Tue. Jan 19th, 2021

পকেট কমিটির বিরুদ্ধে এ্যাকশনে কেন্দ্র, ডিসেম্বরেই সিলেটে পূর্ণাঙ্গ কমিটি

ডেইলি বিডি নিউজঃ কমিটি গঠন নিয়ে তৃণমূলে দলের কোন্দল এখন মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন খোদ দলীয় প্রধান। তিনি এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে সামনের ডিসেম্বরেই কোন্দল জর্জরিত সবকটি জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম প্রকাশ করতে যাচ্ছে কেন্দ্র। এরই ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি পাচ্ছে সিলেট আওয়ামী লীগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রেসিয়ামের একজন সদস্য বলেন, এবার কোন্দল ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে নরসিংদী ও সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদের চার নেতাকে অব্যাহিত দেওয়া হয়েছে। একইভাবে আগামীতে আরও কমপক্ষে এক ডজন জেলা ইউনিটের ক্ষেত্রেও এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সিলেটের বিষয়ে এমন সিদ্বান্ত আসাও অস্বাভাবিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাছাড়া, পরিস্থিতি বোঝে নতুন করে সভাপতি ও সম্পাদকসহ পুরো কমিটির নাম প্রকাশও রয়েছে কেন্দ্রের বিবেচনায়-এমনটিও ইঙ্গিত করেন দলের ওই প্রেসিডিয়াম সদস্য।

এর আগে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়। নির্দেশ পরবর্তী জেলা ও মহানগরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পৃথক পৃথকভাবে নিজ নিজ তালিকা পাঠান কেন্দ্রে। কেন্দ্রে প্রস্তাবিত তালিকার পর থেকে মাথাছাড়া দিয়ে উঠে কোন্দল। প্রস্তাবিত কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে কেন্দ্রে পাঠানো হয় আরো একটি বিকল্প কমিটি। সেই সাথে জেলা ও মহানগরের বেশ ক’জন নেতার নাম উল্লেখ করে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন বিকল্প কমিটির নেতৃবৃন্দ। শুধু এখানেই শেষ নয়, তালিকা পাঠানোর পর থেকে সিলেটে পৃথকভাবে শুরু হতে থাকে দলীয় কার্যক্রম।

এই অবস্থার সমাধানে সারাদেশে ৮ টি সাংগঠনিক টিম গঠন করে আওয়ামী লীগ। সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। দায়িত্বপেয়েই ১ অক্টোবর সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সম্পাদকের সাথে পৃথকভাবে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে বিতর্কিত কাউকে দলে রাখা হবেনা জানিয়ে মাহবুবুল হক হানিফ বলেন, দলে কোনো হাইব্রিড নেতাদের সহ্য করা হবেনা। দলের ত্যাগীদের সর্বাগ্রে প্রাধাণ্য দিয়ে প্রস্তাবিত কমিটিতে কিছুটা সংশোধনী আনার নির্দেশ প্রদান করেন তিনি।

মাহবুব উল আলম হানিফের নির্দেশের পর কিছু সংশোধনী আনা হয় জেলা ও মহানগরের তালিকায়। কিন্তু তাতেও নিরসন হয়নি কোন্দল। ফের একাধিক অভিযোগ যায় কেন্দ্রে। বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম নিয়ে সংবাদও প্রকাশ হয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত হয়ে উঠে কেন্দ্র। এই ঘটনার পর ১১ নভেম্বর সিলেট আসেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন শফিক। বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সিলেট জেলা ও মহানগর যুবলীগের উদ্যোগে তিনি সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন।

এ সময় সিলেটের কমিটির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া দল। এই দলের কমিটিতে আসতে হলে যোগ্যতা থাকতে হবে। শাখাওয়াত শফিক বলেন, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন ভাই শিবিরের এজেন্ট কমিটিতে ঢুকাবেন আর আমি সম্মতি দেব এটা হবে না। প্রবাসীদের কমিটিতে অর্ন্তভুক্ত করবেন এটা মেনে নেয়া যায় না। আমি কি চিনব এই সিলেটের মাটিতে কে রাজাকার কে স্বাধীনতাবিরোধী, কে জঙ্গি। আপনারা যদি জেনে থাকেন তা লুকিয়ে রাখবেন কেন?

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘ ১৪ বছর পর গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। জেলায় আগের কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান সভাপতি ও আগের কমিটির যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। আর মহানগরে সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক জাকির হোসেনের স্থান হয় সাধারণ সম্পাদক পদে।

এর প্রায় ৮ মাস পর আগস্টের শেষ দিকে কেন্দ্র থেকে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে কঠোর নির্দেশনা আসে। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রে জমা দিতে বলা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা পড়ে কেন্দ্রে। কিন্তু এ কমিটি নিয়ে দেখা দেয় অসন্তোষ। ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের অবমূল্যায়ন, বিতর্কিতদের স্থান প্রদান, ক্রমবিন্যাসে বিশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে কেন্দ্রে জমা পড়া কমিটির বিপক্ষে সিলেটে ক্ষোভ দেখা দেয়। বিশেষ করে মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়।

তাছাড়া, প্রস্তাবিত কমিটির তালিকাতে সাবেক কমিটির এক ডজনের বেশি নেতাকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে, জেলা ও মহানগরের দায়িত্বশীলরা বিষয়টি মানতে নারাজ। তাদের দাবি- দলে মান-অভিমান থাকতেই পারে। এর অর্থ কিন্তু বিভাজন নয়। তাছাড়া, দলে সবাইকে রেখে দিলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবেনা। ফলে কেন্দ্রীয় নির্দেশ অনুসরন করেই নিজ নিজ তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা। সেই সাখে যাছাই-বাছাই শেষে আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত করা হয়।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ সিলেট আই নিউজকে বলেন, তৃণমূলের কোন্দলের কারণে বিভিন্ন জেলা ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে সমস্যা দেখা দেয়। বিভিন্ন ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া জমা দেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বহু অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগ আমলে নিয়ে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। দলে ঐক্য ফেরাতে অনৈক্যে জড়িয়ে পড়া তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে অ্যাকশন শুরু করেছেন দলীয় সভাপতি। শেখ হাসিনার একমাত্র লক্ষ্য তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করা। যেখানেই নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব-কোন্দল পাওয়া যাবে সেখানেই ওই নেতাদের দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলে সেটা মেনে নেওয়া হবে, তবে সীমা লঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগ করা যাবে না। কেন্দ্রের সুস্পষ্ট এ বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই মূলত শেখ হাসিনার লক্ষ্য।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান বলেন, আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রে জমা দিয়েছি। এখন কেন্দ্রই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের নিয়ে কমিটি করার চেষ্টা করেছি। সাবেক কমিটির নেতাদেরও আমরা মূল্যায়ন করেছি। তবে বড় দল হিসেবে ছোটখাটো সমস্যা তো থাকবেই। আমরা আশা করছি ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটির ঘোষণা হবে।