Sat. Sep 19th, 2020

কল পেয়ে ত্রাণ পাঠালেন এসপি ফরিদ উদ্দিন

ডেইলি বিডি নিউজঃ বাহরাইন প্রবাসী এক ব্যক্তির স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানের পরিবার থাকে সিলেট শহরের একটি মহল্লায়। সিলেটে লকডাউন ঘোষণার দিনই বিপাকে পড়ে পরিবারটি। সব দোকানপাট বন্ধ। ঘরে বাজারসদাই কিছুই ছিল না। কোনো উপায় না পেয়ে বাহরাইন থেকে ওই প্রবাসী ব্যক্তি সরাসরি সিলেটের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিনের মুঠোফোনে কল করে সহায়তা চান। ঠিকানা নিয়ে তাৎক্ষণিক খোঁজ করে সত্যতা পেলেন পুলিশ সুপার। পরে তিনি চাল, ডাল, আলুসহ নিত্যপণ্যের একটি প্যাকেট পৌঁছে দেন ওই প্রবাসীর বাড়িতে।

শুরুটা এভাবেই। গত ১২ এপ্রিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে তখন সিলেট জেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। অনেক পরিবার হঠাৎ অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে পড়ে। ওই দিনই ফেসবুকে একটি মুঠোফোন নম্বর দিয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কথা জানায় সিলেট নগর পুলিশ। এরপর থেকে ফোন পেলেই সংশ্লিষ্ট পরিবারে খাবার ও ত্রাণ পৌঁছে দিয়ে আসছে তারা।

গত ১২ মে এই উদ্যোগের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। পুলিশ সুপারের দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে এক মাসে ফোন কলের মাধ্যমে অন্তত ১৫ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রবাসী, মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সংখ্যাই বেশি।

মুঠোফোন কল পেয়ে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি সমন্বয় করছেন সিলেট জেলার ১১টি থানা এলাকায় কর্মরত অন্তত দুই হাজার পুলিশ সদস্য। এক উদ্যোগে পুলিশ যেন ‘ত্রাতা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে

শুরুটা যেখান থেকে হয়েছিল, সেই বাহরাইন প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি ওই সময়ের সহায়তা জীবনেও ভুলতে পারবেন না বলে জানান। প্রবাসীর স্ত্রী বলেন, ‘ঘরে ওই দিন কিছুই ছিল না। সন্তানদের নিয়ে অভুক্ত থাকার উপক্রম হয়েছিল। সত্যিই পুলিশ ত্রাতা হয়ে এসেছিল সেদিন।’

পুলিশ সুপার যে মুঠোফোন নম্বরটি (০১৭৬৯-৬৯২৯৭৮) খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিতে ফেসবুকে দিয়েছিলেন, সেটি অন্যান্য কর্মকর্তা ও থানা-পর্যায়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মুঠোফোন নম্বরটি ২৪ ঘণ্টা খোলা একটি ‘হটলাইন’ হিসেবে প্রচার করা হয়। ১২ এপ্রিল থেকেই মুঠোফোনে কল পেয়ে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যা এখনো চলমান রয়েছে। পুলিশ সুপারসহ কর্মকর্তাদের কল্যাণ তহবিলের টাকা খাদ্য সহায়তায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, একটি কল এলে তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকানা নিয়ে দিনের বেলা সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ সদস্যদের দিয়ে খোঁজ করা হয়। সত্যতা পাওয়া গেলে একটি তালিকা করে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয় রাতে। এর মধ্যে পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুপাতে ১০ কেজি থেকে শুরু করে ২০ কেজি চালসহ নিত্যপণ্য দেওয়া হয়। পাশাপাশি করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রচারপত্র, সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারও দেওয়া হয়।

মুঠোফোনে কল পেয়ে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বেশি সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায়। এর মধ্যে ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, কানাইঘাট রয়েছে। গরিব ও অসহায় পরিবার বিবেচনায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ ও জৈন্তাপুর থানা এলাকায়। ওই সব এলাকায় বসবাস করা বেদে সম্প্রদায়, নৃতাত্ত্বিক, হিজড়া জনগোষ্ঠী ও পাথরশ্রমিক পরিবারের মধ্যে পুলিশ সুপার নিজে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন।

জৈন্তাপুরের সারীঘাটে বেদে পরিবার ও মোকামপুঞ্জি এলাকায় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর আড়াই শতাধিক পরিবারকে এভাবেই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক পাশে লামাকাজি এলাকায় বেদে পল্লিতে গিয়ে ১৫০টি পরিবারের তালিকা করে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে মাস্কবিহীন পথচারীদের মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে।

ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) রফিকুল ইসলাম বলেন, এমন সব পরিবার থেকে সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যাঁরা সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা নিতে সামাজিক কারণে দ্বিধায় থাকতেন। তাঁদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে রাতের বেলা। আর কর্মহীন অসহায় মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে দিনের বেলা। মুঠোফোন নম্বরে কল দেওয়া পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া হয় কি না সেটা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

কোম্পানীগঞ্জের পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, আমাদের এলাকায় তিনটি পাথর কোয়ারি আছে। এ জন্য পাথর শ্রমিক পরিবার বেশি। এসব পরিবারে ঠিকমতো খাদ্য সহায়তা পেয়েছে কি না সেটা পুলিশ সুপার বা সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে নিশ্চিত হন। তাই এ কার্যক্রম আক্ষরিক অর্থেই সহায়ক হচ্ছে।

যত দিন এমন পরিস্থিতি থাকবে, তত দিন এই সহায়তা অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছেন সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ব্যক্তিগত ও কর্মকর্তাদের কল্যাণ তহবিল থেকে এই কাজটি করছি। ফেসবুকে এই কার্যক্রম দেখে অনেক প্রবাসী ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি আমাদের অর্থ সহায়তা দিতে আগ্রহ জানিয়েছেন। আমি তাঁদের সবিনয়ে বলেছি, এটা সম্পূর্ণ আমাদের উদ্যোগ। যত দিন পারি আমরা সাধ্য মতো চালিয়ে যাব। আপনারা আমাদের সহায়তা না করে নিজ থেকে এভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন।

এই কার্যক্রমের এক মাস পূর্ণ হওয়ার বিষয়ে এসপি ফরিদ উদ্দিন বলেন, এখন সহায়তা চাওয়ার সংখ্যা কমে এসেছে। আগে দিনে প্রতিটি থানা থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি কল আসত। এখন কমে ১৫ থেকে ২০ টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ হিসেব তিনি বলেন, গ্রাম এলাকায় বোরো ধান উঠে গেছে। এতে অনেক গৃহস্থ পরিবার প্রতিবেশীদের নানাভাবে সহায়তা করছে। এ জন্য হয়তো খাদ্য সহায়তা চাওয়ার সংখ্যাও কমছে। তবে যত দিন খাদ্য সহায়তা চাওয়া হবে, তত দিন তা দেওয়া অব্যাহত থাকবে।