Thu. Nov 26th, 2020

সেতুর ওপর ঘর বানিয়ে বসবাস!

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল- সুনামগঞ্জের শাল্লায় যেন ঠিক তা-ই ঘটেছে। ৩০টির মতো অপ্রয়োজনীয় সেতু করে সরকারের প্রায় ৯ কোটি টাকা জলে ফেলা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে সেতুগুলোর কোনো সংযোগ সড়ক নেই।

বেশির ভাগ সেতু তৈরি হওয়ার পরই সংযোগ সড়ক করা হয়নি। কোনো কোনো সেতুর নিচ দিয়ে বা পাশ দিয়ে ডুবন্ত সড়ক হয়েছে, যা কোনো কাজেই আসে না। বর্ষায় এই সেতুগুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়। এ সময় ট্রলার বা নৌকা সেতুর ওপর দিয়ে উঠলে বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি হয়। কার স্বার্থে সরকারের এই বিপুল পরিমাণ টাকার অপচয় করা হয়েছে তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজনরা।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস গত প্রায় ১০ বছরে ৩০টির মতো গ্রামীণ যোগাযোগ সেতু করেছে। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সেতুগুলোর মধ্যে উপজেলার সুখলাইন গ্রামের পাশে দুটি, গিরিধর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে একটি, আনন্দপুরের একটি, হবিবপুরের একটি, আগুয়াই-নোয়াহাটির একটি, শ্বাসখাইয়ে একটি, মামুদনগরে একটি, ইসাকপুরে একটি, কাদিরপুরের সামনে একটি, মার্কুলির খালে একটি, শাল্লা গ্রামে একটি এবং রূপসা গ্রামে একটি সেতু তৈরি হওয়ার পর থেকেই সংযোগ সড়কহীন। অথচ এসব সেতুর একেকটি তৈরি করতে ৩০ থেকে ৩৩ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

উপজেলার মনোয়া গ্রামের আনিসুল হক চৌধুরী মুন বলেন, উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের পাশে একটি ছোট কালভার্ট হলে হতো। কিন্তু করা হয়েছে সেতু। এই সেতু পাঁচ বছর হয় কোনো কাজে আসছে না। বরং বর্ষায় নৌকা চলাচলে বিপদ হয়। শাল্লা গ্রামের পশ্চিম দিকে করা সেতুর পাশ দিয়ে ডুবন্ত সড়ক হয়েছে। এই সেতু অকারণে দাঁড়িয়ে আছে। রূপসা গ্রামের পাশের আরেক সেতু ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। নেই সংযোগ সড়ক। দুই বছর আগে উপজেলা সদরের পাশে সুখলাইন গ্রামে দুটি সংযোগ সড়কহীন সেতু করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ কার্যালয় থেকেই সরকারের মাল যে দরিয়ামে ঢালা হয়েছে, তা সবার নজরে পড়ে।

শাল্লা প্রেস ক্লাবের সভাপতি পিসি দাস বলনে, একশ্রেণির টাউট ঠিকাদার, প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারের এই টাকার অপচয় ও লুটপাট হয়েছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করে শাল্লা প্রত্যন্ত এলাকা, এখানে যা খুশি তা করলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়বে না।

শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে কেন এই সেতুগুলো করা হয়েছে, কেউ জানে না। অনেক স্থানে দুই লাখ টাকা খরচ করলে মাটির সড়ক করা যায়। করা হয়েছে ৩৩ লাখ টাকার সেতু। পানি নিস্কাশনের জন্য সেতু করা হয়ে থাকে। কিন্তু এমনও সেতু আছে, যার নিচ দিয়ে পানি নিস্কাশনের প্রয়োজনই নেই। বর্ষায় এ সেতুগুলো মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। এগুলোর সঙ্গে ট্রলার বা নৌকা লেগে ফেটে যায় বা ডুবে যায়। এসব সেতু না করে এই টাকা দিয়ে হাওর থেকে ধান ঘরে আনার সড়ক করলে, মানুষের উপকারে আসত। এই টাকার অপচয় কেন হয়েছে, কারা করেছে তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

শাল্লা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সরকার মো. ফজলুল করিম বলেন, ৩০টির মতো সেতুর সংযোগ সড়ক নেই, এটা সত্য। বর্ষায় এগুলো বিপদ হয়ে দাঁড়ায় এটাও ঠিক। তবে এগুলো মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য করা হয়েছিল। শাল্লার সিংহভাগ এলাকা বছরের বেশির ভাগ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে। যখন সেতু করা হয়েছিল, তখন হয়তোবা সড়ক ছিল। পানির তীব্রতায় বা ঢেউয়ে সড়ক হয়তো ভেসে গেছে। এখন দাঁড়িয়ে আছে কেবল সেতু।

আমরা দেখেছি গত ১০ বছরে ১৬ থেকে ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে হওয়া ৩০টি সেতুর কোনো কোনোটিতে একেবারেই অ্যাপ্রোচ সড়ক নেই। কোনোটিতে অ্যাপ্রোচ থাকলেও চলার উপযোগী নেই। সেতুগুলোর দুই পাশে অ্যাপ্রোচ সড়ক করার জন্য প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। জাইকার অর্থায়নে এই কাজ হবে। বরাদ্দ এলেই কাজ শুরু করব আমরা।