Wed. May 27th, 2020

অসহায় মানুষের পাশে রাত-দিন ছুটে চলছে সফি আহমদ

ফারহানা বেগম হেনাঃ কখনো দিনের আলোয় আবার কখনো রাতের আঁধারে চলছে ত্রান তৎপরতা। অসহায় মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত এমন-কি করোনায় আক্রান্তদেরও দিয়ে যাচ্ছেন ত্রাণ সহায়তা। করোনাভাইরাসের শুরুর দিক থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট নগরীর এক যুবকের এই কার্যক্রম চোখের সামনে দৃশ্যমান। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এই যুবকের নামের সাথে যুক্ত করেছেন ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’। ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেয়া এই যুবকের নাম সফি আহমেদ।

জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাসের প্রথম দিক থেকে নিজ এলাকার মানুষকে সচেতন করতে কাজ শুরু করেন এই যুবক। প্রথমে নিজ এলাকা কুলাউড়াতে জীবাণুনাশক স্প্রে করেন বেশ কয়েকদিন। তার পর নগরীর দোকানপাট বন্ধ ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুরু করেন এই যুবক। কুলাউড়াতে এই র্কাযক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সিলেট শহরের ওলি গলিতে দিন রাত ছুটে চলেছেন তিনি। কবে এর শেষ এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি বলেন, চলমান এই শঙ্কট শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলবে তার এই কার্যক্রম।


সমাজসেবাইয় নিয়োজিত এই যুবকের আরেকটি পরিচয়ও রয়েছে। মো. সফি আহমদ একজন পুলিশ সদস্য। সিলেট মহানগর পুলিশের নায়েক পদে কর্মরত। বর্তমানে তিনি মহানগর পুলিশের মিডিয়া ও কমিউনিটি সার্ভিস বিভাগে কর্মরত আছেন।

তার এই কার্যক্রম দেখে দেশ-বিদেশের অনেক পরিচিতরা আরো উৎসাহ দিতে গিয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছেন সাহায্যের হাত। অনেকে তার কাছে পাঠাচ্ছেন টাকা-পয়সা। সেই টাকা দিয়ে তিনি মানুষকে দিয়ে যাচ্ছেন ত্রান সহায়তা। এ পর্যন্ত সবমিলিয়ে হাজারেরও বেশি পরিবারে পৌঁছে দিয়েছেন ত্রাণ।

সমাজসেবায় নিয়োজিত এই যুবকের উদ্যোমী কার্যক্রম দেখে ফেসবুকে তাকে অনেকেই আখ্যা দিচ্ছেন `মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে। কারণ হিসেবে জানা গেছে, সেহরির সময়ও ফোন পেয়ে নিজের বাসায় রান্না করা খাবার বক্সে ভরে নিয়ে দিয়েছেন অনেক পরিবারে। এমন প্রশংসনীয় কাজে তার নামের পাশে মানবতার ফেরিওয়ালা শব্দটি বেশ মানায় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যক্তি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সফি আহমেদ জানান, আগামী ঈদে মধ্যবিত্ত ও অসহায় পরিবারে ঈদ উপহার পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

সকল সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে এ দেশের কোন মানুষ না খেয়ে থাকবে না বলে মন্তব্য এই যুবকের। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি বিত্তবানদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় গোটা বিশ্ব এখন দিশেহারা। সংক্রমণরোধে সর্বত্র চলছে লকডাউন। দোকানপাট বন্ধ। কর্মহীন হয়ে পড়ায় নানাবিধ সংকট বাড়ছে।নিম্নবিত্ত তো বটেই মধ্যবিত্তরাও সংকটে পড়েছেন। কারো কাছে হাত পাততেও পারছেন না অনেকে। এই পরিস্থিতিতে মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে দিনরাত সিলেটের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে চলেছেন একজন সফি আহমদ। সাধ্যমতো সহায়তা তুলে দিচ্ছেন দুর্দশাগ্রস্থ পরিবারের হাতে। অনেকটা নীরবে-নিভৃতে তিনি এই তৎপরতা চালালেও ইতোমধ্যে তিনি ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।

মো. সফি আহমদ একজন পুলিশ সদস্য। তার বাবা ছিলেন দেশের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরদিন থেকেই মূলত তিনি কাজ শুরু করেন। প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন শেষে নিজের মোটর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের খোঁজে। গরীব ও অসহায় মানুষের ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন মো. সফি আহমদ। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে প্রতিদিন মোটরসাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন তিনি।

সফি আহমদের পথচলা শুরু গল্পটাও অন্যরকম। প্রথমে নিজের দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতা করার আগ্রহ থেকেই তিনি পথে নামেন। কিন্তু যখন দেখেন সংকট সর্বত্র তখন তিনি আর নিজের মধ্যে তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখতে পারেননি। যেখানেই দুর্দশাগ্রস্থ মানুষ দেখেছেন সেখানেই বাড়িয়ে দিয়েছেন সহযোগিতার হাত। তাঁর এই তৎপরতা সহজেই সকলের নজর কাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রশংসায় ভাসতে থাকেন সফি আহমদ। অনেকেই তাঁকে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অফিসের ডিউটি করেন। তারপর মোটরসাইকেল বেরিয়ে পড়েন খাদ্যসামগ্রী বিতরণে।

এই উদ্যোগ শুরু সম্পর্কে সফি আহমদ বলেন, প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হতে চাই-শিরোনামে নিজের মোবাইল নাম্বার দিয়ে একটা পোস্ট করি। তখন অবশ্য টাকার বিনিময়ে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। যাতে মানুষজন বাসায় থাকেন। তবে যতগুলো ফোন আসে সবাই ফোন দিয়ে জানায় তাদের কাছে খাবারের কিছু নেই হাতে টাকাও নেই। তখন থেকে বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে আসছি।

তিনি জানান, গত ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে এসবিসি নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ৫০টা পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন তিনি। এরপর থেকে আজ অবধি ব্যাক্তিগত উদ্যোগে প্রতিদিন সিলেটের বিভিন্ন পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দিচ্ছেন। নিজের অফিসের দায়িত্ব পালন শেষ করে মোটরসাইকেলে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ছুটে চলেন গরীব অসহায়দের ঘরে। তবে তার এই উদ্যোগে শুধু গরীব অসহায়রা সাহায্য পাচ্ছেন তা নয়। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সাহায্য নিচ্ছেন।

সফি আহমদ জানান, তাঁর বাবা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমানে তিনি বেঁচে নেই। বাবার মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা, পেনশনের টাকা, পরিবারের সদস্য, পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ,সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে পাওয়া সাহায্য থেকেই তিনি এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।এই কার্যক্রম চালাতে গিয়ে তাকে কিছুটা ঋণগ্রস্থও হতে হয়েছে। এছাড়া সিলেট মহানগর পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাসহ সবাই আর্থিক সহযোগিতাসহ সবধরণের সহযোগিতা করছেন বলেও তিনি জানান।

সফি আহমদ জানান, প্রতিদিন প্রায় ১০- ১৫টা পরিবারের কাছে এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন তিনি। এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ ২৮টি পরিবারের কাছে এসব বিতরণ করেছেন। খাদ্যসামগ্রী মধ্যে আছে চাল, ডাল ,তেল, আলু, পেঁয়াজ, সাবান ও বাচ্চাদের জন্য একটি চিপস। তবে কারোর চাহিদা অনুযায়ী কোনো কোনো প্যাকেটে দুধ ও মশলাও দেওয়া হয়।

তিনি জানান, শুধু সিলেটে না, নিজের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়ও দুই বন্ধুর সাহায্যে ১০০ পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। রমজান মাসে সিলেটে খাদ্যসামগ্রীর পাশাপাশি ইফতারও বিতরণ করছেন তিনি।

সফি আহমদ জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনি অফিসের ডিউটি করেন। তারপর মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার প্রথম থেকেই আমাক সাহায্য করে আসছে। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন উনার ভাতা, পেনশনের সব টাকা এই উদ্যোগে দেন আমার মা। তার সঙ্গে আমার ভাই পুলিশের এসআই সুহেল অর্থ থেকে শুরু করে সব ধরণের সহযোগিতা করছেন। এছাড়া আমার বন্ধুরাও আমাকে অনেক সাহায্য করছে। তাদের সবার কাছে আমি সারাজীবন ঋণী থাকব।

এই সংকটকালীন সময়ে সমাজের সবাইকে সাধ্যমত এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন যতদিন এই দুর্যোগ চলবে আমি এভাবে মানুষের পাশে থাকতে চাই। এই কাজ করতে গিয়ে আমি কিছুটাকা ঋণে পড়েছি কিন্তু মানুষের হাসির কাছে এসব কিছুই নয়। তিনি বলেন সকলের সহযোগিতা পেলে আমি যে কোন কাজ হাসি মুখে করতে পারি আপনারা সবাই এগিয়ে আসলে আমাদের দেশের কোন লোক না খেয়ে থাকবেনা ইনশাহ আল্লাহ আপনারা সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন যেনো মরার আগ র্পযন্ত মানুষের জন্য ভালো কাজ করে যেতে পারি।