Thu. Oct 29th, 2020

দৈনিকসিলেটডটকম এবং আমি

মুহিত চৌধুরী: সাংবাদিকতার শুরু আশির দশকে সাপ্তাহিক ’বিচিন্তা’ পত্রিকার মাধ্যমে। বিচিন্তা পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন মিনার মাহমুদ। এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী ভূমিকার জন্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন মিনার মাহমুদ। তিনি ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘বিচিন্তা’ প্রকাশ শুরু করলেও ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে এরশাদ তাকে গ্রেপ্তার করে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন।

আমি চলে যাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইর্য়কের লং আইল্যান্ডে ‘ডানকিন ডনাট’ নামক আমেরিকান ফ্র্যাঞ্চাইজ কোম্পানীতে প্রথম কর্মজীবন শুরু করি। অবসর সময়ে চলে লেখা-লেখি এবং দেশের পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রেরণ।

সালটা সম্ভবত ১৯৯২। একদিন বিকালে আমাদের কোম্পানীর ম্যানেজার মি. হার্ব আমার সমবয়সী একজন লোককে নিয়ে ঢুকলেন এবং বললেন, আজ থেকে উনি এখানে কাজ করবেন। আরো বললেন, উনি তোমাদের বাংলাদেশী, তাকে ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্ব তোমার।

পরবর্তিতে আমি যখন উনার নাম জানতে চাইলাম তিনি বললেন, তার নাম মিনার মাহমুদ।

আমি বললাম আপনার নাম মনে থাকবে। এই নামে আমাদের দেশে একজন নাম করা সম্পাদক আছেন। এই কথা বলার সাথে সাথে তিনি মৃদু হেসে জানতে চাইলেন। আমি এই সম্পাদককে কখনও দেখেছি কি? আমি বললাম উনার পত্রিকায় লেখালেখি করলেও কখনও দেখা হয়নি। এ কথা শুনে তিনি আমার হাত চেপে ধরে বললেন, ভাই আমিই সেই হতভাগা মিনার মাহমুদ। সাথে সাথে আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরি। তিনি অবশ্য এখানে বেশি দিন কাজ করেননি। প্রায় মাস দুয়েক কাজ করার পর চলে যান নিউইর্য়কের কুইন্স।

আমিও একসময় চলে আসি এস্টোরিয়াতে।
কবি ফকির ইলিয়াস এবং লেখক সাংবাদিক মালেক ইমতিয়াজকে নিয়ে শুরু করি পত্রিকার প্রকাশনা। ভিন্নধারার এই পত্রিকার নাম ছিলো ‘শিকড়’। অল্প দিনের মধ্যে ‘শিকড়’ প্রবাসীদের মনজয় করতে সমক্ষম হয়। ১৯৯৬ সালে এই শিকড়ের উদ্যোগে নিউইর্য়কে আমরা আয়োজন করেছিলাম ‘হাসনরাজা লোকসাহিত্য সম্মেলন’। যা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলো। এই সম্মেলন সফল করতে প্রবাসের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আমাদেরকে নানাভাবে সহায়তা করেন। বিশেষ ভাবে এগিয়ে আসেন শহীদ সামসুদ্দিন আহমদের তনয় ডা. জিয়া উদ্দিন আহমদ, আবৃত্তি শিল্পী মাসুদুর রহমান।
এই সব সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যিনি আমার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি ডা. নাজরা চৌধুরী। আরো ছিলেন আব্দুল হামিদ ইকবাল ও শাহানা চৌধুরী।

এই সম্মেলন করার পর আমার এবং শিকড়ের জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নেই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে আমি স্থায়ীভাবে চলে আসবো। একথা জানাজানি হলে নিউইর্য়কের সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে বেশ প্রতিক্রিয়া হয়। অনেকেই আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করেন আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এভাবে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।

একটা কথা বলে রাখি অনেকের মতো আমেরিকা আমারও স্বপ্নের দেশ ছিলো। কিন্তু সেখানে যাবার পর বুঝতে পেরেছিলাম এ স্বপ্ন এক মরিচিকা। সবসময় নিজেকে কেমন যেন উদ্বাস্তু এবং অসহায় যাযাবর মনে হতো।

অবশেষে ১৯৯৭ সালের ৩০ আক্টোবর সব মোহকে বির্সজন দিয়ে চলে আসি আমার প্রাণের বাংলাদেশে। না আমি ভুল করিনি, আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের বাংলাদেশের পথে। আমরা অচীরেই একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে আত্ম প্রকাশ করবো। এই উন্নয়নের সহযাত্রী হবার ভাগ্যে কয়জনের হয়?

১৯৯৯ সালে সিলেটের একটি দৈনিকে নির্বাহী সম্পাদক পদে কাজ করার অফার আসে। অনেক ভেবে চিন্তে ফিরিয়ে দেই অফারটি। সিদ্ধান্ত নেই নিজে পত্রিকা প্রকাশ করবো।

যেই ভাবা সেই কাজ। নাম ঠিক হলো ‘বিশ্ববাংলা’ । সিলেটে মানসম্পন্ন কোন মাসিক ম্যাগাজিন নেই, তাই মাসিক ম্যাগাজিন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আবেদন করি ডিক্লারেশনের জন্য। একসময় সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলে ২০০৩ সালে শুরু হয় বিশ্ববাংলার প্রকাশনা।
পূর্বজিন্দাবার হকসুপার মার্কেটে বিশ্ববাংলার নিজস্ব অফিস করা হয়। বিশ্ববাংলা ছিলো একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন। শুরু থেকেই এটি পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানসহ সিলেটের মন্ত্রী এবং রাজনীতিবিদ এটি নিয়মিত পাঠ করতেন। যুক্তরাজ্যে বিশ্ববাংলার প্রায় দুই শত নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। বিশ্ববাংলা নিয়মিত প্রকাশ হয় ২০১৬ সাল পর্যন্ত। সিলেটের ইতিহাসে কোন মাসিক ম্যাগাজিন এতো দীর্ঘ সময় প্রকাশ হবার নজির নেই।

ডিজিটাল বাংলাদেশে ২০০৪ সালে অনলাইন গণমাধ্যম যাত্রা শুরু করে নিউজপোর্টাল ‘বিডিনিউজ২৪ডটকম’-এর হাত ধরে।

আর সিলেটে ২০১০ সালে ‘বাংলানিউজআপডেটডটকম’ নামে একটি পরিপূর্ণ অনলাইন নিউজপোর্টালের মাধ্যমে । যদিও এর আগে অর্থাৎ ২০০৬ সালে ‘সিফডিয়াডটকম’ নামে সংবাদ ও ছবি ভিত্তিক আরো একটি ওয়েবসাইট সিলেটে চালু হয়।

২০০৯ সালে বিশ্ববাংলার গ্রাহক অভিযানে ব্রিটেন সফরে গেলে প্রায় সকল গ্রাহকই বিশ্ববাংলার অনলাইন ভার্সন চালু করার দাবী করেন।

দেশে ফিরে ‘বিশ্ববাংলাডটকম’ নামে অনলাইন ভার্সন চালু করি। বিশ্ববাংলা মাসে একবার আপডেট দিতে হতো। বিষয়টি আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগতো না। আবার মাথায় ভূত চাপলো নতুন নামে পরিপূর্ণ অনলাইন নিউজপোর্টাল করার। শুরু হলো কাজ। নাম ঠিক করলাম দৈনিকসিলেটডটকম। এই নামে ডোমেনও পেয়ে গেলাম। ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চালু হলো দৈনিকসিলেটডটকম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।তাকে দাওয়াত দিতে গেলে তিনি বললেন, আমার পছন্দের নামটি আপনি শেষ পর্যন্ত নিয়ে নিলেন? তাঁর কথার মর্মার্থ বুঝতে পারছিনা দেখে তিনি পরে বিষয়টি পরিস্কার করলেন। দৈনিকসিলেট তাঁর পছন্দের একটি নাম, তিনি ভেবেছিলেন কোন দিন দৈনিক পত্রিকা করলে এর নাম দেবেন ‘দৈনিকসিলেট’।

আমি তখন সহাস্যে তাকে বলেছিলাম,কামরান ভাই ধরে নিন দৈনিকসিলেট আপনারই পত্রিকা।

এর পর থেকে দৈনিকসিলেডেটকমকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।দেশ,মাটি, মানুষ আর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষাভাষীদের একটি প্রিয় নিউজ পোর্টাল হিসেবে দৈনিকসিলেটডটকম আত্মপ্রকাশ করেছে।

আমাদের একটি নিউজ আপডেট হবার পর হাজার হাজার পাঠক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেন। অতি সম্প্রতি দৈনিকসিলেটডটকমের একটি নিউজ শেয়ার হয়েছে ১ লক্ষ ৭ হাজার ৫ শত বার। এ থেকে সহজে অনুমেয় দৈনিকসিলেটডটকমের পাঠক সংখ্যা। এই সফলতা আপনাদের যারা দৈনিকসিলেটডটকমকে ভালোবাসেন।

দশম বর্ষে পদার্পণের এই শুভক্ষণে আমাদের সকল পাঠক,বিজ্ঞাপনদাতা এবং শুভানুধায়ীকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।