Fri. Sep 18th, 2020

রিকশাসহ অযান্ত্রিক যানবাহনের নিবন্ধন দিচ্ছে ডিএসসিসি

ডেইলি বিডি নিউজঃ যানজটের কারণ হিসেবে রিকশাভ্যানকে দায়ী করে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে এই বাহনটির নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রেখেছে দুই সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি)। কিন্তু রাজস্ব বাড়ানোর কথা চিন্তা করে এবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। চলতি অর্থবছর থেকে নতুন করে রিকশাসহ অযান্ত্রিক সব যানবাহনের নিবন্ধন বা লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে ডিএসসিসি এলাকায় মোটর, যন্ত্র, ইঞ্জিন বা ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় ধরা হয়েছে ২৪ কোটি টাকা। ডিএসসিসি বলছে, লাইসেন্স না থাকলেও অযান্ত্রিক অবৈধ এসব বাহন বন্ধ হচ্ছে না। তাই এগুলোকে নিবন্ধন দেওয়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলার মধ্যে এনে পরিচালনা করা হবে। তবে কী পরিমাণ নিবন্ধন দেওয়া হবে তা এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, রাজধানীতে লাইসেন্সধারী রিকশা ও রিকশাভ্যানের সংখ্যা মোট ৭৯ হাজার ৫৫৪টি। যদিও বাস্তবে এর সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। বলা হয়, ১৯৮৬ সাল থেকে গত ৩৪ বছরে এসব অযান্ত্রিক বাহনের (রিকশা ও ভ্যান) নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখে সিটি করপোরেশন। যদিও এ সময়ে প্রতিদিনই রাস্তায় নেমেছে নতুন নতুন বাহন। এ অবস্থায় ‌‘অবৈধ’ এসব বাহনের নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

অযান্ত্রিক বাহনকে নিবন্ধন দেওয়ার জন্য একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে খসড়া তৈরি করেছে ডিএসসিসি। এতে বলা হয়েছে, ডিএসসিসির আওতাধীন এলাকায় চলাচলরত অযান্ত্রিক যানবাহনকে নিবন্ধনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এমতাবস্থায় নিবন্ধন গ্রহণে আগ্রহী রিকশা, ব্যক্তিগত রিকশা, ভ্যানগাড়ি, ঠেলাগাড়ি, টালিগাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি তথা অযান্ত্রিক যানবাহন মালিকদের নিবন্ধন, নবায়ন ও মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত নিয়মাবলি অনুসরণ করতে অনুরোধ করা হলো।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধন, নবায়ন ও মালিকানা পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্রে আবেদন করতে হবে। প্রতিটি আবেদনপত্রের মূল্য ১০০ টাকা (অফেরতযোগ্য)। আবেদনপত্র আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর হতে ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখের মধ্যে ডিএসসিসির ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগ এবং আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো থেকে দফতর চলাকালীন সময়ে নগদ ১০০ টাকায় ক্রয় করতে হবে। আবেদনপত্র যথাযথভাবে পূরণ করে নগর ভবনে স্থাপিত কেন্দ্রে আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর হতে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দফতর চলাকালীন সময়ে জমা দেওয়া যাবে। গৃহীত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে যোগ্য বিবেচিত আবেদনগুলোর অনুকূলে প্রতিটি রিকশা, ব্যক্তিগত রিকশা, ভ্যানগাড়ি, ঠেলাগাড়ি, টালিগাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফি জমা নিয়ে নিবন্ধন প্রদান করা হবে। বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশিত হওয়ার তারিখ থেকে ডিএসসিসি এলাকায় মোটরচালিত বা যন্ত্রচালিত বা ইঞ্জিনচালিত, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হলো।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল হক (উপসচিব) বলেন, আমরা অযান্ত্রিক যানবাহন নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নগরীতে কী পরিমাণ নিবন্ধন দেওয়া হবে সেটি কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। আর নিবন্ধন বা লাইসেন্স ফি কত হবে তাও পরে জানানো হবে।

চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) রিকশা লাইসেন্স বাবদ ২৪ কোটি টাকা রাজস্ব ধরেছে ডিএসসিসি। এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘রিকশা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এই রিকশা ঢাকা শহরের একটা বড় বৈশিষ্ট্য। এখানে রিকশা থাকবে। আমরা এটাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার উদ্যোগ নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমাদের ৫০ হাজারের মতো রিকশার নিবন্ধন রয়েছে। কিন্তু চলাচল করে আরও কয়েকগুণ বেশি। কতগুলো রিকশা চলবে এবং কোন কোন সড়কে চলবে— সেটা আমরা নির্ধারণ করে দেবো। পাশাপাশি শহরের সড়কগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে কিছু রাস্তা থাকবে দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য। কিছু থাকবে যেখানে রিকশা চলবে। কিছু সড়ক থাকবে যেখানে শুধু হেঁটে চলাচল করা হবে। এই ধীরগতির যানবাহনে আমরা শহরকে উপভোগ করতে পারি। আমরা এর জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়াটাকে নতুন করে স্বচ্ছ করে দিচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় রিকশা ভ্যান শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রিকশা ভ্যান মালিক-শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব ইনসুর আলী বলেন, ‘২০০১ সালের ৬ নভেম্বর ৩৫ হাজার রিকশা ও ৮ হাজার ভ্যানের লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে আমরা ৪৩ হাজার নামের তালিকা করে সিটি করপোরেশনে জমা দেই। তৎকালীন ডিসি ট্রাফিক (উত্তর ও দক্ষিণ) এর অফিসেও সেই ফাইল জমা দেই। এই লাইসেন্স পাওয়ার দাবিতে গত ১৮-২০ বছর ধরে আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু লাইসেন্সগুলো দেয়নি। সর্বশেষ গত পহেলা সেপ্টেম্বর মেয়র বরাবরে একটা স্মারক লিপি দেই। এর আলোকে অবৈধ রিকশা উচ্ছেদ ও চুক্তি মোতাবেক লাইসেন্সগুলো গ্রহণ করে রাজস্ব গ্রহণের দাবি জানিয়েছি। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ ও এর বাণিজ্যের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছি। রিকশার পাশাপাশি চালকদের লাইসেন্সও বাধ্যতামূলক দাবি করেছি। দীর্ঘদিন পরে হলেও করপোরেশন এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমরা তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

তিনি জানান, আজ দক্ষিণ সিটির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বলেছেন— ‘‌‌আমরা গণহারে লাইসেন্স দেবো। আর ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করার জন্য একটা বিজ্ঞাপন করে দিয়েছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ থাকলেও নগরীতে এসব বাহন বন্ধ হয়নি। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে এক শ্রেণির নাম সর্বস্ব সমিতি ও সংগঠন। তারা রিকশা বা ভ্যানের লাইসেন্সের নামে নম্বর প্লেট দিচ্ছে। একেকটি বাহনে এ ধরনের দুই থেকে পাঁচটি করে নম্বর প্লেট দেখা যায়। একেকটি নম্বর প্লেটের বিপরীতে বাহনপ্রতি তিন মাস অন্তর আদায় করা হচ্ছে ২০০-৪৫০ টাকা। আর লাইসেন্সের কথা বলে নেওয়া হচ্ছে ১৫-২০ হাজার টাকা। ফলে লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখায় একদিকে যেমন রাজস্ব হারিয়েছে সিটি করপোরেশন, অন্যদিকে অতিরিক্ত বাহনের কারণে বাড়ছে যানজট।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে বৈধ রিকশা ও ভ্যানের সংখ্যা সাড়ে ৭৯ হাজার। আর অবৈধ রিকশার সংখ্যা ১০ লাখ। এই অবৈধ রিকশার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে ২৮টি সংগঠন। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এসব সংগঠনের মধ্যে ঢাকা বিভাগ রিকশা ও ভ্যান মালিক সমিতি, বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, মহানগর রিকশা মালিক লীগ, রিকশা ও ভ্যান মালিক-শ্রমিক লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ ও বাংলাদেশ রিকশা মালিক লীগ, রিকশা এবং শ্রমিক-মালিক লীগ, ঢাকা সিটি মুক্তিযোদ্ধা রিকশা-ভ্যান মালিক কল্যাণ সোসাইটি অন্যতম। লাইসেন্সবিহীন এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণহীন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্স দেওয়া রিকশাগুলোর বিষয়েও এতদিন ছিল না কোনও নিয়ন্ত্রণ বা বিধিমালা।