Fri. Jul 3rd, 2020

শামসুদ্দিনে ‘দমবন্ধ’ পরিবেশ সিলেটে যে অভিযোগ আমলে নিচ্ছেন না কেউ

ওয়েছ খছরু :: সিলেটে ‘কোভিড হাসপাতাল’ শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল। সিলেট বিভাগের মধ্যে একমাত্র হাসপাতাল এটি। এখনো বিকল্প কোনো চিকিৎসা নেই সিলেটে। সুতরাং সিলেটে করোনা আক্রান্ত সব রোগীদের আশ্রয়স্থল এটি। করোনা প্রাদুর্ভাবের প্রাক্কালে অনেক চিন্তা-ভাবনা করেই এই হাসপাতালটি কোভিড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার শুরু করে সিলেটের স্বাস্থ্য বিভাগ। তখন সিলেটে হৈচৈও কম হয়নি। শামসুদ্দিন হাসপাতাল সিলেটের অনেক পুরনো হাসপাতাল। সদর হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত এটি।

রোগী তেমন যায় না। পুরাতন বলে সবাই এড়িয়ে চলেন এই হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা। এরপরও স্বাস্থ্য বিভাগ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে করোনামুক্ত রাখতে এই হাসপাতালকেই করোনা আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। নেই আইসিইউ কিংবা অক্সিজেনের ব্যবস্থা। ওয়ার্ডগুলোও পরিপাটি নয়। পরিবেশও অনেটা অনুযোগী। শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ায় এই হাসপাতালে প্রথমে ভর্তি করা হয়েছিলো সিলেটে করোনায় মারা যাওয়া ডা. মঈন উদ্দিনকে। স্বজনরা জানিয়েছেন এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েই দমবন্ধ অবস্থা হয়েছিলো ডা. মঈন উদ্দিনে। হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ তাকে আরো অসুস্থ করে তুলেছিলো। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও ডা. মঈন সন্তুষ্ট ছিলেন না। এ কারণে জীবন বাঁচাতে বার বার তাকে ওসমানীর আইসিইউতে নেয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাকে ওসমানীতে নেয়া হয়নি। পরবর্তীতে পরিবারই সিদ্বান্ত নিয়ে তাকে ঢাকায় নিয়ে যায়। এরপরও বাঁচানো গেলো ডা. মঈন উদ্দিনকে। তার মৃত্যু সিলেটের কোভিড চিকিৎসা ব্যবস্থার সার্বিক চিত্র সবার সামনে পরিস্কার করেছে।

শুধু ডা. মঈন উদ্দিনই নয়- করোনা আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে এসে মৃত্যুবরণ করেছেন মৌলভীবাজারের সাবেক সিভিল সার্জন ডা. এম এ মতিন। তার মৃত্যুর পর মেয়ে ডা. রাবেয়া বেগমের একটি স্ট্যাটাস ভেসে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ডা. রাবেয়া নিজেও একজন চিকিৎসক। সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তার তিনি। স্ট্যাটাসে ডা. রাবেয়া করোনা আক্রান্ত পিতার চিকিৎসা ব্যবস্থা না পাওয়ার আর্তনাদ জানান। স্ট্যাটাসে তিনি উল্লেখ করেন- ‘সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে তোমাকে (ডা. মতিন) নিয়ে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলাম। কত আকুতি করলাম, ওরা নিলো না। রেফার করলো শামসুদ্দিন হাসপাতালে। ইমারজেন্সিতে দাঁড়িয়ে রইলাম আধা ঘণ্টা। তারপর ডাক্তার এলো। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে বলল- এক নম্বর ওয়ার্ডে নিয়ে যান। শুধু এটুকু বলার জন্য আরো নীল হলো আমার বাবা। নিজে আমার সাথে আনা এম্বুলেন্স-এর কর্মীদের সাথে করে ট্রলি নিয়ে ছুটছি। কেউ বলে দেবার দেখিয়ে দেবার নেই এক নম্বর কোন দিকে। উ™£ান্তের মতো ছুটছে এক ডাক্তার বানানোর কারিগর তার ডাক্তার বাবাকে নিয়ে। যে বাবা আজীবন শুধু বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিয়ে গেলো হাজার হাজার মানুষের। যে বাবা আজীবন হেলথ সেক্টরের অনিয়ম দূর করতে লড়েছে। সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করতে আমাদেরকে ভূলে যেতো। না শুধু গরীবের না, সমাজের সব সুযোগ সন্ধানীরা জানতো ডাক্তার মতিন পয়সা নেবেন না।

তিনি আরো উল্লেখ করেন- ‘ওয়ার্ডে পৌঁছলাম। নোংরা বেডে আমার বাবাকে নিজে টেনে হিঁচড়ে নামালাম। বলা হলো যান অক্সিজেন মাক্স কিনে আনেন। নীল গাঢ়তর হচ্ছে। কত শত ডাক্তারকে ফোন দিলাম কেউ ধরল না। তিন চার ঘন্টা এভাবেই কাটলো। কোনো ডাক্তার এলো না। শুধু অক্সিজেন দিয়ে বসে রইলাম। তারপর ওসমানীর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার ইউনূস সাহেবের কানে যখন ফোন গেলো তিনি খুব সহযোগিতা করলেন। এক ঘন্টা চলে যাবার পর এক ওয়ার্ড বয় এসে বলল রোগী আইসিইউতে নেবো। কিন্তু ট্রলি কে ঠেলবে? আমি বল্লাম আমি। আবার ছুটে চলছি। বেলা দুটোয় ডাক্তার এলেন। আমাকে বললেন, তবে আমি চাইলে একটা ব্যবস্থা হবে, কিন্তু রোগীর যে , তাতে লাভ হবে না। লাভ না হবার তো তৈরী করলেন, তো করা শেষ।’

স্ট্যাটাসে শেষে ডা. রাবেয়া আফসোসের সঙ্গে উল্লেখ করেন- ‘অথচ আমার বাবা সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। চাকরি জীবনে তিনি সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য নানা চেষ্টা করেছেন। আর তিনিই কী-না শেষ বেলা এমন অবহেলা শিকার হলেন। আর বিশটি বছর দেশের মানুষের জন্য কাজ করে আজ জানলাম আমি এ দেশের এক অনাকাঙ্খিত সন্তান।’ সিলেটের শামসুদ্দিন হাসপাতালে দু’দিন আগেও রোগীরা সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন। হাসপাতালের বড় ওয়ার্ডের একমাত্র বাথরুমের স্যুয়ারেজ সিস্টেম হঠাৎ করে উপচে উঠে। ফলে দুর্গন্ধ শুরু হয়। অন্যদিকে- পুলিশ এক পরিচয়হীন কোভিড রোগীকে এনে ভর্তি করেছিলো হাসপাতালে। তাকেও নিয়ে রাখা হয় ওই ওয়ার্ডে। ওই রোগীর ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হচ্ছিলো। আর রোগীও এতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। দেখার কেউ ছিলো না। হাসপাতালে ক্লিনার, ওয়ার্ডবয়কে ডেকেও পাওয়া যায়নি। ফলে ওয়ার্ডে টিকতে না পেরে করোনা আক্রান্ত রোগীরা এসে আশ্রয় নেন ওয়ার্ডের বাইরে। ভর্তি থাকা রোগীরা অভিযোগ করেন- অনেক রোগীর জন্য একটি মাত্র বাথরুম। সেটি আবার অপরিচ্ছন্ন। ময়লা উপচে উঠে বাথরুম নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কোনো রোগীই আর ওই বাথরুমে যেতে পারেন নি। বুধবার ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সেটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করে দেন। তারা আরো অভিযোগ করেন- করোনা হাসপাতাল হলেও এখানের সেবা খুবই নিম্নমানের। তবে ডাক্তার, নার্সরা ভালো সেবা দিচ্ছেন।

কিন্তু পুরনো হাসপাতাল হওয়ার কারণে অনেক সমস্যা এই হাসপাতালে। আর করোনা হাসপাতাল হওয়ার পরও এখানে পর্যাপ্ত ক্লিনার, ওয়ার্ড বয় কিংবা আয়া নেই। ফলে ওয়ার্ডে বন্দি থাকা রোগীদের মানসিক অবস্থা আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ওয়ার্ডের বাথরুম নষ্ট হওয়ার কথা স্বীকার করে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. সুশান্ত কুমার মহাপাত্র জানিয়েছেন- ক্লিনার, বয় ও ট্রলিম্যান সংকট রয়েছে। এ কারণে এই অসুবিধা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল কোভিড হাসপাতাল ঘোষণার পর ওসমানী মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ মাত্র দু’টি আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা করেছিলো। অথচ হাসপাতালে প্রয়োজন অনেক আইসিইউ বেড। ডা. মঈনের মৃত্যুর পর এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের নির্দেশে আরো ৯টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক জানিয়েছেন- হাসপাতালে মোট বেড সংখ্যা ছিলো ১০০টি। আইসিইউ ওয়ার্ডের জন্য একটি ওয়ার্ড ছেড়ে দেয়ার কারণে এখন ৬০-৬৫ জন রোগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৫৫ জন রোগী।

এদিকে- হাসপাতালের ওয়ার্ডে ২১ দিন থেকে করোনা থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা জৈন্তাপুরের জামাল উদ্দিন মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ‘২১ দিন দমবন্ধ অবস্থায় ছিলাম হাসপাতালে। ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ছিলাম ২৫ জনের মতো। এক পাশে পুরুষ আর আরেক পাশে নারী। সবাই বেডে শুয়ে শুয়ে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছিলাম। হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেয়া হতো তা খাওয়া সম্ভব হতো না। বাইরে থেকে বেশি দামে খাবার কিনে এনে খেতে হতো। ২১ দিনে ১৫০০ টাকার শুধু পানিই খেয়েছি।’ তিনি বলেন- ‘চিকিৎসকরা দিনে কয়েকবার আসতেন। দরোজার ওপাশ থেকে কথা বলে চলে যেতেন। কারো কোনো সমস্যা থাকলে ওষধ দিতেন। ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার ও ট্রলিম্যান খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে করোনা ওয়ার্ডে থাকা রোগীরাই একে অপরের সহায়তা করে চলছেন। আর ওয়ার্ডে মশার উৎপাত তো ছিলই। রাতে মশারী টানিয়েও মশা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হতো না।’ সূত্র: মানবজমিন