Wed. Jul 8th, 2020

করোনাঃ মানবিকতার বর্ম পরে মাঠে আছে বাংলাদেশ পুলিশ

ফারহানা বেগম হেনাঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নিজের কাঁধে বহন করে গরিব জনগোষ্ঠীর কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। মহামারী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় মার্চ থেকে শুরু হয়ে মে মাস অবধি চলা দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর এ এক ভিন্ন মানবিক পরিচয় দেখতে পাচ্ছি আমরা।

উল্লেখ্য, সদ্য দায়িত্ব প্রাপ্ত আইজিপি মহোদয় জানিয়েছিলেন,করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বুদ্ধিমান নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী যথাসম্ভব কাজ করছে। তার বাহিনী এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

তিনি আরও বলেছিলেন পুলিশ বাহিনী নাগরিক সেবায় জীবন দিতেও পিছুপা হবে না।

করোনার ধাক্কায় গোটা বিশ্ব যখন দিশেহারা তখন বাংলাদেশ পরিস্থিতি সামলে চলেছে দৃঢ়চিত্তে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩১ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ২৪ মার্চ থেকে দিনরাত কাজ করছেন। দেশের মানুষকে বাসায় ঢুকিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ সচেতনতামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তারা।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংবাদ পাওয়ার পর শেখ হাসিনা দ্রুত নানামুখি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি দেয়া, দেশের বিভিন্ন স্থান লকডাউন করা, একাধিক দফায় সরকারি ছুটি বাড়িয়ে ১৬ মে করা, করোনাভাইরাস আক্রান্তদের জন্য টেস্টের আওতা বৃদ্ধি, সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি, লোকজনকে নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করানো, কোয়ারেন্টাইনে রাখতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ত্রাণ বিতরণ- এসব পদক্ষেপ ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে জরুরি ছিল।

এছাড়া বিগত ২৪ মার্চ থেকে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য সেনাবাহিনী নামানো ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীর প্রায় তিন হাজার এবং নৌবাহিনীর ৪০০ সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে বিমান বাহিনী মেডিকেল এইডের কাজ করছে।

সেসময় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) থেকে জানানো হয়,জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী করোনাভাইরাস সংক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাব্যবস্থা, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে। বিশেষ করে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের কেউ নির্ধারিত কোয়ারেন্টিনের বাধ্যতামূলক সময় পালনে ত্রুটি/অবহেলা করছে কিনা, তা পর্যালোচনা করবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা স্থানীয় আর্মি কমান্ডারের কাছে অবস্থা পর্যালোচনার জন্য আইন অনুসারে সেনাবাহিনীর কাছে অনুরোধ জানাবেন। নৌবাহিনী উপকূলীয় এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় কাজ করবে। বিমানবাহিনী হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী ও জরুরি পরিবহন কাজে নিয়োজিত থাকবে।

আমরা অনেকে মনে করতাম পুলিশ বাহিনী জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে, মনে করতাম, তাদের কাজ শান্তি স্থাপনের জন্য কঠোর হস্তে বিশৃঙ্খলা দূর করা এবং বন্দুক উঁচিয়ে সবসময় জনগণকে শাসন করা। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমরা দেখতে পেলাম, পুলিশ বাহিনী ২৪ মার্চ থেকে গ্রামে-গঞ্জে, মাঠে-বাজারে মাইকিং করছেন জনগণকে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করার জন্য, সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরিয়ে সাহায্য করছেন। অস্ত্র উঁচিয়ে নয় বরং নিজের জীবন বাজি রেখে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে মানুষের জীবন বাঁচাতে দায়িত্ব পালন করছেন।

পুলিশ সদস্যরা সারা দেশেই করোনাভাইরাস সম্পর্কিত জনসচেতনতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছেন। প্রত্যন্ত এলাকায় উপস্থিতি হয়ে যাদের হোম কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে থাকার কথা তাদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন। সামাজিক দূরত্ব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে মাঠে-ঘাটে সার্বক্ষণিক তদারকিতে আছেন। সাধারণ জনগোষ্ঠীকে মাইকিং করে নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ বিবিধ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনুরোধ জানাচ্ছেন।

কোনো এলাকায় রোগে আক্রান্তদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানে যেমন সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করে দিয়েছেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যাক্তির দাফন জানাযাসহ, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার জন্য তাদের তরফ থেকে জীবাণুনাশক ছিটানো হচ্ছে। আসলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী কেবল আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে দৃষ্টি দেননি তারা স্থানীয় প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। যেমন দুস্থদের ত্রাণ কাজে অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য সহযোগিতা করছেন তেমনি কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে কিংবা শাস্তি যোগ্য অপরাধ করলে তা ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে তাৎক্ষণিক বিচার করে শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে।

চরাঞ্চল কিংবা পাহাড়ি উপত্যকায় বাজার চালু রাখা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, গরিবদের মধ্যে খাবার বিতরণে সহায়তা করা, বিভিন্ন ধরনের গুজব ও অসত্য তথ্য যাতে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার কাজও তাদের করতে হচ্ছে।

আমাদের দেশে প্রায় ১৫ হাজার আক্রান্ত হওয়ায় করোনা পরিস্থিতির ব্যাপক বিস্তার রোধে কাজ করছেন পুলিশ বাহিনী। আসলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাসমূহের সঙ্গে জনসাধারণের আন্তরিক অংশগ্রহণকে সম্ভব করে তুলছেন পুলিশ সদস্যরা।

একথা সত্য সাধারণ মানুষের মাঝে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি ও সহায়তার কারণে গণ- মনস্তত্ত্বে স্বস্তি এসেছে। কারণ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশজুড়ে কাজ করায় আইন-শৃঙ্খলারও উন্নয়ন ঘটেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেমন সেনাবাহিনী, চিকিৎসক, নার্সসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মী করোনা মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তেমনি পুলিশ সদস্যরা নিজের পরিবারকে পেছনে ফেলে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন।

আগেই বলেছি, আইজিপি মহোদয়ের নির্দেশনায় তারা কাজ করছেন। এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা কাঁধে করে খাদ্য সহায়তা নিয়ে মানুষের বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসছেন। আর সেটাও নিজেদের রেশনের থেকে অর্থ বাঁচিয়ে। ত্রাণ বিতরণকালে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে মাইকিং করে বলা হয়, ঘর থেকে কেউ বের হবেন না,সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। আমরা আপনাদের সবার ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেবো, ঘর থেকে বের হলে ত্রাণ দেয়া যাবে না।

পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বে নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক অভিনব প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প হলো, খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং খুলনার ডিসির উপস্থিতিতে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মিত ডিসইনফেক্টিং টানেল শহরের শের-এ-বাংলা রোডে উদ্বোধন করা হয়।

মহামারী মোকাবেলায় গত দু’মাস যাবত সরকারের সঙ্গে ফ্রন্টলাইনে আছেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। মানবতার টানে অতীতের সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই নির্ভীকচিত্তে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী।

এছাড়াও বিভিন্ন শহরের প্রবেশদ্বারে স্থাপনকৃত পুলিশ চেক পোস্ট অতিক্রম করার সময় প্রতিটি মানুষকে স্বাস্থ্য ক্যাম্পে নিয়ে শরীরের তাপমাত্রাসহ করোনার নানা উপসর্গ পরীক্ষা করছেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় করোনার ঝুঁকি কিংবা ভাইরাস শনাক্ত হলে ওই ব্যক্তির তথ্য তার নিজের জেলার ডিসিকে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এজন্যে তার ছবি তুলে রাখাসহ জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংরক্ষণ করছেন তারা। এছাড়া অসহায় মানুষদের চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব, হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতকরণ ছাড়াও গণপরিবহন চলাচল, ত্রাণ বিতরণ, অসহায় কৃষকদের ক্ষেত থেকে সবজি ক্রয় এবং দুস্থ কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন প্রকার শস্য/সবজি বীজ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।

করোনা মোকাবেলায় সম্পূর্ণ পেশাদারী মনোবৃত্তির অধিকারী বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ভিন্ন এক মানবিক পরিচয় দেখছে আজ দেশবাসী। করোনার বিরুদ্ধে চলতি লড়াইয়ে সামনে আছেন তারা। মানবিকতার বর্ম পরে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন তারা।

ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী, পাশে থাকুন এভাবেই। আসলে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত এবং যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় পারঙ্গম আমাদের পুলিশ বাহিনী সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বলেই মহামারীতে দিশেহারা ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় এখনও অনেক ভালো অবস্থায় আছি আমরা।