Mon. Jun 1st, 2020

আমি আইসোলেশন থেকে বাধ্য হয়ে কথাগুলো লিখলাম…

ডেইলি বিডি নিউজঃ গত ২১ দিন যাবত করোনা (Covid-19)-শনাক্ত হয়েও কেন কারো সাথে শেয়ার করিনি তা আমার লেখা পড়লেই বুঝতে পারবেন।

গত ২৫ এপ্রিল থেকে করোনা (Covid-19) পজিটিভ হয়ে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, রাজারবাগ, ঢাকার করোনা ইউনিটে “আইসোলেশনে” আছি।

মূলত না জানানোর প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো পরিবারকে টেনশন দিতে চাইনি। তাই কথাটা এতদিন গোপন রেখেছিলাম। কিন্তু, আমার একজন কাছের মানুষ এসব সহ্য করতে পারেনি। তিনি আমার পরিবারের সবাইকে ফোন করে সব বলে দিয়েছে। উনার ভাষ্য মতে কথাটা নাকি তার পেটে বোমের মতো বাসা বেঁধে ছিল; ব্লাস্ট করার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।

যাইহোক, উনাকে আমি দোষ দেই না। উনি আমার ভালোর জন্য করেছেন এসব। কারণ উনি বলেছেন, মা-বাবার দোয়া হলো আসল দোয়া। মা-বাবার দোয়া আল্লাহর দরবারে সবার আগে কবুল হয়। ১ লাখ আলেম-ওলামারা বসে দোয়া করলে আল্লাহ যতটা না শুনবে; তার চেয়ে বেশি কবুল হবে মা বাবার দু শব্দের দোয়াটি।

যাইহোক, আমার পরিবারের সবাই যেহেতু জেনেই গেছে; এখন আপনাদের সাথে শেয়ার করতে আমার আর কোন বাধা নেই।

ঘটনার সারসংক্ষেপঃ

গত ২৪ এপ্রিল ডিআইজি মাসুদুর রহমান ভূইয়া স্যার (আমি ডিআইজি স্যারের সহকারী) হঠাৎ আমাকে ফোন করে জানালো, এসপি আসাদ উল্লাহ চৌধুরী স্যারের করোনা পজেটিভ এসেছে। আমি যেন সাবধানে থাকি এবং ব্যারাক ছেড়ে কোথাও না যাই।

স্যার আমাকে এটা বলার কারণ হল ওই এসপি স্যারের সাথে আমি এর আগে ৩ দিন যাবত বড় (অতিঃ আইজি) স্যারের নির্দেশে একটা প্রেজেন্টেশন রেডি করতেছিলাম।

যাইহোক, ফোনটা পেয়ে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কারণ স্যারের মতো ভালো ও উঁচু মনের পুলিশ সুপার আমি আর পাইনি। স্যারের সাথে আমি টানা তিনদিন সকাল-বিকাল-রাতে ওই প্রেজেন্টেশন তৈরির কাজ করেছিলাম।

ইতিমধ্যে, ডিআইজি স্যার ফোনটা রাখার পর আমার হার্টবিট হঠাৎ খুব মাত্রায় বেড়ে গেল এবং তা আমি মুহুর্তেই টের পেলাম। মানুষ কেন হার্ট অ্যাটাক করে সেদিন কিছুটা অনুভব করেছিলাম! স্যারের ফোনের পরপর আমার গায়ে জ্বর আসে। টেনশনে অর্ধেক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।

আরো বিস্তারিত বলতে গেলে, এসপি স্যার আর আমি একেবারে কাছাকাছি ছিলাম। এই যেমন ধরুন, স্যার আর আমি একই প্লেটে চানাচুর, মুড়ি, বিস্কিট ইত্যাদি খেয়েছিলাম এবং স্যারের চায়ের কাপ, পানির গ্লাসসহ স্যারের বাথরুমও ব্যবহার করেছিলাম।

এছাড়াও স্যার আর আমার বসার চেয়ার একদম পাশাপাশি লাগানো ছিল, কারণ কম্পিউটারে একসাথে কাজ করতে হয়েছিল। তখন স্যার মাঝে মাঝে একটু কাশি দিচ্ছিল। আমার কিছুটা সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল বাট গুরুত্বে নেইনি। কারণ, তখন আমার মাস্ক পরা ছিল। কীভাবে যে ভাইরাসটা আমাকে ধরলো তা আজও জানি না।

সেসময় সারাদেশে খুব ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছিল বিধায় স্যারের সিজনাল সর্দি কাশি ছিল। আমি ইতস্ত বোধ করে স্যারকে অলরেডি বলেই ফেললাম, স্যার আপনি আর কাজ করার দরকার নাই, আপনার শরীর খারাপের দিকে যাচ্ছে। স্যার বলল, আমার কাছে দায়িত্বটাই সব রে! তারপর বিষয়টি আমি আমার ডিআইজি স্যারকে অবগত করলাম যে এসপি স্যার একটু অসুস্থবোধ করছেন। ডিআইজি স্যার অফিস ডিউটিকে ডেকে বললেন, এসপি স্যারকে লেবু মিশ্রিত গরম পানি দিতে। সিজনাল সর্দি মনে করে ডিআইজি স্যারও অতটা ভ্রক্ষেপ করলেন না।

যাইহোক, ঘটনাটি ১ম রমজান এর আগের দিনের। তখন থেকে অনেক টেনশন হচ্ছিল। এই ভেবে যে, না জানি আমারো করোনা পজিটিভ! এদিকে ব্যারাকের সবাই জানতো আমি ওই এসপি স্যারের সাথে প্রেজেনটেশনের কাজ করে আসছিলাম। তারা এসব শোনার পর কেউ কেউ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ শুরু করলেও বেশিরভাগ মানসিক সাপোর্ট দিয়েছিল।

যাইহোক, আমি প্রথম তারাবির নামাজের নিয়ত করে দাঁড়ালাম। ততক্ষণে পুরো ব্যারাকে ফিসফিস শুরু হয়ে গেল আমাকে নিয়ে। কানে ভেসে আসছিল, কয়েকজনের কথাবার্তা। আমার অবচেতন মন কিছু কিছু মানুষের আচার আচরণ পর্যবেক্ষণ করছিল।

ব্যারাকের সবাই চায় আমি ব্যারাক ত্যাগ করি। সবারই মৃত্যু ভয় আছে, আমিও বুঝি সবই। আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করলাম এখন তো রাত, কাল সকাল সকাল করোনা টেস্ট করাবো, ততক্ষণ পর্যন্ত যাতে আমাকে সময় দেয়।

সত্যি বলতে একজন করোনা আক্রান্ত রোগী করোনায় মারা যাওয়ার পূর্বে একশবার আশেপাশের মানুষের অমানবিক আচরণে মারা যান। হৃদয় দিখণ্ডিত হয়, আপনারা বুঝবেন না। যে আক্রান্ত হয়েছে সে আমার কথার মর্ম বুঝবে।

বিশ্বাস করুন, ব্যারাক প্রতিবেশীদের আচার আচরণ দেখে অর্ধেক আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। এর পরের দিন সকালে পিজি হাসপাতালে টেস্ট করাতে দেওয়ার পর ব্যারাকে ফেরত আসলাম সকাল ১০টায়। সারাদিন ব্যারাকের সবার আচার আচরণে অতিষ্ট হয়ে গেছি আমি। সবাই কেমন জানি পর পর আচরণ করতে লাগলো। ব্যারাকে সবার ভাবভুষা এমন মনে হল যেন আমি শরীর পচা রোগী, আমার বেডের কাছ দিয়ে ভয়ে কেউ হাটছে না। এমনটা অবশ্য করবেইবা না কেন; রোগটাই যে মহা আতংকের। তাদের জায়গায় আমি হলেও হয়ত এমনটা করতাম।

তারপরেও আমার কাছে অনেক খারাপ লাগছিল সিচুয়েশনটা। এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়তে হয়নি তাই মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল ভীষণ। মনটা হু হু করে কেঁদে উঠলো! মানুষ কত অসহায় এই ভাইরাসের কাছে। ভ্রাতৃত্ববোধ ছিনিয়ে নিয়ে যায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে। (পরে অবশ্য শুনেছি আমার পুরো ব্যারাককে লকডাউন করে সিদ্বেশরী স্কুলে স্থানান্তর করেছে সবাইকে)

২৫ এপ্রিল ১ম রমজানে সকাল সকাল রোজা রেখে করোনা টেস্ট করালাম। তারপর রাত ৮.৪০ এর দিকে আমাকে IEDCR মেসেজে জানালো আমি Covid-19 পজিটিভ। তারপর পুলিশ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চলে এলাম।

লেখাটা উৎসর্গ করছি তাদেরকে; যারা বলছেন আমার তো কোনও উপসর্গ নাই। আমার কিচ্ছু হবে না। তাদেরকে আমার এ স্ট্যাটাসটা দেখিয়ে দেবেন। কারণ আমি যদি না জানতাম এসপি স্যারের করোনা পজিটিভ, তাহলে জীবনেও টেস্টের নাম মুখে আনতাম না। কারণ আমি তো দিব্বি সুস্থ লোক। আজ ২১ দিন চলে আমার! ঠিক আপনার মতই সুস্থ আমি। কোনো ফারাক নেই আপনার আর আমার মাঝে। পার্থক্য এতটুকুই মেশিন বলছে আমার করোনা পজিটিভ, যার কোন লক্ষণ বা উপসর্গই আজ পর্যন্ত দেখলাম না।

প্রতিদিন ১ ঘণ্টা ব্যায়াম করছি। ঘাম ঝরাচ্ছি। ভাঁপ থেরাপি নিচ্ছি। গরম চা খাচ্চি। আদা মিশ্রিত লবন পানি খাচ্ছি। ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খাচ্ছি। এত এত নিয়ম মানছি যে ১৪ দিন পর যখন টেস্ট করাতে আবার দিলাম তখন আমি ৯৯% শিউর ছিলাম আমার রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে। কারণ আমার আত্মবিশ্বাস ছিল আমি অনেক সুস্থদের চেয়েও সুস্থ। ওমা, সে কি! রিপোর্টে আবারো পজিটিভ এলো! এটা কোনও কথা? তাহলে বিশেষজ্ঞের দেওয়া তথ্যগুলো কী ভুল? ১ থেকে ৫ দিন এটা ওটা হবে, ৬ষ্ঠ দিন বমি হবে, ৭ম দিন হাঁপানি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

পজিটিভ শুনে আবার হার্টবিট বেড়ে গেল। এটা শুনে সাময়িক ১ ঘণ্টা অসুস্থ হয়ে গেলাম। নাপা খেলাম ১টা। পজিটিভের খবর শুনে টেনশনে জ্বর আসছে শরীরে।

টেনশন যে একটা বড় রোগ তা হলফ করলাম পরে। নিজেকে স্থির করলাম টেনশন মোটেও করা যাবে না। মনোবল কে উঁচু করলাম। বেশি বেশি নামাজ কালাম পড়তে লাগলাম।

মজার ব্যাপার হলো, আমার সেইম বয়সের একজন করোনা রোগী আমার মতই দিব্যি সুস্থ ছিল, তার নাম সুমন। সে শুধু টেনশন করার কারণে ICU তে চলে গেলো। তখনি আমি বুঝে নিলাম এ রোগের মহা ওষুধ হলো টেনশন ফ্রি থাকা। তাই তখন সিদ্ধান্ত নিলাম ফাঁকে ফাঁকে ফেসবুকিং করবো। যাতে নিজেকে টেনশন ফ্রি রাখা যায়। আপনারা অনেকে হয়তো তা খেয়ালও করেছেন, যে আপনাদের সবার মাঝে পোস্ট, কমেন্ট, শেয়ার করে অনলাইনে সময় কাটিয়েছি।

পাশাপাশি আমি কয়েকটা ফেসবুক গ্রুপের এডমিন হিসেবে আছি বিধায় সেখানেও টেনশন ফ্রি থাকার জন্য বেশি বেশি সময় দিয়েছি। কাউকে বুঝতেই দেইনি আমি একজন করোনা পেশেন্ট। তাদের সবাইকে বিভিন্ন পোস্ট কমেন্টের মাধ্যমে আনন্দ দিচ্ছিলাম এবং আমি নিজেও আনন্দ নিচ্ছিলাম। চেষ্টা একটাই টেনশন ফ্রি থাকা। আলহামদুলিল্লাহ, আমি এখন পর্যন্ত সফল। বাকি দিনগুলোতে আল্লাহ চাইলে সুস্থ হবো ইনশাল্লাহ।

তবে একটা দুঃখজনক কথা হলো, আমার সংস্পর্শে আসা ৭ জন পুলিশ সদস্য আমার পজিটিভ আসাতে আমারি মতো কৌতুহলবশতঃ টেস্ট করিয়েছিল। ইন্নালিল্লাহ! তাদের সবার করোনা ধরা পড়েছে। তারাও আমার মতো আইসোলেশনে আছে পুলিশ হাসপাতালে। তাদেরও সবার আমার মতো একই কন্ডিশন! কোনও উপসর্গ বা লক্ষণ নেই।

সুতরাং যারা পাগলের মত বীরদর্পে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা একবার ভাবুন তো, যারা পজিটিভ হলো আমার সংস্পর্শে এসে বা আমি যে পজিটিভ হলাম, তা যদি কৌতুহলবশত টেস্ট না করাতাম তাহলে আমি আজ ২১ দিন পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতাম! কি!? জানতে পারতাম? না জানতে পারতাম না! তাহলে কি হতো? হ্যাঁ তাই হতো যা আপনি ভাবছেন এখন! আমার থেকে আরো ২০০ জন মানুষ সংক্রমিত হতো।

আমার হয়তো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো, তাই আমার শরীর এই ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করে এখনও পর্যন্ত টিকে আছে। সবার কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সমান? কারো কম কারো বেশি! ওই ২০০ জনের মধ্যে যদি ১ জন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নাই এমন ব্যক্তি আমার কারণে মারা যায়, তার জন্য পরোক্ষভাবে বলতে হবে আমিই খুনি। হ্যাঁ সত্যিই বলছি, আমিই ওই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ।

তাই নিজেকে যতটা সম্ভব বন্দি রাখুন, তা না পারলে অন্তত সাবধানে থাকুন।

নুরুল ইসলাম রোকন চৌধুরী
এএসআই, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ঢাকা।