|
এই সংবাদটি পড়েছেন 1,455 জন

তাঁতশিল্পের উন্নয়ন কার্যক্রমে ধীরগতি

ডেইলি বিডি নিউজঃ তাঁতশিল্পের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমে ধীরগতি বিরাজ করছে। এতে এ শিল্পের উন্নয়ন একদিকে যেমন থমকে আছে, অন্যদিকে সম্ভাবনাময় খাতটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ খাতের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত প্রকল্পটিও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বর্তমানে এই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বিপুল চাহিদা রয়েছে। গার্মেন্টস খাতে তৈরি পোশাক ছাড়াও হস্তচালিত তাঁতে তৈরি পোশাকের চাহিদাও অনেক। অথচ বিশ্বের ভোক্তার নিত্যনতুন ডিজাইন ও চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না দেশের তাঁতিরা। ফ্যাশন ছাড়াও রঙের ক্ষেত্রেও তাঁতিরা নতুন চিন্তাধারা প্রয়োগ করতে পারছেন না।

এ কারণে তাঁতিদের ফ্যাশন ডিজাইনের নিত্যনতুন ধারা ও পাশ্চাত্য চাহিদার সঙ্গে পরিচিত করানো ও হাতে-কলমে শেখানোর জন্য দেশে কিছু ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার জন্য ‘তাঁতবস্ত্রের উন্নয়নে ফ্যাশন ডিজাইন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও একটি বেসিক সেন্টার স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় ৩৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। প্রকল্পে সরকারি অর্থ তহবিল থেকে দেওয়া হয় ৩ কোটি ৪০ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করার কথা ৩৫ কোটি টাকা।

প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) নিশ্চিত করা হয়েছে সঠিক সময়ে। কিন্তু সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ঠিকমতো না হওয়ায় এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পটি নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এই অবস্থায় ব্যয় বৃদ্ধি না করে প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে সরকার। একই সঙ্গে প্রকল্পটির আওতায় গৃহীত যাবতীয় অসম্পূর্ণ কাজ ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম সুসম্পন্ন করার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ, পরিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়কে তদারকি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, যথাসময়ে প্রকল্পটি সমাপ্তির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকল্প সমাপ্তির তিন মাসের মধ্যে পিসিআর (প্রজেক্ট কমপ্লিশান রিপোর্ট) আইএমইডিতে প্রেরণ করতে হবে। এ বিষয়ে গত ১৩ জানুয়ারি কমিশন থেকে এসব নির্দেশনা পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং তাঁতশিল্প বোর্ডে প্রেরণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সহকারী প্রধান নুঝাত ফারহীন জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার খুব আন্তরিক। তাই এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।

প্রকল্পের আওতায় নরসিংদী সদরে একটি ফ্যাশন ডিজাইন ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং টাঙ্গাইলের কালিহাতী, মৌলভীবাজারের কলমগঞ্জে ও সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে তিনটি প্রশিক্ষণ উপকেন্দ্র স্থাপন করার কথা বলা হয়। এর উদ্দেশ্য তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং নতুন নতুন ডিজাইন উদ্বোধন করা। কিন্তু প্রকল্পের ধীরগতির কারণে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে।

ইনস্টিটিউট নির্মাণের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়, দেশের তাঁতে প্রস্তুত বস্ত্র ঐতিহ্যবাহী। এককালে তাঁতে তৈরি মসলিন সারা বিশ্বে সমাদৃত ছিল। কালের বিবর্তনে মসলিনের বিলুপ্তি ঘটলেও বর্তমানে হস্তচালিত তাঁতে তৈরি জামদানি, বেনারস ও টাঙ্গাইল শাড়িই মসলিনের ধারক ও বাহক। গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তাঁতিরা তাদের হস্তচালিত তাঁতে পুনোনো আমলের ডিজাইনে পোশাক তৈরি করেন।

এ ধরনের পোশাকের প্রতি দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ থাকলেও বাজারের চাহিদা এবং ভোক্তাদের পছন্দসই বস্ত্র উৎপাদন না করায় হস্তচালিত এসব তাঁতবস্ত্র বেশি পরিমাণে বিক্রি হচ্ছে না। অথচ কিছু এনজিও নতুন ডিজাইন উদ্ভাবন করে উন্নতমানের বস্ত্র অধিক মুনাফায় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছে। এ অবস্থায় দেশের হস্তচালিত তাঁতিদের আধুনিক ডিজাইনের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিকল্প নেই। এতে করে বাজারের চাহিদা এবং ভোক্তাদের পছন্দসই বস্ত্র উৎপাদনে তাঁতিদের সক্ষমতা বাড়বে। ন্যায্যমূল্যের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও এর রপ্তানির পরিমাণ বাড়বে।

দ্বিতীয় পর্যায়ের সংশোধিত এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। অনুমোদনের সময় প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখন প্রকল্পটির মেয়াদ আরো এক বছর ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদকাল হয়েছে ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া প্রসঙ্গে তখন বলা হয়েছিল, ‘তাঁতশিল্পের বিকাশ ধরে রাখতেই সরকার এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তাঁতশিল্পের উন্নয়ন সাধন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২২ হাজার তাঁতির কর্মসংস্থান হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে এসব উৎপাদিত বস্ত্রের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে।’

পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নরসিংদীতে ফ্যাশন ডিজাইন ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের লক্ষ্যে পূর্ত কাজের জন্য গণপূর্ত বিভাগ, নরসিংদী কর্তৃক দরপত্র আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যাদেশ প্রদান প্রক্রিয়াধীন আছে।

টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার বল্লা মৌজায় অবস্থিত কালিহাতী বেসিক সেন্টারের খালি জায়গায় একাডেমিক ভবন এবং বেসিক সেন্টারসংলগ্ন অধিগ্রহণকৃত ০.৭৬ একর জমিতে প্র্যাকটিক্যাল শেড, পুরুষ ডরমেটরি এবং নারী হোস্টেলের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।

বেলকুচি প্রশিক্ষণ উপকেন্দ্রে চারটি অবকাঠামো যথা, একাডেমিক ভবন, পুরুষ ডরমেটরি, নারী ডরমেটরি ও প্র্যাকটিক্যাল শেডের পূর্ত কাজ এবং ভূমি উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী প্রশিক্ষণ উপকেন্দ্রের ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের নিজস্ব বেসিক সেন্টার মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে স্থাপনের প্রস্তাবসহ ডিপিপি এর দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। পরবর্তী সময়ে সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন পেলেও কার্যক্রমে অগ্রগতি খুব বেশি হয়নি।