Sat. Sep 19th, 2020

কাজে আসছে না কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনটি ব্রিজ

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : হবিগঞ্জে নির্মাণ করা তিনটি ব্রিজ অসারই রয়ে গেছে। সরকারের প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজ তিনটি কোনো কাজেই আসছে না সাধারণ মানুষের। কেউ কোনো দিন এসব ব্রিজ দিয়ে পারাপারও হতে পারেননি। উপরন্তু ব্যবহারের আগেই একটি ব্রিজ দেবে যেতে শুরু করেছে। এ নিয়ে ক্ষোভের সীমা নেই সাধারণ মানুষের মাঝে।

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বদলপুরের সাতগাঁও গ্রামসংলগ্ন খালের ওপারে অবস্থিত পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘ পথ ঘুরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়। শুধু তাই নয়, বাঁশের সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাল পারাপার হতে হয়। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দাবি তুলেন খালের ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণের।

এ অবস্থায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের সেতু কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ওই খালে একটি ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ব্রিজটি নির্মাণে চূড়ান্ত ব্যয় হয় ২৮ লাখ ৯ হাজার ৯৪৫ টাকা। প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ২৯ লাখ ৫৭ হাজার ৮৩৭ টাকা। প্রকল্পের নাম বদলপুর উত্তরহাটি হতে সাতগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তার খালের ওপর ৩৬ ফুট সেতু নির্মাণ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের অধীনে স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মতলবগঞ্জ ট্রেডার্স ব্রিজটি নির্মাণ করে।

নির্মাণকাজ শেষ হলে ২০১৬ সালের ১ জুন ওই ব্রিজের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল মজিদ খান। এদিকে উদ্বোধনের পর ব্রিজের উভয়পাশে অ্যাপ্রোচে মাটি ভরাট করার পূর্বেই ব্রিজটির একপাশ দেবে যায়। পরে ব্রিজের উভয়পাশে ওঠানামার জন্য অদ্যাবধি মাটি ভরাট করা হয়নি। এদিকে আজমিরীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের রনিয়া গ্রামে বসবাসকারীদের মধ্যে অধিকাংশই মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের।

তারা সারা বছর ধরে নদী, নালা, খাল, বিলে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাকিরা কৃষিজীবী। ওই গ্রামের কৃষিজীবী লোকজন হাওর থেকে পাকা ধান কেটে গ্রামের অদূরে মাঠে এনে ধানমাড়াইসহ নানা ধরনের গৃহস্থালি কাজ করে থাকেন। গ্রাম ও মাঠের মাঝখানে একটি খাল থাকায় ওই গ্রামের লোকজনদের দীর্ঘ রাস্তা ঘুরে ধান ও খড় পরিবহন করতে হয়।

কিন্তু খালটিতে একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হলে গ্রাম থেকে খলায় যাতায়াতে ও ধান, খড় পরিবহনে কৃষকদের সুবিধা হয়। এ ছাড়া গ্রামের লোকজন ব্রিজের ওপর দিয়ে কাকাইলছেও-আজমিরীগঞ্জ রাস্তায় উঠে আজমিরীগঞ্জ পৌঁছতে আরও সহজ হবে। এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের সেতু কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প ওই স্থানে একটি ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।

বাস্তবায়নে ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ২৮ লাখ টাকা। কাজটি বাস্তবায়ন করেন স্থানীয় ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম। কাজ শুরুর আগেই গ্রামের লোকজন জানতে পারেন যে, তাদের গ্রামসংলগ্ন খালে ব্রিজ নির্মাণ করা হবে না। ওই খালের ওপর নির্ধারিত স্থানের ব্রিজটি প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে হাওরে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

হঠাৎ করে নির্ধারিত স্থান থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ও রহস্যজনক কারণে ব্রিজটি অন্যত্র স্থানান্তরিত করায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন রনিয়া গ্রামবাসী। পরে ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রিজটি আজমিরীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বিরাট ভাটিপাড়া গ্রামের অদূরে হাওরে নির্মাণ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে ব্রিজের চারদিকে পানি থই থই করে। কয়েক বছর আগে একটি ছোট খালের ওপর নির্মাণ করা এ ব্রিজটির অ্যাপ্রোচের ভেতরে অদ্যাবধি মাটি ভরাট করা হয়নি। ফলে নির্মাণ করা ব্রিজটি লোকজনের কোনো কাজেই আসছে না। কয়েক বছর আগে নির্মাণ করা হলেও অদ্যাবধি ব্রিজটি উদ্বোধন করা বা প্রকল্পের নামসংবলিত কোনো নেমপ্লেট বসানো হয়নি।

অন্যদিকে আজমিরীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বিরাট উজানপাড়া গ্রাম থেকে বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ শরীফ উদ্দিন সড়ক হয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ সাধারণ লোকজনের স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছতে মারাত্মক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। এ অবস্থায় শরীফ উদ্দিন সড়ক থেকে রাস্তাসহ একটি ব্রিজ নির্মাণের জোরালো দাবি উঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের সেতু কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প ওই এলাকায় একটি ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।

প্রকল্পের নাম ছিল শরীফ উদ্দিন রোড হতে বিরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তায় খালের ওপর ২৪ ফুট ব্রিজ নির্মাণ। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১৯ লাখ ৭৪ হাজার ১৫৬ টাকা। বাস্তবায়নে ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর। নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিলেন আজমিরীগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী। নির্ধারিত খালের ওপর ব্রিজ নির্মাণের পর এক বছরেরও অধিক সময় অতিবাহিত হলেও ব্রিজের উভয়পাশে অ্যাপ্রোচের মধ্যবর্তী স্থানে মাটি ভরাট না করা হয়নি। তাই অদ্যাবধি নির্মাণকৃত ব্রিজটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় লোকজনের কোনো কাজেই আসছে না।

এ ছাড়া ব্রিজটি নির্মাণেও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কাজের জবাবদিহিতা না থাকায় সংশ্লিষ্টরা খেয়ালখুশিমতো কাজ করে নিজেদের পকেট গরম করছে বলে স্থানীয়দের মনে করেন। ব্রিজের গায়ের নেমপ্লেটে নির্মাণের তারিখ, ব্যয় বা উদ্বোধনের কিছুই উল্লেখ নেই।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জানান, সব ব্রিজই মানুষ ব্যবহার করছেন। সবই যথাযথ নির্মিত হয়েছে। কিছু লোক অযথা এগুলোর ব্যাপারে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু বদলপুর সাতগাঁও গ্রামের একটি ব্রিজ দেবে গেছে এলজিইডির একটি রাস্তা বন্যায় ভাঙ্গার কারণে। এটি সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বাকি ব্রিজগুলোর কোনো সমস্যা নেই। সবগুলো ঠিকমতোই মানুষ ব্যবহার করতে পারছেন