Thu. Mar 4th, 2021

সামনে করোনার ছোবল, পিছালে না খেয়ে মরার চোখরাঙানি

দেবব্রত রায় দিপন : লেখাটি তখনই লিখতে বসেছি, যখন চোখের সামনে বারবার উঁকি দিচ্ছে সুদানের সেই ছবিটা। অনাহারক্লিষ্ট হাড় জিরজিরে শিশুটা মাথা নিচু করে বসে। পিছনে তাক করে রয়েছে ক্ষুধার্ত শকুন। অপেক্ষা। মৃত্যুর অপেক্ষা। বড় ভয়ঙ্কর সেই ছবি। সেই ছবির ফটোগ্রাফার কেভিন কার্টার আত্মহত্যা করেছিলেন। পুলিৎজার পুরস্কারও তাঁকে বাঁচাতে পারেনি। এমন ঘটনা দেখার পর বাঁচার ইচ্ছাটাই যে হারিয়ে যায়।

এবার আমি মূল কথায় । ১০ মে থেকে সারাদেশে নির্ধারিত সময়ের জন্য দোকানপাট খোলার অনুমতি দিলো সরকার। ঈদ মৌসুমকে সামনে রেখে অজুহাত তোলা একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে সরকার এই অনুমতি প্রদান করেন-এমনটি শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলে। সরকারি নির্দেশের পর ব্যবসায়ীদের একটি চক্র সন্তোষ প্রকাশ করলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ীর অবস্থান ছিলো অনুমতির বিপক্ষে। ফলে সারাদেশেই ব্যবসায়ীদের ঘোষণা আসতে থেকে দোকানপাট না খুলার পক্ষে। একই ভাবে সিলেটের ব্যবসায়ীরাও দফায় দফায় বৈঠক করে দোকান না খুলার পক্ষে নিজেদের অভিমত প্রকাশ করেন। এই সংবাদটি করোনাকালে খুবই স্বস্থিদায়ক এবং সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ফলপ্রসু বলে বিবেচনায় নিতে দ্বিমত থাকবেনা কারো।

কথায় বলে আয়ু যতদিন, জীবন ততদিনই। তাই জীবন সময়ে বাঁধা। তবে, জীবনের অনুভূতিগুলো পুনর্জন্মের অধিকারী। তারা জন্মায়, মরে, আবার জন্মায়। শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুখ, দুঃখ, ভালো লাগা, না লাগার মতো অনুভূতিগুলো অবস্থান বদলায়। এ সবই আবেগ নির্ভর। আবেগ মহাশক্তিধর হলেও আয়ু বড়ই কম। আবেগ অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। মাঝসমুদ্রে তৈরি হয়, ভাঙে, আবার তৈরি হয়। তীরে আছড়ে পড়লে ঢেউ হয়ে যায় ফেনা। চোখের পলকে শুষে নেয় বালুকাবেলা। প্রবল শক্তিধর হলেও ঢেউয়ের এটাই পরিণতি। মানুষের আবেগ শুষে নেয় কঠিন বাস্তব। তফাৎ একটাই। জলরাশির প্রাচুর্যে ভরপুর সমুদ্রের ঢেউ সৃষ্টির ক্ষমতা অসীম। কিন্তু, আবেগ সীমায় বাঁধা। তাই সে মানুষকে বেশি দূর ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। বাস্তবের রুক্ষভূমি শুষে নেয় আবেগ। আবেগহীন মানুষ হারায় মানবিকতা, উদারতা। করোনা বিরোধী লড়াইয়ে সেটাই বড় চিন্তার, বড় ভাবনার।

এই মুহূর্তে করোনা মোকাবিলায় দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আবেগ। আবেগের ধাক্কায় উন্মুক্ত হয়েছে হৃদয়। তাই বহু মানুষ সাধ্যের বাইরে গিয়েও বাড়িয়ে দিচ্ছেন সাহায্যের হাত। নিরন্নের মুখে যুগিয়ে চলেছেন অন্ন। সরকারও চেষ্টা চালাচ্ছে সাধ্যমতো। মানুষ আজ আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছে ‘মানবসম্পদ’। আবেগই সেই সম্পদ রক্ষার মাপকাঠি। লড়াই করোনার বিরুদ্ধে। লড়াই ক্ষুধার বিরুদ্ধে। সৌভাগ্য, লকডাউনের এতোদিন পরেও না খেয়ে মারার মর্মান্তিক ঘটনা সামনে আসেনি। গরিবের পকেটে টানাটানি চললেও টান পড়েনি খাবারে। কারণ শুধু অর্থবানরাই নয়, বুভুক্ষু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সহায় সম্বলহীন মানুষও। আবেগের তাড়নায় অন্যের দুঃখ মোচনে ঢেলে দিচ্ছেন জীবনের সঞ্চয়। কিন্তু, তাঁরা তো সেই সীমাতেই বন্দি।

লম্বা ইনিংস খেলার প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছে মারণ ভাইরাস করোনা। সে মারণখেলার নেশায় মত্ত। তার শেষ কোথায়, জানা নেই কারও। তবে, লড়াই যে অনেক বাকি, জেনে গিয়েছেন সবাই। মধ্যবিত্তের ধন ঘড়ার জলের মতো। গড়াতে শুরু করলেই পড়ে টান। আর তখনই বাস্তবের রুক্ষমাটিতে ধাক্কা খায় আবেগ। কঠিন লড়াই তখনই হয় কঠিনতম। সরকারি সাহায্যই তখন গরিবগুর্বোদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। রেশন ব্যবস্থাই হবে দরিদ্রসীমার নীচের মানুষগুলোর প্রাণভোমরা।

লকডাউনের মেয়াদ যেভাবে দফায় দফায় বাড়ছে, তাতে শতকরা ৮০ভাগ মানুষই দ্রুত এগচ্ছে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে। অবস্থাটা এখন শাঁখের করাতের মতো। সামনে গেলে করোনার ছোবল, পিছনে থাকলে না খেয়ে মরার চোখরাঙানি। টকের জ্বালায় পালিয়ে ঘর বাঁধতে হচ্ছে সেই তেঁতুলতলাতেই।

গণবণ্টন ব্যবস্থাকে আরও শৃঙ্খলিত করতে হবে। মেরামত করতে হবে ফাঁকফোকর। আর সেই কাজটা সেরে ফেলতে হবে এখনই। কড়া হাতে। কারণ নগর এলাকায় এখনও বহু রেশন নিয়ে চলছে লোকুচুরি। ফায়দা লোটার চেষ্টায় আছেন আরো একটি দল। এই চিত্র সারা সিলেট নগরীতে। গরিবের জন্য বরাদ্দ রেশনের চাল, আটা চুরি করে বিক্রি করছে খোলাবাজারে। করোনা গোটা বিশ্বটাকে বদলে দিলেও এই মানুষগুলোকে বদলাতে পারল না। কাঙালের গ্রাস কেড়ে বড়লোক হওয়ার প্রবৃত্তিটা থেকেই গেল।

এভাবে চললে মানুষের ক্ষোভ যদি আছড়ে পড়ে, দায় নেবে না প্রশাসন। জেলাশাসক মুখে যাই বলুন না কেন, অশান্তি ঠেকানোর দায় প্রশাসনকেই নিতে হয়। ক্ষোভের জন্য ব্যক্তিগত লোভ, লালসা দায়ী হলেও আঙুল ওঠে সেই সরকার ও প্রশাসনের দিকেই। কারণ মানুষের কাছে রেশন সরকারি ব্যবস্থার একটা অঙ্গ।

লেখক : দেবব্রত রায় দিপন, সিনিয়র সাংবাদিক ও সংগঠক