Thu. Nov 26th, 2020

ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন

ডেইলি বিডি নিউজঃ টঙ্গী-ভৈরব বাজার সেকশনে ডাবল লাইন রেলপথে পাথর নিয়ে জালিয়াতি হয়েছে। নির্ধারিত পরিমানের চেয়ে নতুন এই রেলপথে ২০ শতাংশ কম পাথর দেয়া হয়েছে। একইভাবে পাথর কম দেয়া হয়েছে রেলপথটির শোল্ডারেও। পাথর কম থাকায় রেলপথটিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের প্রকৌশলীরা। এই রেলপথে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন।

নকশা ও দরপত্রের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী রেলপথটিতে স্লিপারের নিচে পাথরের (ব্যালাস্ট) পুরুত্ব কমপক্ষে ২২০ মিলিমিটার হওয়ার কথা। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সরেজমিন পরিদর্শনে রেলপথটিতে পাথরের পুরুত্ব পাওয়া গেছে ১৫০-২০০ মিলিমিটার। সে হিসাবে এই রেলপথে পাথর দেয়া হয়েছে ২০ শতাংশ কম। একইভাবে পাথর কম দেয়া হয়েছে রেলপথটির শোল্ডারেও।

বাংলাদেশ রেলওয়ের টঙ্গী-ভৈরব বাজার সেকশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের চারটি অঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকায় চলাচল করা ট্রেনগুলো সেকশনটি ব্যবহার করে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-নোয়াখালী রুটের ২৭ জোড়া ট্রেন প্রতিদিন টঙ্গী-ভৈরব বাজার সেকশনটি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ২০ জোড়া এক্সপ্রেস ট্রেন, এক জোড়া কমিউটার, দুই জোড়া মেইল ও চার জোড়া মালবাহী কনটেইনার ট্রেন রয়েছে।

৬৪ কিলোমিটার মূল লাইন ও ২২ কিলোমিটার লুপ লাইনের টঙ্গী- ভৈরব বাজার সেকশনটি সিঙ্গেল থেকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয় ২০০৬ সালে। পরের পাঁচ বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও রেললাইনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে সময় লাগে ১২ বছর। ২ হাজার ১৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত রেলপথটি পুরোপুরি চালু হয় ২০১৮ সালের জুনে।

নকশা ও দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী টঙ্গী-ভৈরব বাজার রেলপথের মূল লাইনে স্লিপারের নিচে পাথরের পুরুত্ব থাকার কথা ২২০ মিলিমিটার। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পরিদর্শনে লাইনটিতে পাথরের পরিমাণ এ মাত্রায় পায়নি আইএমইডির প্রতিনিধি দল। এর মধ্যে রেলপথটির ২৮৯/৮-৯ কিলোমিটারে ১৮০ মিলিমিটার, ২৮৭/৩-৪ কিলোমিটারে ১৭০, ২৮১/৯-২৮২/০ কিলোমিটারে ১৬০, ২৭৯/৩-৪ কিলোমিটারে ১৭০, ২৭২/৬-৭ কিলোমিটারে ১৭৫, ২৬২/২-৩ কিলোমিটারে ১৭০, ২৫৫/৭-৮ কিলোমিটারে ১৭০, ২৫১/৫-৬ কিলোমিটারে ১৫০, ২৪১/২-৩ কিলোমিটারে ১৬০ ও ২৩৪/৯-২৩৫/০ কিলোমিটারে পরিদর্শনকালে স্লিপারের নিচে পাথরের পুরুত্ব ২০০ মিলিমিটার পাওয়া গেছে। সামগ্রিকভাবে টঙ্গী-ভৈরব বাজারের মূল রেললাইনে পাথরের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ।

শুধু মূল রেললাইনই নয়, উল্লিখিত স্থানগুলোর শোল্ডারেও রয়েছে প্রয়োজনের চেয়ে কম পাথর। নকশা অনুযায়ী, রেললাইনটির শোল্ডারে পাথরের পুরুত্ব হওয়ার কথা ৪২০ মিলিমিটার। কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনে রেলপথটির ২৮৯/৮-৯ কিলোমিটারে ৩০০ মিলিমিটার, ২৮৭/৩-৪ কিলোমিটারে ৩৮০, ২৮১/৯-২৮২/০ কিলোমিটারে ৩৯০, ২৭৯/৩-৪ কিলোমিটারে ৩৮০, ২৭২/৬-৭ কিলোমিটারে ৩৭০, ২৬২/২-৩ কিলোমিটারে ৪০০, ২৫৫/৭-৮ কিলোমিটারে ৩৪০, ২৫১/৫-৬ কিলোমিটারে ৩৩০, ২৪১/২-৩ কিলোমিটারে ৩৫০ ও ২৩৪/৯-২৩৫/০ কিলোমিটারে পরিদর্শনকালে শোল্ডারে পাথরের পুরুত্ব পাওয়া গেছে ৩৯০ মিলিমিটার। সামগ্রিকভাবে রেলপথটির শোল্ডারে পাথর কম রয়েছে ১৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

রেললাইনে পাথর কম থাকার বিষয়ে আইএমইডি বলছে, ‘কিছু’ পাথর হয়তো নিত্যনৈমিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষয় হয়ে গেছে। পাথর কম থাকার বিষয়টি তদন্তপূর্বক নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টঙ্গী-ভৈরব বাজার রেললাইনে ব্যবহারের জন্য সব মিলিয়ে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৪৫ ঘনমিটার পাথর সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ বলছে, সংগৃহীত পাথরগুলো শতভাগ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে শতভাগ ব্যবহার হলে রেলপথটি চালুর দেড় বছরের মাথায় ২০ শতাংশের বেশি পাথর কমে যাওয়ার কোনো কারণ জানাতে পারেননি রেলওয়ের প্রকৌশলীরা।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সদ্য নির্মিত টঙ্গী-ভৈরব বাজার রেলপথে আন্ত:নগর এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার। এই গতিবেগে ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইনের উপর চাপ পড়ে। রেল লাইনে প্রয়োজনের তুলনায় পাথর কম থাকলে যে কোনো সময় রেললাইন বাঁকা হয়ে যেতে পারে। তাতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। ৭৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে থাকা কোনো ট্রেন হঠাৎ করে লাইনচ্যুত হলে বড় ধরণের দুর্ঘটনায় প্রাণহানীরও আশঙ্কা থাকে।