Mon. Jun 1st, 2020

মানুষের পাশেই আছে মানবিক পুলিশ

ডেইলি বিডি নিউজঃ অনেকেই করোনা নিয়ে সচেতন নন। যার যার জায়গা থেকে আরও সচেতন থাকা দরকার। সুস্থ হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে ব্যারাকে ফিরে এসেছি। আবার কাজে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় আছি।’- করোনাজয়ী পুলিশ কনস্টেবল মুকুল মিয়ার উপলব্ধি এমনই। তিনি কর্মরত আছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিকের পশ্চিম বিভাগে। থাকেন মিরপুর-১৪ নম্বর পুলিশ লাইন্স ব্যারাকে। মুকুলের মতো দেশব্যাপী শত শত পুলিশ সদস্য করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত পুলিশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার ১৪১ জনে পৌঁছেছে। এখন পর্যন্ত মারা গেছেন সাতজন। উপসর্গ নিয়ে প্রাণ গেছে আরও কয়েকজনের। ব্যারাককেন্দ্রিক জীবনে একসঙ্গে বসবাসের বাস্তবতাই পুলিশকে করোনা সংক্রমণের তীব্র ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। এর পাশাপাশি পুলিশের দায়িত্ব পালনের যে ধরন সেটাও তাদের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে তুলছে। করোনা প্রতিরোধের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলানো নিয়ে ত্রিমাত্রিক চ্যালেঞ্জেও রয়েছে পুলিশ বাহিনী। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে পুলিশ যেভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে তাকে মানবিক পুলিশের এক নতুন প্রতিচ্ছবি বলছেন অনেকেই।

পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশ পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়েও কাজ করেছে। মানবিক বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের জন্য এই বাহিনী ঝুঁকি নিয়েছে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পুলিশ প্রথমে অস্ত্র ধরেছিল। এই বাহিনী মাটি থেকে উঠে এসেছে। কাদামাটির অংশ হয়ে তারা জনগণের সঙ্গে মিশে আছে। আর তাই কমিউনিটির উপলব্ধি তারা সবার আগে বুঝতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান,পুলিশে করোনা সংক্রমিতদের মধ্যে এক হাজার ৪১ জনই ডিএমপির। কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন তিন হাজার ১১৩ জন। আইসোলেশনে রয়েছেন এক হাজার ১৭১ জন। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ২৩৭ জন।

চলতি বছরের শুরুতে পুলিশ সপ্তাহ-২০২০ পালিত হয়েছিল। মুজিববর্ষে এবারের পুলিশ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার। করোনাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ যেভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে তাতে এটা বলা যায়- পুলিশ সত্যিকার অর্থেই জনতার পুলিশ হয়ে উঠেছে।

করোনাজয়ী কনস্টেবল মুকুল মিয়া জানান, তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালবাড়ীর গঙ্গানন্দপুর। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার পরিবার। তারা থাকেন গ্রামে। এপ্রিলের শুরুর দিকে একদিন ডিউটি শেষে ব্যারাকে ফেরার পর থেকেই তার জ্বর ও গলাব্যথা শুরু। এর সঙ্গে শুরু হয় বমি। প্রথমে কয়েকদিন প্যারাসিটামল খান। এরপরও অবস্থার পরিবর্তন না দেখে নমুনা পরীক্ষা করান। ১৩ এপ্রিল জানতে পারেন তিনি করোনায় আক্রান্ত। ওইদিন একই ব্যারাকের আরও দু’জনের নমুনা পরীক্ষার রেজাল্ট পজিটিভ আসে। এরপর রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি হন মুকুলসহ অন্যরা।

মুকুল জানান, ১৪ দিন হাসপাতালে থাকার পর নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ আসার পর বাড়ির লোকজন তাকে দেখতে ঢাকায় আসতে চেয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে মুকুল তাদের আসতে নিষেধ করে দেন। হাসপাতাল ছাড়ার পর প্রথম সাত দিন মিরপুর পুলিশ স্মৃতি কলেজে আইসোলেশনে ছিলেন। আইসোলেশন শেষে আবার ব্যারাকে ফিরে যান তিনি।

পুলিশের মধ্যে যারা করোনায় আক্রান্ত তাদের মধ্যে অনেকেই বাহিনীর পরিবহন পুলের সদস্য। ডিউটি করতে গাড়ি চালিয়ে নানা প্রান্তে ছুটতে হয় তাদের। তাই সংক্রমণের অধিক ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা। পরিবহন পুলের সদস্য করোনা আক্রান্ত কনস্টেবল মনির হোসেন জানান- পুলিশের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে সর্বপ্রথম রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি হন। ৪ এপ্রিল ফোর্স নিয়ে দয়াগঞ্জ, মিলব্যারাক এলাকায় ডিউটিতে যান তিনি। ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার পর গলাব্যথা ও জ্বর জ্বর ভাব দেখা দেয়। ৮ এপ্রিল নুমনা দেন পরীক্ষার জন্য। ১১ এপ্রিল রিপোর্ট পান করোনা পজিটিভ। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর এখন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

মনিরের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে। পরিবার নিয়ে রাজধানীর বাসাবোতে থাকেন। তিনি জানান, নিজে করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের অন্যদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। বড় মেয়ে মায়মুনা খাতুনের (১১) কয়েকদিন গলাব্যথা থাকলেও এখন সেরে গেছে। বাড়ির আর কারও উপসর্গ না থাকায় নমুনা পরীক্ষা করানো হয়নি।

পুলিশের সবচেয়ে বড় ইউনিট ডিএমপি। এখানে প্রায় ৩৪ হাজার ফোর্স। সব মিলিয়ে পুলিশের সদস্য সংখ্যা দুই লাখ ১২ হাজার। এর মধ্যে ক্যাডার অফিসার প্রায় সাড়ে তিন হাজার। পুলিশে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকায়। আর পুলিশের সব ইউনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ডিএমপির ৯০৭ জন।

রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল ছাড়াও ইমপালস হাসপাতাল, ট্রাফিক ব্যারাক চিকিৎসা কেন্দ্র ও রাজারবাগ স্কুুল অ্যান্ড কলেজকে রিকভারি সেন্টার করা হয়েছে। উপসর্গ থাকা এমনকি করোনা আক্রান্তদের সংস্পর্শে ছিলেন এমন পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন পুলিশ লাইন্স থেকে সরিয়ে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল, দিয়াবাড়িতে প্রস্তাবিত পুলিশ লাইন্সের অস্থায়ী ক্যাম্প, রায়েরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি, ডিবি ব্যারাকসহ ৩৫-৪০টি পৃথক জায়গায় রাখা হয়েছে। ৫০ বছরে বেশি বয়সের সদস্যদের খুব প্রয়োজন না হলে থানার বাইরে ডিউটিতে পাঠানো হচ্ছে না। তিন বা কোথাও চার ধাপে ভাগ করে ফোর্সদের ডিউটি করানো হচ্ছে। যাতে এক গ্রুপ সংক্রমিত হলেও অন্যরা মুক্ত থাকেন। অসুস্থ পুলিশ সদস্যদের দেখাশোনার জন্য গঠন করা হয়েছে ‘বিশেষ টিম’। ঢাকায় একাধিক হাসপাতাল ছাড়াও বিভাগীয় শহরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বেসরকারি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

পুলিশের কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগের এসআই শিবলু হাসান জানান, ৩ মে থেকে টানা ১৪ দিন সেগুনবাগিচা উচ্চ বিদ্যালয়ে কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন তিনি। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে তার পাশের একজন সংক্রমিত হওয়ার পর তাকে সেগুনবাগিচায় কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন শেষে আবার রাজারবাগে ফিরে এসেছেন।

কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি ড. হাসানুল হায়দার বলেন, রাজারবাগ হাসপাতালে ৭৮০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। এখন পুলিশে সুস্থ হওয়ার হার বাড়ছে। এটা ভালো লক্ষণ।

পুলিশের এত বেশি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, পুলিশকে যে পরিবেশে কাজ করতে হয় সেটাই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। আক্রান্ত মানুষের কাছাকাছি গিয়েও তাদের কাজ করতে হয়। অধিকাংশ পুলিশ সদস্য কাজ শেষে একটা বড় সময় ব্যারাকে কাটাচ্ছেন। সেখানে একসঙ্গে অনেককে খুব কাছাকাছি থাকতে হয়। বর্তমান বাস্তবতায় পুলিশকে করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাস্তা-ঘাটে, যেখানে-সেখানে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বেশি মেশার কারণেই তারা সংক্রমণের বাড়তি ঝুঁকিতে পড়েছে।

ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, করোনা পরিস্থ্থিতিতে পুলিশ নানামাত্রিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। লকডাউন যেন সবাই মানে- সেটা দেখভাল করতে হচ্ছে পুলিশকে। ত্রাণ দিচ্ছে পুলিশ। অন্য সংস্থা ত্রাণ দিলে সেখানে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয় দেখতে হচ্ছে। মৃতদেহের সৎকার করছে। করোনা রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছে। মাঠে থেকে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলেই পুলিশ সদস্যরা বেশি সংক্রমিত হচ্ছেন।

সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে পুলিশে জনবল বাড়লেও আবাসন ব্যবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। গাদাগাদি করেই ব্যারাকে ও মেসে থাকতে হয় পুলিশ সদস্যদের। অধিকাংশ ইউনিটে থাকা, রান্না করা ও টয়লেটের অবস্থা ভালো নয়। এসব ব্যাপারে উন্নতির দিকে মনোযোগী হওয়া দরকার বলে মনে করেন তারা।

সৌজন্যেঃসমকাল