শশী পালের শূন্য ভবনে রাজাকার আব্দুস সাত্তার আস্থানা করেছিল। ওখানে কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, হবিগঞ্জ, নবীগঞ্জ, আজমিরিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লার নৌ-পথে আসা শরণার্থী পরিবারের কিশোরী-তরুণীদের তুলে নেওয়া হত। সেখানে ধৃত তরুণীদের ধর্ষণ করে পাকসেনাদের হাতে তুলে দেওয়া হত। নির্যাতন সইতে না পেরে কেউ কেউ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায়। এই খবর আমাদের কাছে পৌঁছালে সেক্টর কমান্ডার মীর শওকতের অনুমতি নিয়ে আমরা ১৫ জনের একটি দল ওই ভবনে হানা দেই। ওখান থেকে ৬ তরুণীকে আমরা উদ্ধার করে নিয়ে আসি। আমাদের এখানে আনার একদিন পরই ওই তরুণীরা একটি চিরকূট লিখে অজানার উদ্দেশ্যে চলে যায়। এরপর আর ওদের খোঁজ পাওয়া যায় নি।

বিজয়ের মাসে নানা স্মৃতি তাড়া করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। কিছু স্মৃতি মনে করে চোখের পানি ঝরান তাঁরা। এমনই এক দুঃখের স্মৃতি স্মরণ করে হা-হুতাশ করছিলেন মুক্তযুদ্ধকালীন ৫ নম্বর সেক্টরের দাস কোম্পানীর (কোম্পানী কমান্ডার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস) মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র তালুকদার।

বললেন, জামালগঞ্জের সাচনাবাজারের শশী পালের শূন্য ভবনে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকাররা তরুণী ধর্ষণের ‘টর্চার সেল’ বা আস্তানা করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে রাজাকাররা রক্তি নদীর মুখে একটি প্রমোদতরী, মাহমুদপুরের পাশে আরেকটি প্রমোদতরী এবং হালির হাওরের মুখে আরেকটি প্রমোদতরী নিয়ে অবস্থান করতো। কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, হবিগঞ্জ, নবীগঞ্জ, আজমিরিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লার হিন্দু পরিবারের শরনার্থীরা প্রথম প্রথম জামালগঞ্জের ভীমখালী বাজারের পাশের বিছনা খাল দিয়ে সীমান্তে যেতেন। এই এলাকায় রাজাকার বেশি থাকায় পরে শরণার্থীরা পথ বদলান, সুরমা- রক্তি নদী হয়ে সীমান্তে পৌঁছাতেন। কেউ কেউ জামালগঞ্জের নয়মৌজা থেকে হালির হাওর হয়ে তাহিরপুর হয়ে সীমান্তে গেছেন। রাজাকাররা ওই পথেও ওঁত পেতে থাকতো।
শরনার্থীদের নৌকা প্রায়ই রাজাকাররা আটকাতো।

জামালগঞ্জের রামপুরের মৃত আব্দুছ ছাত্তার, সাচনার মৃত সুন্দর আলী, সেরমস্তপুরের রাজাকার আয়ুব আলীসহ বেশ কয়েকজন রাজাকার এই প্রমোদতরীগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো। তারা শরণার্থীদের নৌকা থেকে বাবা-মা, ভাই-বোনের সামনে থেকেই তরুণীদের নিয়ে যেত। এদের মধ্যে কোনো কোনো তরুণীকে প্রমোদতরীতেই ধর্ষণ করে ছেড়ে দিতো। কাউকে কাউকে (যাদের বেশি সুশ্রী মনে করতো) নিয়ে যেত সাচনাবাজারের শশী পালের দু’তলা ভবনে। ওখানে নিয়ে চালানো হতো নির্যাতন ও ধর্ষণ। এরপর তাদের তুলে দেওয়া হতো পাক হায়েনাদের ক্যাম্পে (সাচনাবাজার পোস্ট অফিসের ক্যাম্প)। কয়েকদিন ওখানে রাখার পর মেয়েদের রহিমাপুর, রামপুর, বেহেলীসহ জনশূন্য হিন্দু গ্রামগুলোতে তুলে দেওয়া হতো। মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে ভয়ে নিয়ে যেত না রাজাকাররা। ওই গ্রামগুলোর মানুষ এসবের প্রতিবাদ জানাতেন, এজন্য ভয়ে অপেক্ষাকৃত জনশূন্য হিন্দু গ্রামগুলোতে তাদের ফেলে রেখে আসা হতো।

হরেন্দ্র তালুকদার জানালেন, শশী পালের ভবনে নদীর পাড় থেকে ওঠতে সুবিধা হতো, এজন্য রাজাকাররা ওই ভবনে আস্তানা গড়েছিল। ওই ভবনে ওঠার সময় অন্যরা দেখবে না, নিরাপদে উঠা যাবে, এজন্য ওই ভবনে আস্তানা করে তারা। এই ভবনই ছিল তাদের ধর্ষণ সেল বা তরুণী টর্চার সেল। যুদ্ধকালীন সময়ে এবং পরে এসেও শুনেছি শাল্লার সুখলাইনের রাজেন্দ্র দাস’এর ৩ মেয়েকে নৌকায় সীমান্তের ওপারে যাবার সময় হালির হাওরে নৌকা আটকে মা-বাবার কাছ থেকেই নিয়ে যায় রাজাকাররা। ৩ টি মেয়েই সুশ্রী ছিল। ২ টি মেয়ে শশী পালের ভবনেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায়। ছোট মেয়েটিকে ভারসাম্যহীন অবস্থায় পরে উদ্ধার করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র তালুকদার বলেন, ডিসেম্বর মাস আসলে ওই ভবনের দিকে থাকালে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। যুদ্ধ দিনের কষ্টের কথা বার বারই মনে হয়।

সাচনাবাজারের বাসিন্দা, সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউসুফ আল আজাদ জানালেন, রামপুরের আব্দুস ছাত্তার রাজাকার এখানে আস্তানা গেঁড়েছিল। শশী পালের ভবনটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের লোমহর্ষক স্মৃতি জাগানিয়া ভবন। এই ভবনের সামনে মুক্তিযুদ্ধের এসব স্মৃতি লিখে রাখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।