Sat. Aug 15th, 2020

করোনা যুদ্ধে জনগনকে সুরক্ষা দিতে মাঠে আছে সেনাবাহিনী

ফারহানা বেগম হেনাঃ সারা বিশ্বের মতোই করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় স্থবির বাংলাদেশ। করোনা মোকাবিলাকে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এই যুদ্ধে সামনে থেকে লড়াইয়ের ঘোষণা দেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। স্পষ্ট ভাষায় তিনি বলেন, ‘আমরা সৈনিক, আমরা সব সময় যুদ্ধ করতে প্রস্তুত এবং সেই প্রস্তুতি নিয়ে আমরা আছি। আমরা সবাইকে সহযোগিতা করব।’ তার এই প্রবল আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ প্রমাণ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করেই দেশের মানুষকে সুরক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

আমরাও আশাবাদী করোনা যুদ্ধে জিতবে বাংলাদেশের বীর সেনাবাহিনী। এইলক্ষ্যে “করোনা যুদ্ধ করব জয় ঘরের বাইরে আর নয়” কার্যক্রমে নেমে পড়েছে বাংলাদেশের অকুতভয় বীর সেনানীরা। ইতিমধ্যে তাঁরা সারাদেশে সক্রিয় ভূমিকায় নেমে পড়েছে। রাজধানীসহ দেশের ৬৪ জেলায় করোনা মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়, সাভার, লালমনিরহাটসহ দেশের প্রতিটি এলাকাতেই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে সেনা সদস্যরা। দেশপ্রেম আর মানবিক বোধ থেকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেরা বিনামূল্যে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছেন। সেই সঙ্গে রোদ, বৃষ্টি ও ঝড় উপেক্ষা করে সড়কে সড়কে টহল দিয়ে সাধারণ মানুষকে যেমন সতর্ক করছে, তেমনি ‘সঙ্গনিরোধ’ নিশ্চিতেও তেড়েফুঁড়ে না ছুটে ইতিবাচক পদক্ষেপে জয় করেছে দেশের মানুষের হূদয়।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর আইএসপিআর এর তথ্যমতে, প্রতিটি জেলায় প্রায় ৬০০ দলে বিভক্ত হয়ে ৭৫০০ জনেরও বেশি সেনা সদস্য নানা কায়দায় ঘর থেকে বের হওয়া মানুষকে সচেতন করছে। প্রয়োজন অনুসারে এই সংখ্যা আরো বাড়াতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের মাধ্যমে করোনার ভয়াল থাবা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতে এসব সেনা সদস্যরা নিয়মিত টহল জোরদার করে সড়কে বা অলিগলিতে সাধারণ মানুষের জটলা ভেঙে দিচ্ছেন। ঘর থেকে বের হওয়া মানুষজনকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনছেন। গাড়ি থামিয়ে কথা বলছেন তাদের সঙ্গে। নির্ধারিত পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিকে দিয়ে সড়কে বের হওয়া গাড়ির চারপাশে তাদের জীবাণুনাশক ছিটানোর দৃশ্যও চোখে পড়েছে হরহামেশাই।

সেনাবাহিনীর টিম সকল জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অবস্থান করে ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে করোনার বিরুদ্ধে সবচাইতে কার্যকর পদ্ধতি ‘সামাজিক দূরত্ব’ সৃষ্টিতে সহায়তা করে আসছে। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনায় জীবাণুনাশক পানি স্প্রে, বিভিন্ন স্থানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাপনা তৈরি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে আরো বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে সশস্ত্র বাহিনী। এই কাজে সারা দেশে নিয়োজিত ছিলো কয়েক হাজারের বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনীর সামাজিক কার্যক্রম ‘সিমিক’র সুনাম রয়েছে। এবার নিজ দেশে একইভাবে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে সেনাবাহিনী। এতে চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত প্রতিটি মানুষের আস্থা আর ভালোবাসার অপর নাম হয়ে উঠেছেন সেনাবাহিনীর চিকিৎসকরা।

আমরা অনেকে মনে করতাম সশস্ত্র বাহিনী জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে, মনে করতাম- তাদের কাজ যুদ্ধের মাঠে, শান্তি স্থাপনের জন্য কঠোর হস্তে বিশৃঙ্খলা দূর করা এবং বন্দুক উঁচিয়ে সবসময় জনগণকে শাসন করা। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমরা দেখতে পেলাম, সেনাবাহিনী ২৪ মার্চ থেকে গ্রামে-গঞ্জে, মাঠে-বাজারে মাইকিং করছেন জনগণকে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করার জন্য, সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরিয়ে সাহায্য করছেন। অস্ত্র উঁচিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নয় বরং নিজের জীবন বাজি রেখে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে মানুষের জীবন বাঁচাতে দায়িত্ব পালন করছেন।

করোনা মোকাবেলায় উপকূলীয় এলাকায় টহল জোরদার, জীবাণুনাশক স্প্রে ব্যবহার ও দুঃস্থদের ত্রাণ বিতরণ করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। একইভাবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাদের ঘাঁটির নিকটবর্তী স্থানগুলোতে দুস্থদের মধ্যে খাবার বিতরণ করে।

এছাড়া জনসচেতনতা সৃষ্টিতে পায়ে হেঁটে প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে ছুটে যায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। প্ল্যাকার্ড নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে তারা। সেখানে কারো হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘ঘনঘন হাত ধুই, করোনা থেকে নিরাপদ রই’। অপর এক প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘বিদেশ থেকে এসেছি যারা, কোয়ারেন্টাইনে থাকব তারা’। এ ছাড়াও করোনা নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে লেখা অপর এক প্ল্যাকার্ডে বলা হয়েছে ‘আতঙ্ক না ছড়াই, সতর্ক থাকি সাহায্য করি’।

জানা গেছে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’- কর্মসূচির আওতায় গত ২৪ মার্চ থেকে দেশের সকল বিভাগ এবং জেলায় করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তার উদ্দেশ্যে সেনা মোতায়েনের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী প্রয়োজনীয় সমন্বয় শেষে ২৫ মার্চ থেকে সেনাবাহিনী পুরোপুরি কাজ শুরু করে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের তালিকা প্রস্তুত এবং বিদেশ হতে প্রত্যাগত ব্যক্তিবর্গের কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিশ্চিত কল্পে স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ সমূহে সহায়তা ও সমন্বয় করছে। এ ছাড়াও সেনাবাহিনী বিভাগ এবং জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনে মেডিকেল সহায়তা প্রদান করছে।নৌবাহিনী উপকূলীয় এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় কাজ করছে। অন্যদিকে বিমান বাহিনী হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী ও জরুরী পরিবহন কাজে নিয়োজিত।

এদিকে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট দুর্যোগময় মুহূর্তে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সিলেটে দায়িত্ব পালন করছেন ৩৪ বীর’র অধিনায়ক মেজর মো. কামরুল হাসান।

শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সিলেটবাসীর সহায়তা চেয়ে তিনি বলেন, সিলেটের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। কোনোভাবেই কোনো ধরনের গুজবে কান না দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান ওই মেজর মো. কামরুল হাসান।

সিলেটের দায়িত্বরত ওই সেনা কর্মকর্তা আরো বলেন, সেনাবাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে, দেশ মাতৃকার দুর্যোগপূর্ণ সময়ে আজীবন আমরা পাশে থাকবো। করোনা ভাইরাসকে একটি যুদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করেছে সেনাবাহিনী। তাই কি পেলাম, কি পেলাম না ও কোনো কিছুর লাভের আশায় সেনা বাহিনীর সদস্য হিসেবে আমরা কাজ করি না। দেশটা আমাদের, তাই কাজটা আমদেরকেই করতে হবে।

করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, করোনাজনিত উপসর্গ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে সরকারের দেওয়া হটলাইন নম্বরগুলো ব্যবহার করুন। প্রত্যেকে যার যার ঘরে থাকুন। ধৈর্য, সহনশীলতা ও সৎ সাহসের পরিচয় দিয়ে আমাদের সবার দায়িত্ব এই মহামারিতে সঠিক ভূমিকা পালন করা।