Fri. Oct 30th, 2020

খাদ্যে ভেজাল, দেহে বিষ

মো. জেদান আল মুসা :: মাছ-মাংস, ফলমূলে ফরমালিন ও খাদ্যে ভেজালের খবর আমরা প্রায়ই দেখে থাকি। এসবের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানও চালানো হচ্ছে। আইনের আওতায় আনা হচ্ছে অপরাধীদের। তবুও থামছে না এসব প্রবণতা। বৈশ্বিক মহামারি করোনায় আক্রান্ত হলে ১৪ দিনের মধ্যে তার লক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু খাদ্যে ভেজাল ধরা পড়ে অনেক পরে, দেহে এর প্রভাব থাকে দীর্ঘ মেয়াদে। পরিসংখ্যান বলছে, অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে প্রতি বছর গড়ে দেশে প্রায় চার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে এবং অনেকে স্থায়ীভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা এবং অধিক মেয়াদে সংরক্ষণের জন্য খাদ্যে ফরমালিন মিশ্রণ করে থাকে। খাদ্যে ভেজাল ও ফরমালিন মিশ্রণের বিরুদ্ধে যদিও অনেক আইন রয়েছে কিন্তু কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতার মাধ্যমেই কেবল এটি রোধ করা সম্ভব।

আজকাল নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুতেই ভেজালের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। খাদ্য, ফলমূল এমনকি ওষুধেও। বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদিত প্যাকেটজাত খাদ্য, যেমন- ফলের রস, স্ন্যাক্সফুড, জ্যাম-জেলি, আচার-চাটনিতে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রং ব্যবহার করা হয় এবং সেমাই ও নুডলসে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। দুধেও ফরমালিনের ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি চালেও ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদন। বরফের মধ্যে দেওয়া হচ্ছে ফরমালিন। এতে বরফের মধ্যে রাখা মাছে আর আলাদা করে ফরমালিন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। কাঁচা ফল পাকানোর জন্য ব্যবহার করা হয় কার্বাইড। অল্প দামের বিস্কুট, চানাচুর ও মিষ্টিতে কাপড়ের রং ব্যবহার করা হয়। সোডিয়াম সাইক্লোমেট নামের একটি উপাদান মিষ্টিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আনারস পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত তুঁতে।

খাদ্যপণ্য উৎপাদনে এখন কীটনাশকের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য। এসব কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব যাতে মানবদেহে না পড়ে তার জন্য কিছু নির্দেশনাও থাকে। কীটনাশক কী পরিমাণ ব্যবহার করা যাবে তার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু সেগুলো সঠিকভাবে মানা হয় না। বাংলাদেশে ফরমালিন আমদানি হয় প্রধানত শিল্প খাতে ব্যবহার ও পরীক্ষাগারে ব্যবহারের জন্য। শিল্প খাতে ফরমালিনের চাহিদা ১০০ থেকে ১৫০ টন। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফরমালিন আমদানি করা হয়। বাড়তি ফরমালিন খাদ্যে, বিশেষ করে ফলমূল, মাছ-মাংস, দুধ, সবজিতে ব্যবহার হচ্ছে এবং একটি অসাধু মহল মজুদ করে রাখে। ফরমালিন হচ্ছে রাসায়ানিক উপদান ফরমালডিহাইডের জলীয় মিশ্রণ। এতে মিথানলও থাকে। ফরমালিন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার হয়। ফরমালডিহাইড মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টিকারক ক্ষতিকর একটি রাসায়ানিক যৌগ। চামড়া, টেক্সটাইল, মেলামাইন, পোলট্রি ও হ্যাচারি শিল্প ল্যাবরেটরি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কাঠ ও প্লাইউড শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফরমালিন ব্যবহার হয়। বর্তমানে মৎস্য হ্যাচারিতে ফরমালিনের ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি, সায়েন্টিফিক ল্যাব, ওষুধ কোম্পানি, ভ্যারাইটিজ কনজিউমার প্রডাক্ট ট্রেডিং কোম্পানিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফরমালিন ব্যবহার হচ্ছে। খাদ্যে ফরমালিন ছাড়াও আরও কিছু রাসায়ানিক দ্রব্য ব্যবহার হয়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এর মধ্যে আছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, কাপড়ের রং, কীটনাশক হিসেবে এন্ড্রিন, ডিডিটি, হেপ্টাক্লোর ও কৃত্রিম ক্রমবৃদ্ধি নিয়ামক বা হাইব্রিড।

আমাদের দেশে ভেজাল খাদ্যের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয়-সংশ্নিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এবং একটি দক্ষ ও কার্যকর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই আইনের উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো জাতীয় নিরাপদ খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা পরিষদ এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা। আইনের ৬৪ ধারায় খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। ফরমালিন আমদানি, উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ, বিক্রয় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে এর অপব্যবহার রোধ করার উদ্দেশ্যে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫ প্রণীত হয়েছে। ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধ ও তৎসংশ্নিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে বিধান করার লক্ষ্যে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ভোক্তা অধিকার পরিষদ গঠন, জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটি প্রতিষ্ঠা, উপজেলা কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি গঠন ইত্যাদি। বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪-এর ২৫গ ধারায় খাদ্যে ভেজাল দেওয়া বা ভেজাল ঔষধ ও প্রসাধনী প্রস্তুত ও বিক্রয়ের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১৪ বছর পর্যন্ত মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানার কথা বলা হয়েছে।

কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে কৃষিবান্ধব এ সরকার সদাসচেষ্ট। বীজ এবং কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করার কারণে কৃষককে এগুলো সংগ্রহে আর ভোগান্তির শিকার হতে হয় না বলে সবাই কৃষি উৎপাদনে গভীর মনোযোগী হতে পারছে। সরকারের সহযোগিতা ও বাম্পার ফলনের কারণে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এ কার্যক্রম যদি অব্যাহত রাখা যায়, তবে সেদিন বেশি দূরে নয়, বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশে পরিণত হবে। মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো খাদ্য। দুঃখজনক হলেও সত্য, উৎপাদিত খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ী বাজারজাত করছে।

ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইনের প্রয়োগের মাধ্যমেই খাদ্যে ভেজাল সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার জনসম্পৃক্ততা, জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন। ভেজাল কারবারিদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিভিন্ন মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। ভেজালবিরোধী পুলিশি অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। মনে রাখা দরকার, সুস্থ সবল জাতি গঠনে ভেজালমুক্ত খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই।

পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়, সিলেট

zedanlabiba1978@yahoo.com