Tue. Oct 27th, 2020

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না

ফারহানা হেনাঃ ধর্ষণ নিয়ে চারদিকে রীতিমতো ত্রাহী ত্রাহী রব উঠেছে। পত্রিকার পাতা, অনলাইন গণমাধ্যম ও সম্প্রচার মাধ্যমের সংবাদে একদল হিংস্র শ্বাপদের থাবা দেয়ার খবর। দেশে ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। অনেক স্থানে পৈচাশিকভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে ধর্ষিতাকে। ধর্ষণের হাত থেকে বাদ যাচ্ছেনা শিশুরাও। আঁতকে উঠার মতো তথ্য দিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন। সংস্থাটির এক রিপোর্ট বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রতিঘণ্টায় একজন করে নারী নির্যাতনের শিকার হয়।

পত্র পত্রিকার বরাতে বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যাণ গুলোতে নজর দিলেই বিষয়টুকু স্পষ্ট হয়। একটি জাতীয় দৈনিকে জাতীয় মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সমীক্ষা দেখে রীতিমতো প্রাণ আৎকে ওঠে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৪ জন নারী, এদের মধ্যে ৩০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে,গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৬ জন। ২০১৩ সালে ধর্ষণের শিকার ১০৭ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৬ জনকে এবং গণধর্ষণ হয়েছেন ৩৫ জন। ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৫৩ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৮ জনকে, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৬ জন। ২০১৫ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৪ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৮ জনকে, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১০৩ জন। ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪১ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৭ জন। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০০ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৬ জনকে এবং গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৬ জন। এ ছাড়া ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ১১৫, ২০১৫-তে ১৪১, ২০১৬-তে ১৫৮ এবং ২০১৭তে ২উঅ শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারী ধর্ষণের ঘটনা কোনো বছর তুলনামূলক কম-বেশি হলেও গণধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। দেশে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হলেও ধাপে ধাপে প্রতিকূলতার জালে জড়িয়ে পড়ছে বিচার প্রাপ্তির আশা।

এছাড়াও গ্রাম্য সালিশের নামে এক প্রহসণ তো আছেই। সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছে ধর্ষিতার পরিবার। অনেকটাই মৌখিকভাব একঘরে রাখা হচ্ছে ভিকটিমদের।

এছাড়াও বর্তমানে যুক্ত হয়েছে নতুন সমস্যা। নারীদের পোষাকের দোহাই দিয়ে ধর্ষণ জায়েজ করার চেষ্টা করছে একদল অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মানুষ। এর ফলে একটি বিশাল ধর্মন্ধ শ্রেণী তৈরি হচ্ছে। অনেক ধর্মগুরু প্রকাশ্যেই সাম্প্রদায়িকতা ও নারী প্রতি সহিংসতা উষ্কে দিচ্ছে। এসব অর্ধশিক্ষিত লোকেরা স্বল্পমূল্যে স্মার্টফোন কিনেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াচ্ছে নারীবিদ্বেষীতা ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প। মজার বিষয় হলো আমাদের দেশের কথিত অর্ধশিক্ষিত শ্রেণী সামাজিত যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষণের জন্য নারীর পর্দা না করাকে দোষারোপ করায় যতটা তৎপর তার বিন্দুমাত্র্রও দেশে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের বিপক্ষে একদমই নয়। দেশে মাদকের সহজলভ্যতার ফলে ধর্ষণ বেড়ে যাচ্ছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ থেকে ছড়ানো হচ্ছে উষ্কানী ও নারী বিদ্বেষীতা।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদের উপস্থিতি ব্যপকহারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নারীদের সহজাত বিষয়গুলোকে দেখানো হচ্ছে ট্যাবু ও নোংরা হিসেবে। যান্ত্রিকতা, আধুনিকতা ও অতিরিক্তে পড়ালেখার চাপের ফলে পারিবারিক সুশিক্ষা ও নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের যে চর্চাটুকু পরিবার থেকে আসা উচিত ছিলো তা আর আসছে না। সামাজিক যোগাযোগ ও বিনোদন মাধ্যম গুলোতে সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে নারীকে ভোগ্যপণ্য বানানো হচ্ছে। ব্যাপারটা এমন যে অর্থের বিনিময়ে যৌনতা কেনা যায়। এসবের ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করার নয়। আমরা প্রতিনিয়তই এসবের শিকার হচ্ছি। বিকৃত মানসিকতার বিষবাষ্পে চারিদিক ভারী হয়ে আসছে। সবই যেন গা সহা হয়ে গেছে। ধর্ষণ হয়েছে একদল প্রতিবাদ করছে, একদল নারী বিদ্বেষীতা ছড়াচ্ছে, আরেকদল যেমনটা ধর্ষণ করার তেমনটাই করে যাচ্ছে। কিছু কাপুরুষ দলবেঁধে ধর্ষণের জন্য নারীর পোষাককেই দায়ী। এই তথইবচ অবস্থায় ঘটছে এসব অমানবিক অপরাধ। আমরা যেন শুধুই নির্বাক দর্শক। আমাদের কিছু করার নেই, কিছু বলার নেই,যেন নির্বাক চেয়ে থাকা।

এদিকে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে তিনটি ধাপে ধর্ষণের মামলা দুর্বল করে দেওয়া হয় বলেই ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না বিচারপ্রার্থীরা। আইনজীবী, ফরেনসিক বিভাগের কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, থানা, শারীরিক পরীক্ষা ও সাক্ষী উধাও-এই তিন ধাপের গড়মিলের মধ্যদিয়ে ধর্ষণ মামলা দুর্বল করা হয়। সামাজিকভাবে প্রভাবশালীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে সাক্ষীদের পিছিয়ে পড়ার প্রবণতাও রয়েছে। মূলত এসব কারণে ধর্ষণের মামলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলেই বাংলাদেশে এক হাজারে মাত্র চারজন আসামি ধর্ষণ মামলায় সাজা পায়৷

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, তারা এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র। পুরো দায় কোনোভাবেই পুলিশের নয়। ২০০১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঁচ হাজার তিনটি ধর্ষণের মামলা হয়। এর মধ্যে রায় ঘোষণার হার ৩ দশমিক ৬৬ ভাগ এবং সাজার হার শূন্য দশমিক ৪৫ ভাগ।

পুলিশ সদর দফতরের নথি অনুয়ায়ী, দেশে মোট ৪৩ হাজার ৭০৬টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার মামলায় এক লাখ আসামি খালাস পেয়েছে। আর ধর্ষণ মামলায় খালাস পেয়েছে ৮৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ আসামি। নারী নির্যাতনের মামলায় আসামি খালাসের পরিমাণ ৯৫ শতাংশ।

অনেক সময় আলোচিত ঘটনায় আসামি খালাস পেলে প্রশ্ন ওঠে, কী কারণে তারা খালাস পেল। অন্য ক্ষেত্রে আসামি খালাসের ঘটনা অগোচরেই থেকে যায়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বিচার প্রক্রিয়া মূলত সুঁই-সুতা দিয়ে বুননের মতো। একটু একটু করে সেটি যৌক্তিক পরিণতি পায়। যেকোনও একটা জায়গায় ছেদ পড়লে সেটি সঠিক পরিচালিত হবে না। প্রাথমিকভাবে তিনটি স্তর দেখা যায়, যেখানে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।

অনেকে বলছেন, অপরাধী হওয়ার পরও আসামিদের সাজা না হওয়ার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে মূলত তিনটি কারণে। তদন্ত পর্যায়ে পুলিশের দুর্বলতা, আর্থিক লাভ ও প্রভাবশালীদের চাপ এবং সাক্ষীদের মোটিভেশনের অভাব–এই বিষয়গুলো এর পেছনের কারণ হিসেবে কাজ করছে। এদিকে সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গে চার্জশিট ও ময়নাতদন্তের মিল থাকে না বলে আসামিপক্ষ আদালতে গিয়ে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।

যদিও বাংলাদেশ পুলিশের মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের মতামত হচ্ছে, চার্জশিট ও ময়নাতদন্তের মিল থাকে না, একারণে পুলিশকে দোষারোপ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এককভাবে পুলিশকে দায়ী করার সুযোগ নেই। কেননা, সুরতহাল করার সময় পুলিশের সঙ্গে একজন ম্যাজিস্ট্রেটও উপস্থিত থাকেন। ফলে এককভাবে কাউকে দোষী করার সুযোগ নেই।

এই বিষয়ে একজন আইনজীবী বলেন, অনেক সময় তদন্তের দুর্বলতা ও সাক্ষীর অভাবে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আবার দীর্ঘসময় মামলা চলায় সাক্ষীরা অনেক সময় বেঁকে বসেন। তারা সহযোগিতা করতে চান না।’ তিনি আরও বলেন, তদন্ত ঠিকমতো না হলে আদালতের সামনে আমাদের পক্ষ থেকে কিছু করার থাকে না। আবার অনেক সময় আসামির সঙ্গে অভিযোগকারীরা সমঝোতা করে নেন। সবটাই বাস্তবতা।

দীর্ঘদিন ধর্ষণ ভিকটিমদের নিয়ে কাজ করছেন মানবাধিকারকর্মী ও নারীনেত্রী রোকেয়ার কবীর, তিনি বলেন, থানা, ময়নাতদন্ত ও সাক্ষী-এই তিন স্তরে মামলা দুর্বল করার কাজ হয়। ধর্ষণের মামলায় ধর্ষণের শিকার নারীর সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়, তাকে বিচার চাওয়ার পথে বাধা দেয়। বিচার চাইতে এলে সেখানে যে পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশ, তা তাকে স্বস্তি দেয় না। আদালতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ধর্ষণের অভিজ্ঞতা তাকে এতবার বলতে হয় যে, সে আর মামলাটি চালিয়ে যাওয়ার সাহস রাখেন না। আর দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীন ও ধর্ষণের শিকার নারীর বিরুদ্ধে কাজ নেবে সেটাও স্বাভাবিক।

সিনিয়ির এক সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বলাই বাহুল্য, মেডিক্যাল টেস্টের জন্য পাঠাতে দেরি করার মধ্য দিয়েই মামলা দু্র্বল করার প্রধান কাজটি করা হয়। এরপরের ধাপের কাজগুলো এর মধ্যে দিয়েই সহজ হয়ে যায়। সাক্ষীদের হাত করা কিংবা বছরের পর বছর ধরে মামলা পরিচালনা করে বাদীর আগ্রহ কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মামলাটির গুরুত্বও কমিয়ে দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন,আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় নারীর যৌনসংসর্গের পূর্বঅভিজ্ঞতা আছে, এটি প্রমাণ করেও মামলা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। এই পুরো পরিস্থিতিরই পরিবর্তন জরুরি।

দেশব্যাপী যে হারে ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।উদ্বেগের কারণটা এখানেই এর প্রতিকারের কোন উদ্যোগ নেই? স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে, এ কোন বর্বরতার মধ্যে আমরা বসবাস করছি ? আমাদের দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এসেছে। আমরা হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছি বিশ্বায়নের যুগে। তবে আমাদের মানসিক উন্নতি তলানিতে ঠেকছে। শ্রেণী লিঙ্গ-বৈষম্যহীন স্বপ্নের সোনার বাংলার স্বপ্ন কী তবে আমাদের অধরাই থাকবে! অজান্তেই মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের পঙতি এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না।