Fri. Sep 18th, 2020

রাজনৈতিক সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটে কমিটিহীন ছাত্রলীগ

নাঈম চৌধুরীঃ মহান মুক্তিযুদ্ধসহ ইতিহাসের সকল গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারী উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ৷ ছাত্রলীগ সম্পর্কে গর্ব করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস।’ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ মেলে সংগঠনটির স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিটি ন্যায্য আন্দোলন-সংগ্রামের প্রথম সারিতে ছিল ছাত্রলীগ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা ও ১১ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ছিয়ানব্বইয়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ সব প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। এসব আন্দোলন-সংগ্রামে শহীদ হয়েছেন সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মী। আবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে অনেকেই সম্পৃক্ত হয়েছেন রাজনীতির আরও বৃহত্তর পরিসরে।

স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে লক্ষ্য করলে উত্তর-পূর্বকোণ অর্থাৎ ঈশান কোণে যে অঞ্চলটি চোখে পড়ে সেটি হলো সিলেট। কথিত আছে, প্রাচ্য দেশে আসার আগে শাহজালাল (রহ.)–এর মামা মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ কবীর (রহ.) তাঁকে এক মুঠো মাটি দিয়ে বলেছিলেন, ‘স্বাদে বর্ণে গন্ধে এই মাটির মতো মাটি যেখানে পাবে, সেখানে বসতি স্থাপন করে ধর্ম প্রচার করবে।’ হজরত শাহজালাল (রহ.) বিশিষ্ট শিষ্য শেখ আলীকে এই মাটির দায়িত্বে নিয়োগ করেন এবং নির্দেশ দেন যে যাত্রাপথে বিভিন্ন জনপদের মাটির সঙ্গে যেন এই জনপদের মাটির তুলনা করে তিনি দেখেন। পরে এই শিষ্যের উপাধি হয় চাষনী পীর। সিলেট শহরের শাহজালাল (রহ.)–এর মাজারের কাছেই গোয়াইপাড়ায় চাষনী পীরের মাজার।

বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন সিলেটের আদি বাসিন্দা। শ্রীচৈতন্য এখানেই এসেছিলেন ঠাকুরমাকে দেখতে। লীলাচ্ছলে কীর্তন করতে করতে মিলিয়ে গেলেন বলে লোকের বিশ্বাস। জাতিভেদ, কুসংস্কার আর অসাম্যের বিরুদ্ধে ভক্তি আর ভালোবাসার উত্তাপ ছড়িয়ে গেছেন শ্রীচৈতন্য। এ আলোর বিভা আজও পাওয়া যায় এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে।

চরম উত্তেজনাকর রাজনৈতিক বৈরিতায়ও রাজনীতি আর মত-পথের ভিন্নতায় সিলেট কখনো তার ঐতিহ্য হারায়নি। সিলেটে কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অশালীন বা অসৌজন্যমূলক বক্তব্য দিয়ে ঘায়েল করার কোনো প্রয়াস দেখা যায়নি। সিলেটের মানুষের কাছে এ ধরনের আচরণ কখনো প্রশ্রয় পায়নি, সে সামাজিক ক্ষেত্রেই হোক আর রাজনীতির ময়দানেই হোক। রাজনীতি, নির্বাচন, মত আর পথের ভিন্নতার কাছে সিলেটের মানুষ কখনো নিজেদের সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি আর সৌজন্য বিসর্জন দেয়নি। আমাদের সিলেট অঞ্চলের লোকজন সম্প্রীতি, সহানুভূতি আর সৌজন্যের জন্য বিখ্যাত। এসব দেখে দেখেই আমাদের বেড়ে ওঠা।

আমরা বাঙালি এবং বাংলাদেশী। এমন উচ্চারণ আমাদের মুখ থেকে যেভাবে সহজে বের হয়, ঠিক তার পরেই যে সহজ সরল কথাটি আমরা তাড়াতাড়ি বলে ফেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, তাহলো আমরা সিলেটি। আর এই সিলেটেই জন্ম নিয়েছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী যিনি ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের বিজয়ের এক উজ্জ্বল অংশ। এই সিলেটে আরো জন্ম নিয়েছেন রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব শাহ এ এম এস কিবরিয়া, এম সাইফুর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, আবুল মাল আব্দুল মুহিত এবং এমন আরো অনেকে আছেন যারা সারাদেশে অতি পরিচিত।

সিলেটের রাজনীতির মধ্যে আলাদা কিছু আছে! বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবেও সিলেট সারাদেশের অত্যন্ত সুপরিচিত। ১৯৭১ সাল হতে দেশের সরকার গঠনের জন্য, সিলেট-১ আসনে যিনি যে দলের নির্বাচিত হয়েছেন সেই দলই সরকার গঠন করে আসছে আজ অবধি। সিলেটে যে কোন সমস্যায় সুদীর্ঘ ইতিহাস বলে, সকল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এক সাথে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেন। সেই ধারাবাহিকতা আজও বিরাজমান রয়েছে। কথিত আছে পঁচাত্তর এর কালোরাতের পরবর্তীকালে ছোট একটি ঘটনায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লো সিলেটের ছাত্ররা। দ্রুত সর্বদলীয় সভা আহ্বান করা হলো। এক ছাদের নিচে বসলেন জননেতা আবদুল হামিদ, আসাদ্দর আলী, শহীদ আলী, খন্দকার মালিক, দেওয়ান ফরিদ গাজী, লুতফুর রহমান, সৈয়দ আবু নসর, প্র‍য়াত আ ন ম শফিকুল হক।

বাহিরে অবস্থানরাত ছাত্রজনতা উত্তেজনায় টগবগ করছে। কিন্তু সবাইকে নিরাশ করে প্রয়াত ম আ মুক্তাদির অস্ফুট স্বরে বললেন, বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আলাপে বসলেও এমন সৌজন্য হয় না। হাল্কা দেনদরবার হয়। বাইরে ছাত্রদের সংঘর্ষে রেখে এখানে নাটক চলছে বলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করলেন। কে কাকে পায়ে ধরে সালাম করবেন, কাকে চেয়ার ছেড়ে দেবেন—এসবের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

জননেতা আবদুল হামিদ, সিলেটের ছোট বড় সকলের হামিদ চাচা। খাসিয়া পানের সঙ্গে চুন আর জর্দা নিয়ে বললেন, ‘ও বা, রাজনীতি রাজনীতির জাগাত। আমরা সিলেটের ঐতিহ্য আরাইতাম পারতাম নায়!’ কিন্তু আফসোসর বিষয় ঐতিহ্যকে অন্তরে লালন করা সেই সিলেটের বঙ্গবন্ধু প্রেমিক ছাত্রজনতা আজ দিন কাটাচ্ছে কোনরূপ নেতৃত্ব ছাড়াই৷

দীর্ঘদিন ধরে এই সিলেটেই কমিটিহীন দিন কাটাচ্ছে ছাত্রলীগ। সিলেট জেলা ও মহানগর কোনো ইউনিটেরই কমিটি নেই। ফলে সিলেটে ক্ষমতাসীন দলটির ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমে দেখা দিয়েোছে স্থবিরতা। ছন্নছাড়া অবস্থায় দিন কাটছে সিলেট ছাত্রলীগের নেই কোন কমিটি, নেই কোন নেতৃত্ব। নেই তেমন কোনো সাংগঠনিক কর্মসূচী। দল ক্ষমতায় থাকার পরও কমিটি না থাকায় অনেকটা বন্দিদশা কাটাচ্ছে সিলেট ছাত্রলীগ। কমিটি না থাকায় উত্থান ঘটেছে নানা গ্রুপ উপ-গ্রুপের। ঘটছে নানা অপকর্ম। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না হওয়ায় পদপ্রত্যাশী নেতাদেরও বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে তারাও ভূগছেন হতাশায়।

সিলেটে ছাত্রলীগের রাজনীতি এখন প্রায় মৃতই বলা চলে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ সিলেটে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। রাজনীতির মাঠে কোথাও দেখা মিলছে না কমিটিহীন ছাত্রলীগের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেটে ছাত্রলীগের অবস্থান এখন কোথায়, তা জানতে একটি তথ্যই যথেষ্ট। মুজিববর্ষ উপলক্ষে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ ২০ দিনের বেশকিছু কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলো। এসব কর্মসূচি আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো বাস্তবায়ন করার কথা ছিলো। কিন্তু ‘বাস্তবায়নকারী’ সংগঠনের তালিকায় যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, মহিলা লীগ সবার নাম থাকলেও নেই ছাত্রলীগের নাম!

জানা গেছে, সিলেট জেলা ছাত্রলীগে ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১০ সদস্যের সেই আংশিক কমিটি ২০১৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ১৪১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়। এ কমিটি নিয়ে শুরু হয় দ্বন্দ্ব-বিবাদ। হয় সংঘর্ষও। ফলে চার মাসের মাথায় ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ কমিটি স্থগিত করে কেন্দ্র। ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর প্রত্যাহার করা হয় স্থগিতাদেশ। ২০১৭ সালের অক্টোবরে ছাত্রলীগ কর্মী ওমর মিয়াদ হত্যাকান্ডে প্রধান আসামি হন জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রায়হান চৌধুরী। সে বছরের ১৮ অক্টোবর জেলার কমিটি বাতিল করে দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সেই থেকে এখন অবধি কমিটিহীন জেলা ছাত্রলীগ।

অন্যদিকে, মহানগর ছাত্রলীগে ২০১৫ সালের ৪ জুলাই ৪ সদস্যের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সেই ৪ নেতা তিন বছরেরও বেশি সময়ে করতে পারেনি পূর্ণাঙ্গ কমিটি। ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করে কেন্দ্র। একই সঙ্গে ‘নৈতিক স্খলনজনিত’ অভিযোগে শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলীম তুষারকে বহিষ্কার করা হয়। এ শাখায় এখন অবধি আর নতুন কোনো কমিটি আসেনি। বেশ কিছুদিন আগে একবার কমিটিতে আসতে আগ্রহীদের জীবন বৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এরপর আর এগোয়নি কার্যক্রম।

দীর্ঘদিন জেলা ও মহানগরের কমিটি না থাকায় দিন দিন সিলেটে অবস্থান হারাচ্ছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না হওয়ায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এখন হতাশা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতেও দেখা মিলছে না তাদের। কমিটিতে আসতে আগ্রহীরা এখন ছাত্রলীগ বাদ দিয়ে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতিতে জড়াচ্ছেন।

জানা যায়, নানা অভিযোগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী পদত্যাগ করেন। এরপরই থেমে যায় সিলেটে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের কার্যক্রম। এরপর ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য। তবে তারা এখনো সিলেট সহ সারাদেশের কোনো বিভাগীয় শহরের কমিটি গঠনে দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ নেননি।

সিলেটে ছাত্রলীগের কমিটি নেই, এ সংক্রান্ত দায় এড়ানোর সুযোগ নেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দেরও। তারা চাইলেই সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা নতুন কমিটির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় বয়সের মারপ্যাচে ঝড়ে পড়ছেন রাজপথের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী। এই সুযোগে দলে ভিড়ছে ছাত্রদল ও শিবিরের হাইব্রিড অনুপ্রবেশকারীরা।

সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের তৃনমুল নেতৃবৃন্দের অনেকেই সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেত্রী, গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি ও সুস্পষ্ট হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন৷ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের প্রতি তাদের আবেদন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত মুজিব সৈনিকদের মূল্যায়নের মাধ্যমে অবিলম্বে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের নতুন কমিটি উপহার দেওয়া হোক।

লেখক পরিচিতঃ ছাত্রলীগের একজন ক্ষুদ্র কর্মী