Tue. Oct 27th, 2020

সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বন্দর ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে রায়হান হত্যা একটি পরিকল্পিত ঘটনা-সরেজমিন-২

মোস্তাক চৌধুরী ঃ সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের অধীনস্ত বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্মম নির্যাতনে রায়হান আহমদের হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রæত গ্রেফতারসহ সকল অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট ১ আসনের সংসদ সদস্য ড.এ কে আব্দুল মোমেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন। বুধবার (১৪ই অক্টোবর) পাঠানো ডিও লেটারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিলেট বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির এই ঘটনায় এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ, বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিউজ প্রকাশিত সিলেট বন্দরের রাজা এক ভয়ঙ্কর আকবর কাহিনি’শীর্ষক সংবাদটি আমাকে খুবই বিব্রত ও মর্মাহত করেছে। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যখন উন্নয়নের ¯্রােতে এগিয়ে যাচ্ছে তখন সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের এ রকম ঘটনা জনমনে সরকারের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুন্ন করছে।

উল্লেখ্য,গত রবিবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নগরীর নেহারীপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান উদ্দিন। ৬টা ৪০ মিনিটের সময় গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন বন্দরবাজার ফাঁড়ির এএসআই আশেকে এলাহী। মারা যাওয়ার পর রায়হানের শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তার হাতের নখও উপড়ানো ছিল। এ ঘটনার পর পুলিশের বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতন করে রায়হানকে মেরে ফেলার অভিযোগ ওঠে। রায়হানের মৃত্যুর জন্য দায়িত্বহীনতার দায়ে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। এ নিয়ে সারা দেশে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি জানান সাথে সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিবৃতি দেন এবং অপরাধীদের দ্রæত গ্রেফতারের দাবী জানান। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার পাঠান তিনি।

সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে’ রায়হান আহমদের মরদেহ গত বৃহস্পতিবার কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। এরআগে বুধবার রায়হানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পুণরায় ময়না তদন্তের অনুমতি দেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক এম. কাজী এমদাদুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার সকালে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে রায়হানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। এরপর ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতেই তার ময়না তদন্ত সম্পন্ন হবে। পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু আইনে মামলা হলে নিহত ব্যক্তির ময়না তদন্ত নির্বাহী ম্যাজিস্টেটের উপস্থিতিতে করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি ছাড়াই ময়না তদন্ত করে রায়হানকে কবর দেওয়া হয়। এ কারণে পুণরায় ময়না তদন্তের জন্য মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কতোয়ালি থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল বাতেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতেই রায়হান আহমদের মরদেহ কবর থেকে তোলার অনুমতি দেন জেলা প্রশাসক। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে বর্তমানে এই মামলাটির তদন্ত করেছে পিবিআই। মঙ্গলবার রাতেই এই মামলার নথি আনুষ্ঠানিকভাবে পিবিআইতে হস্তান্তর করে মেট্টোপলিটন পুলিশ। উল্লেখ্য,গত ১১ অক্টোবর (রোববার) ভোরে রায়হান আহমদ (৩৪) নামে সিলেট নগরের আখালিয়ার এক যুবক নিহত হন। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে প্রচার করা হয়, ছিনতাইয়ের দায়ে নগরের কাষ্টঘর এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত হন রায়হান। তবে বিকেলে পরিবারের বক্তব্য পাওয়ার পর ঘটনা মোড় নিতে থাকে অন্যদিনে। পরিবার দাবি করেন সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দর বাজার ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে প্রাণ হারায় রায়হান। পরে একইদিন রাত আড়াইটার দিকে পুলিশকে অভিযুক্ত করে সিলেটের কোতোয়ালি থানায় আসামিদের অজ্ঞাত রেখে হেফাজতে মৃত্যু আইনে মামলা করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। পরদিন রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) শাহরিয়ার আল মামুনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সিলেট মহানগর পুলিশ। তদন্তে নেমে পুলিশ হেফাজতে রায়হান উদ্দিনের মৃত্যু ও নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতা পায় তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি জানতে পারে রোববার ভোর ৩টার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে রায়হান আহমদকে আনা হয় বন্দরবাজার ফাঁড়িতে। সেখানে ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বেই তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রায়হানকে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল ৭টার দিকে মারা যান তিনি। প্রসঙ্গত,রায়হান নগরের আখালিয়ার নেহারিপাড়া এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি স্টেডিয়াম মার্কেটএলাকায় এক চিকিৎসকের চেম্বারে সহকারি হিসেবে কাজ করতেন। সে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান কিছুদিনের ভেতর সে আমেরিকা যাওয়ার কথা। তার দুই মাসের একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। এ মেয়েটিকে পিতৃহারা করল পাষন্ড দারগা আকবর।

রায়হান হত্যায় অজানা অনেক তথ্যই বের হয়ে আসছে।
অনেকের ধারণা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসা এ হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ছিলেন সিলেটের নাট্যাভিনেতা গ্রীন বাংলার বেলাল আহমদ মুরাদ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে হত্যাকান্ডের নেপথ্যে থাকা এ বিরল তথ্য তাও খতিয়ে দেখা উচিৎ।

অভিযোগে প্রকাশ,আখালিয়ায় রায়হানের বাড়ির একটু অদূরে অপর মহল্লায় গ্রীণবাংলার নাট্যকার মুরাদের বাড়ি। নাটক ও অভিনয়ের নামে আখালিয়ার একটি বাড়িতে প্রায়ই জমতো মদ ও নারী নিয়ে অশ্লীল মধুচক্র।

আখালিয়ায় মুরাদের নানার বাড়ি থাকায় বেশিরভাগ সময় তিনি আখালিয়ায় কাটাতেন। আর আসরের মধ্যমনি ছিলেন মুরাদ ওরফে জিলাপি মুরাদ। সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের বন্দর বাজার পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ তরুণ এআই আকবর ভুইয়ার নেতৃত্বে চলত এ আসর, এ আসরে মদ, ইয়াবা জুয়া চলত,এখানেই বিভিন্ন এলাকা থেকে সুন্দর তরুণী এনে চলতো দেহ ব্যবসা। তরুণী নিয়ে মদ খেয়ে মত্ত থাকতেন এসআই আকবর ভূইয়া। তরুনীর সঙ্গে রাত কাটাতেন আকবর। প্রতিদিন রাতে লক্ষ টাকার উপরে এখান থেকে আয় ছিল আকবরের। এই টাকা থেকে উপরের মহলে চাঁদা দিত আকবর তাই তার উপর কারো খবরদারী চলত না। তাই নিরাপদ ও নির্বিঘেœ চলতো এই মধুচক্র। যুবলীগ নেতা জগৎজ্যোতি হত্যা মামলার আসামীও ছিলেন এই মুরাদ-এমন অভিযোগও রয়েছে এলাকাবাসীর কাছে। এলাকাবাসীর কথা মুরাদের নেতৃত্বে জমজমাট নারী ও মদের ব্যবসা,অসামাজিক কার্যকলাপের প্রতিবাদী ছিলেন প্রতিবেশী রায়হান। কিন্তু পুলিশের এসআই আকবর জড়িত থাকায় কিছুই করতে পারতেন না রায়হান ও এলাকার প্রতিবাদীরা। বিষয়টি নিয়ে উর্ধ্বতন মহলে যাওয়ার চেষ্ঠায় ছিলেন রায়হান ও এলাকাবাসী। এ খবর ফাঁস হয়ে গেলেই মুরাদ ও এসআই আকবর মিলে রায়হানকে ভুয়া ছিনতাইকারী সাজিয়ে পরিকল্পিতভাবে খুন করে বলে এলাকাবাসী ধারণা করছেন । তথ্যদাতা এলাকাবাসীর দাবি-বেলাল আহমদ মুরাদকে গ্রেফতারের মাধ্যমে আসল তথ্য বের হয়ে আসতে পারে।