Sat. Aug 15th, 2020

প্রসঙ্গ : সিলেট অঞ্চলে করোনা এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়হীনতা

দেবব্রত রায় দিপন : বিশেষজ্ঞরা বলছেন করোনার চতুর্থ ধাপে এখন অবস্থান সিলেটের। বিষয়টি আঁতকে উঠার মতো ! চতুর্থ ধাপকে বলা হয় চুড়ান্ত ধাপ। সহজভাবে ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’। এই পর্যন্ত সিলেটের চার জেলায় করোনা আক্রান্ত রোগী রয়েছেন মোট ৩২ জন। আক্রান্ত হবার আগে এবং পরে সিলেট ও মৌলভীবাজারে মারা গেছেন আরো ২জন।

প্রশ্ন হলো এই ৩২ জন করোনা রোগী একটি ছোট্টো বিভাগীয় শহরের জন্য নি:সন্দেহে গভীর আতঙ্কের। বিশেষ করে সিলেট নগরীতে প্রথম একজন চিকিৎসকের শরীরে করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর যতোটুকু না দু:সংবাদ ছিলো-তারচে বেশি ভয়ানক উদ্বেগের সংবাদ ছিলো ওই চিকিৎসকের সংক্রমের উৎস খোঁজে বের করতে না পারা। তারপর থেকে যা হবার তাই হতে থাকলো, আর আমরাও প্রতিদিন গভীর আগ্রহের সাথে কেবলই সংখ্যা গুনছি আক্রান্তের। খুবই নির্মম হলেও এই বিষয়টিকে সত্য বলে মেনে নিতে আপত্তি নেই কারো। এরপর ১২ এপ্রিল সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায় প্রথম করোনা সনাক্ত হলেন একজন মহিলা। মহিলার স্বামী প্রবাসী। বাড়ি জেলার দোয়াবাজার উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামে। ১৩ এপ্রিল একই জেলায় ২য় করোনা আক্রান্ত রোগী হলেন আরো ১ মহিলা। আক্রান্ত মহিলার বাড়ি জেলার সদর উপজেলায়। ওই মহিলার শরীরে করোনার কোনো উপসর্গ ছিলোনা। তিনি গর্ভবতী অবস্থায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৮ এপ্রিল। সুনামগঞ্জে করোনা আক্রান্ত এই দুই মহিলার আক্রান্ত পরবর্তী এখনও দুজনের করোনা আক্রান্তের উৎস সন্ধানে ব্যর্থ হয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন। এমনকি সেখানকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন-এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। মোট কথা, দায়হীনতা কাজ করছে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে।

একের পর এক বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সারাদেশকেই নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। দেশে চলছে লকডাউন। সিলেটের জেলা প্রশাসক পরিস্থিতির ভয়াবহতায় সিলেটকেও লকডাউন ঘোষণা করেছেন। এই লকডাউনেও সিলেটে যা চলছে,তা বলার অপেক্ষা রাখেনা-সামনে এক ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে পরতে যাচ্ছি আমরা। এই পরিস্থিতিতে সিলেটের চার জেলায় সামজিক দূরত্বের বিষয়টি লংঘন হচ্ছে বারবার। সরকারের বিভিন্ন বাহিনী প্রতিদিন সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েও ব্যর্থ হচ্ছেন। এই দু:সময়ে কাছে নেই জনপ্রতিনিধিবৃন্দ।

সরকারি ত্রাণ আসলে জনপ্রতিনিধিদের খোঁজে আনতে হয়না। তারাই পছন্দমতো খোঁজে নেয় নিজেদের ভোটার। সাথে পকেটভারিও বেশ মন্দ হয়না। ত্রাণের গন্ধ পেলে প্রয়োজনে কাঁচা পেঁয়াজ হাতে নিয়েও চোখে জল আনতে জুড়ি নেই তাদের। আমাদের সিসিক মেয়রও নগরবাসীর দু:সময়ে কাছে এসেছিলেন। তিনি নগরবাসীর জন্যে বেশ একটা ভুমিকা রাখলেন। সিসিকের ফান্ড নেই,তাই সাহায্য চাইলেন সরকারের। সরকারি সাহায্য আসার পর দেশে-বিদেশে সামর্থবানরাও এগিয়ে আসলেন সহযোগিতার;বাদ যায়নি সিসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। একমাসের বেতনের টাকা কর্তন করা হবে,ঘোষণা দিলেন আমাদের মহান মেয়র মহোদয়। বিতরণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেলেন আমাদের মেয়র মহোদয়ও। নগরীর কোথাও এখন মেয়র নেই ! কি সাংঘাতিক ব্যাপার ! ত্রাণ বিতরণ পর্বেও ঘটে গেলো নানা ঘটনা। শুরু হলো হুলুস্থুল কর্মকা-। ভোটার দেখে দেখে কাউন্সিলররা বিতরণ করলেন সেইসব ত্রাণ সামগ্রী। কেউ পেলো আর কেউ থাকিয়ে থাকিয়ে দেখলো। সাথে কতো নাটকীয় ঘটনাও ঘটলো। অনিয়মের অভিযোগ আসলো সীমাহিন। ব্যাস ! এই হলেন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা!

সিলেটকে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হলো। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন অর্থাৎ করোনার ভয়ংকর চুড়ান্ত ধাপে সিলেট অঞ্চল। কিন্তু তবুও ভয় নেই আমাদের মনে। পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি। সেই সাথে শারীরিক সচেতনতার বিষয়েও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন অব্যাহতভাবে।

নগরীর ওসমানী মেডিকেল কলেজ রোডের ফ্লেক্সিলোডের একটি দোকান সকাল থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত কখনো পুরো খোলা অবস্থায়, কখনো এক শাটারে, কখনো অর্ধেক শাটার নামিয়ে ব্যবসা করছে। যখনই প্রশাসন আসছে, বা আসার খবর পাচ্ছে তখনই ভিতর থেকে বন্ধ করে বসে থাকছে, কিছুক্ষণ পর আবার ব্যবসা শুরু। এভাবেই ৪/৫ টি ফ্লেক্সিলোডের দোকান, ১টি কাপড়ের দোকান, ২/৩ টি ফটোকপির দোকান এমন করেই সরকার ও প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এটি একটি প্রতিবেদন। নগরীর লকডাউন পরিস্থিতি তুলে ধরে সিলেট প্রতিদিনের একটি সংবাদের অংশ। এমন চিত্র পুরো নগর জুড়েই। জরিমানা করেও প্রশাসনের একার পক্ষে প্রায় লকডাউন পূর্নরূপে পালন করানো যাচ্ছে না।

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা ছাব্বিশ লাখ ও মৃত্যু ছাড়িয়ে এক লাখ বিরাশি হাজার। সংক্রমণ এড়াতে মানুষকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে এলাকাকে। প্রশাসনিক নির্দেশনা বাস্তবায়নে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে প্রশাসনের লোকদের। কিন্তু এসব কাজে দেখা মিলছে না স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের। বাজারঘাটসহ বিভিন্নস্থানে সামাজিক দূরত্ব মানতেও বলছেন না তারা ভোট হারাবার ভয়ে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রয়েছে ২৭ ওয়ার্ড। এর পাশাপাশি রয়েছে সদর উপজেলা ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা। শুধুমাত্র সিসিকের এরিয়াতেই ছোট বড় প্রায় অর্ধশতাধিক হাটবাজার রয়েছে। এসব বাজারগুলোতে মানা হচ্ছেনা সামাজিক দূরত্বসহ সতর্কতা। লকডাউন ঘোষিত এলাকায় আগের মতোই চায়ের দোকানে আড্ডা জমছে। চলছে অহেতুক ঘোরাঘুরি। পুলিশসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যেপথে যাচ্ছেন তখন সেদিকের লোকজন দৌঁড়ে পালাচ্ছেন জরিমানার ভয়ে। আবার তারা আড্ডা দিচ্ছেন। সন্ধ্যার পর প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় বিরাজ করে যেন ঈদের আমেজ। এ ধরণের কর্মকান্ড থেকে জনগণকে বিরত রাখতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তেমন ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

নগরীর লালদীঘির পাড়, লালাবাজার, কাজীরবাজার, রিকাবিবাজার, শিবগঞ্জ, কাজীটুলা, আম্বরখানা, মজুমদারী ঘুরে দেখা গেছে জমজমাট পরিবেশ। আতঙ্ক উপেক্ষা করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নগরবাসী। বাজার করা, ওষুধ ক্রয়সহ বিভিন্ন অজুহাতে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ দোকানের শাটার অর্ধেক নামিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন আড্ডা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের গাড়ি দেখেই শাটার নামিয়ে বসে থাকেন কয়েক মিনিট ,পরেই আবার দোকান সাজিয়ে বসে যান। পুলিশ প্রশাসন কিভাবে কাজ করছে তা দেখতেও বাজারে ভিড় জমায় অনেক উৎসুক মানুষ।

নগরীর এক কাউন্সিলর বলেন, ‘আমরা কথা বললে গ্রামের সব মানুষ তা মানেন না। যদি জবরদস্তি করি তাহলে পরে ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। প্রশাসনের লোকজনকে তারা ভয় পায়, তাই কথা মানে।’ নগরের মত একই চিত্র শহরতলীতে। সদর উপজেলা ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় ঘুরে লকডাউন অমান্য করা ব্যবসায়ী ও জনগণের দেখা পাওয়া যায়। ‘

আমাদের এই বিপজ্জনক সময়েও নগরপতি থেকে ওয়ার্ড প্রতিনিধি কাউকেই মাঠে পাওয়া যাচ্ছেনা। সামাজিক দূরত্বের বিষয়ে নিজ নিজ ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করছেন,এমন কোনো জনপ্রতিনিধির জন্ম দিতে সত্যিই ব্যর্থ হলো সিলেট। এই ব্যর্থতার দায় বহন করবে সিলেটের প্রত্যেকটি নাগরিক। ভালো থাকুন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা !

(লেখক : দেবব্রত রায় দিপন, সিনিয়র সাংবাদিক ও সংগঠক)