Fri. Aug 14th, 2020

লোভাছড়ায় বহিরাগত শ্রমিক-করোনার হটস্পট কানাইঘাট উপজেলা

কানাইঘাট প্রতিনিধিঃ সিলেটের কানাইঘাটে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। এখন পর্যন্ত ৯৭ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যু বরণ করেছেন ৫ জন্য ব্যক্তি। আর শনাক্ত হওয়া রোগীরা সবাই আলাদা আলাদা এলাকার বাসিন্দা। এতে জালের মত বিস্তৃত ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস।

সিলেটের সকল পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকলেও, কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতে বহিরাগত শ্রমিক দিয়ে সামাজিক দূরত্ব না মেনে পাথর পরিবহণ পুরোদমে চলছে। এই মহামারির সময়েও ময়মনসিংহ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ভৈরব, নেত্রকোনা, নারায়নগঞ্জ থেকে বহিরাগত শ্রমিকদের সংস্পর্শে আসা রোগীরাই করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন দাবি সচেতনমহলের। উপজেলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাস। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা এবং আতঙ্কের মধ্যে দিন-যাপন করছেন উপজেলাবাসী। কানাইঘাটের লোভাছড়া কোয়ারির আশপাশে স্কুল মাদ্রাসা সহ ৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বহিরাগত শ্রমিকের কারনে রোগ ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কে রয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এখন পর্যন্ত ৯৭ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যু বরণ করেছেন ৫ জন্য ব্যক্তি। অনেকে উপসর্গ নিয়ে ঘোরাফেরা করছেন এবং স্থানীয় ডাক্তারদের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে দায় সারছেন। আতঙ্কে কেউ করোনা টেস্ট করাচ্ছেন না বলে অনেকের অভিযোগ।

জানা যায়, কানাইঘাট উপজেলায় অবস্থিত একমাত্র পাথর মহাল লোভাছড়া। এই পাথর মহালটি ১৪২৬ বাংলা সনের ১৩ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত সময়ে ইজারার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। এরই প্রেক্ষিতে কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বারিউল করিম খান গত ২৮ মে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তবর্তী লোভাছড়া পাথর মহাল হতে পাথর উত্তোলন, পরিবহন ও বিপণন সম্পূর্ণ বন্ধের জন্য থানার অফিসার ইনচার্জ শামসুদ্দোহা পিপিএমকে নির্দেশনা দিয়ে একটি চিঠি ইস্যু করেন। পত্রের অনুলিপি সদয় জ্ঞাতার্থে জেলা প্রশাসক, সিলেট, পুলিশ সুপার ও পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট বরাবরে পাঠানো হয়। যার স্মারক নং- ০৫.৪৬.৯১৫৯.০০০.০০.০০.০০০.১৮

প্রশাসনের নির্দেশের পর বিগত কয়েক দিন লীজ বিহীন পাথর কোয়ারী থেকে ইঞ্জিন চালিত বলগেটে পাথর বোঝাই করে রাতের আঁধারে কানাইঘাট খেয়াঘাট বাসস্ট্যান্ড, সুরমা নদীর ঘাটে, শাহ মোশাহিদ (রহ.) সেতু সংলগ্ন এলাকায় পাথর বোঝাই বলগেট থেকে পাথর আনলোড করার সময় বাধা প্রদান করেন স্থানীয় যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, এই কয়েক দিনে ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা লোভাছড়া চা-বাগান এলাকায় রয়্যেলিটি ঘাট থেকে আদায় করেন পাথর কোয়ারী নিয়ন্ত্রণকারী কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। এই টাকা আদৌ কী সরকারী কোষাগারে জমা হয়েছে কী না প্রশ্ন রয়েছে সচেতন মহলের।

ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুণরায় কোয়ারীর ইজারা ও রয়েলিটি আদায় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোয়ারীর সাবেক ইজারাদার মস্তাক আহমদ পলাশ, কোয়ারীতে মজুদকৃত পাথর আগামী ১৫ জুনের মধ্যে পরিবহন ও অপসারনের জন্য সময় চেয়ে কোয়ারীর ইজারাদারের পক্ষে মহামান্য হাইকোর্টের একটি ব্রেঞ্চে গত ০৩ জুন একটি রিট পিটিশন আবেদন দায়ের করেন এডভোকেট রুহুল আমিন। বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিমের ব্রেঞ্চে রিট পিটিশন আবেদন দাখিল করা হয়। রিটের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত কোয়ারীর দুই পারে মজুদকৃত পাথর পরিবহন ও অপসারনের আদেশ দেন।

আদেশের পর থেকে পাথর ব্যবসায়ী তমিজ মেম্বার , নাজিম উদ্দিন , হাজী কামাল, হাজী বিলাল, মাতাই, আলমগীর গংরা কোয়ারীতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাথর নদীপথে বহনের জন্য বড় বড় বলগেট, স্টীমার, কার্গো জড়ো করে পাথর পরিবহণ শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আনা হয়েছে শত শত শ্রমিক। এতে করে আক্রান্তের হার বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এ ব্যাপারে কোয়ারীর ইজারাদার মস্তাক আহমদ পলাশের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বারিউল করিম খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশের কপি পেয়েছি। তবে, শত শত শ্রমিক একসাথে জড়ো না করে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়ে পাথর পরিবহণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তিতে কোয়ারি লীজ সম্পর্কিত ব্যাপারে খনিজ সম্পদ ব্যুারো থেকে যে নির্দেশনা আমাদের কাছে আসবে সেই আলোকে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

এব্যাপারে চারিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মুজাম্মিল আলী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বহিরাগত শ্রমিক আসা বন্ধ ও ফিরিয়ে দিয়ে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে কাজ চালানো যায়। এই পাথর কোয়ারিতে বহিরাগত শ্রমিক আসা যাওয়ার কারনে দিন দিন এই উপজেলায় করোনা রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে। এব্যাপারে তিনি উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

উল্লেখ্য, লোভাছড়া পাথর মহাল এলাকায় কয়েক শত কোটি টাকার পাথর মজুদ রয়েছে। এসব পাথর বর্ষা মৌসুমে লোভা ও সুরমা নদীতে জোয়ার নামার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় লঞ্চ, স্টীমার, বলগেট ও কার্গো যোগে সাপ্লাই করা হয়। বর্তমানে করোনা মহাদুর্যোগকালীন সময়ে কোয়ারীতে দেশের বিভিন্ন এলাকার পাথর শ্রমিকদের জড়ো করে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কার্গো, বলগেট ও ইঞ্জিনচালিত নৌযানে পাথর বোঝাই করার কাজ শুরু করায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় পাথর কোয়ারীতে সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য সচেতন মহল দাবী জানিয়ে আসছেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।