Mon. Jun 1st, 2020

হারিয়ে যাচ্ছে সুরমা নদী, বিরুপ প্রভাব পড়বে এ অঞ্চলের পরিবেশের উপর

স্টাফ রিপাের্ট: সিলেটের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের নদী সুরমা। উজানে ভারত থেকে নেমে আসা বাংলাদেশের সীমান্ত জকিগঞ্জের বরাক মোহনায়এর উৎপত্তি। সেখান থেকে ভাগ হয়ে বাংলাদেশে প্রবাহমান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারা। সুরমা সিলেট নগর ও সুনামগঞ্জের উপর দিয়ে প্রবাহিত।

২৪৯ কিলোমিটার বা ১৫৫ মাইল দৈর্ঘ্যের নদীটি সুনামগঞ্জ জেলার বাউলাই নদীর মোহনায় মিশেছে। বর্ষায় বন্যাপ্রবণ সুরমায় শীতে দেখা দেয় নাব্যতা সংকট। শীত মৌসুমে পরিণত হয় মরাগাঙে।

যে নদী দিয়ে চলতো জাহাজ, সেই সুরমা দিয়ে কোনোমতে নৌকা চলছে এখন। জেগেছে চর। নদীতে পলি জমে পরিণত হয়েছে খেলার মাঠে।

আর সুরমা নদীর সিলেটের অংশ নাব্যতা হারাচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে ফেলা নগরের আবর্জনায়। বর্জ্যের স্তূপ আর পলিথিনে জমে ভরে গেছে নদীর তলদেশ। নদীর সিলেট জেলার বিভিন্ন অংশে পলিমাটি জমে চর সৃষ্টি হয়েছে।

নগর সংলগ্ন সুরমার উপর শাহজালাল (র.) ১ম, ২য় ও তৃতীয় সেতুর পিলারে পানির স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে জমে উঠেছে চর। তারচেয়েও ভয়াবহ নদীদূষণ হচ্ছে অসচেতনভাবে নগরের বর্জ্য নদীতে ফেলে। নগরের হাজার হাজার টন পলিথিন সুরমার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে বিপন্ন করে তুলেছে পরিবেশ। এ নিয়ে খোদ প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদরাও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
সুরমা নদী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নদী ভরাট হলেও খননের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে উজানে বরাক মোহনা ভরাট হওয়ায় এই মৌসুমে ৭০ শতাংশ পানি চলে যায় কুশিয়ারায়। যে কারণে নদীর মোহনা খনন জরুরি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এ অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নৌকা ও ইঞ্জিনের ছোট ট্রলার ছাড়া বড় নৌযান চলাচল করতে পারে না সুরমার বুকে। আর সুরমায় পানি না থাকায় শাখা-প্রশাখাও শুকিয়ে প্রাণ হারিয়েছে জলজ উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য।

প্রায় দেড় দশক ধরে সুরমা নদী নিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা (সিলেট) শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার আব্দুল করিম কিম। সুরমা নদীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, পলি জমে সুরমা নদীর উৎসমুখ ভরাট হয়ে আছে।

জকিগঞ্জের অমলসীদ থেকে কানাইঘাট উপজেলার লোভা নদীর মিলনস্থল পর্যন্ত পলি জমে একাধিক চর জেগেছে। ফলে উৎসনদী বরাক থেকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে আছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরেখা দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদী নাব্যতা হারানোয় অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের সীমান্ত নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাপার পক্ষ থেকে সুরমার উৎসমুখ খননের জন্য যৌথ নদী কমিশনে আলোচনা শুরুর দাবি একাধিকবার জানানো হয়েছে।

তিনি সুরমা নদীর দূষণ সম্পর্কে বলেন, সুরমা নদী সিলেট মহানগরীর মানুষের আবর্জনার ভাগাড়। নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন খাল ও ছড়া দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতল সুরমা নদীতে ফেলা হচ্ছে। ছড়া ও খাল সিটি করপোরেশন থেকে একাধিকবার পরিষ্কার করা হলেও মানুষের অসচেতনতা সুরমার জীবন বিপন্ন করে তুলছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের কাজিরবাজার মৎস্য ও কলার আড়তের ফেলা বর্জ্যে সিসিকের খাল হয়ে আসা আবর্জনায় নদী ভরাট হচ্ছে। একইভাবে নগরের ছড়ারপার খালের আবর্জনা ও এলাকার শুটকি আড়তের ফেলা বর্জ্যে ভরাট হচ্ছে নদীর তলদেশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সড়ক ও জনপথের (সওজ) এক প্রকৌশলী বলেন, নগরের কাজিরবাজার শাহজালাল (র.) ২য় সেতুর চারটি খুঁটির প্রস্থ নদীর অর্ধেক দখল করে নিয়েছে। ফলে স্রোতপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নদী ভরাট হচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুজ্জামান সরকার বলেন, সুরমার বিভিন্ন পয়েন্টে খনন প্রয়োজন। বিশেষ শুস্ক মৌসুমে সুরমায় পানি না থাকার মূলে উৎসমুখ বরাক মোহনা ভরাট হয়ে যাওয়া। উৎপত্তিস্থল ভরাট হওয়াতে এ মৌসুমে ৩০ শতাংশ পানিও আসে না সুরমায়।

তিনি আরও বলেন, সুরমা খননের কোনো বরাদ্দ আসেনি। তবে নদী তীর প্রতিরক্ষায় এক কোটি ২০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প সময়মতো কাজ না হওয়ায় ফেরত গেছে। এছাড়া নগর সংলগ্ন কানিশাইল এলাকায় সেকেন্ড কিস্তিতে ৮ কোটি টাকার বরাদ্দ এলেও দুই মাস আগে প্রকল্পের মেয়াদ পেরিয়ে গেছে।